উকিল নোটিশ দেওয়া হয়েছে সরকারের বিরুদ্ধে। মিরপুরের আমিনা খাতুনের পক্ষে একজন এডভোকেট আমাকে আটক করতে সরকারের ব্যর্থতা ও অবহেলা প্রদর্শন করায় উকিল নোটিশ জারি করেছে। তথ্যসচিব এবং বিবিসির স্থানীয় প্রতিনিধির কাছেও উকিল নোটিশ গেছে। এর অর্থ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণায় যেন কোনও রকম দেরি না করে গ্রেফতার করে এবং বিবিসির প্রতিনিধিরা যেন ক্ষমা চায়। বিবিসির ওপর রাগ, ৩০ জুন তারিখে বিবিসি আমার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে, সেখানে নাকি আমি সিগারেট খেতে খেতে কোরানের পাতা ওল্টাচ্ছিল!ম। কবে কোথায় আমি কোরানের পাতা ওল্টাচ্ছিল!ম, কোন সাক্ষাৎকারে তা মনে করতে চেষ্টা করি। হ্যাঁ, একদিন তা ঘটেছে, তা বিবিসির কোনও সাক্ষাৎকারে নয়। জার্মানির টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকার ছিল সেটি। আমার বাড়িতে আসা নিরাপদ ছিল না বলে জার্মানি থেকে আসা সাংবাদিকরা আমাকে শেরাটন হোটেলে যেতে বলেছিল, সেখানেই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছে। একটি সিগারেট ধরিয়েছিলাম সাংবাদিকদের কাছ থেকে নিয়ে কথা বলার সময়। সাক্ষাৎকার শেষ হয়ে যাওয়ার পর হোটেলের রুমে যে টেবিল ছিল, টেবিলের ড্রয়ারে কোরান শরীফ থাকে, সেটি বের করে আমাকে দিয়ে জার্মান সাংবাদিক বলেছিলেন, আপনি এটা পড়ছেন, এরকম একটা দৃশ্য নিতে চাই। পাতা ওল্টালাম, ক্যামেরায় বন্দী হল দৃশ্য, চলে এলাম। কোরান যখন আমার হাতে, আমার স্পষ্ট মনে আছে আমি কোনও সিগারেট খাচ্ছিল!ম না। বিদেশী তথ্যচিত্র থেকে আমি বুঝি, তারা কেটে কেটে জোড়া দেয় দৃশ্যগুলো, দুঘন্টার সাক্ষাৎকারকে আধঘন্টায় নিয়ে আসে। এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্যে লাফ দেয়। নিশ্চয়ই সিগারেট খাওয়ার দৃশ্যটির পরই কোরান খোলার দৃশ্যটি দেখিয়েছে আর মোল্লাগুলো দুটো চিত্রকে একটি চিত্র বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। এখন প্রশ্ন হল আমি কি সিগারেট খেতে খেতে কোরান পড়লে কোরানকে অসম্মান করা হয় বলে মনে করি? আমার উত্তর, না।
আমার যদি সিগারেটে অভ্যেস থাকত, তবে ঘরে বসে আমি যখন কোরানের নারী লিখছিলাম, সারাদিন কোরান খোলা পড়ে থাকত আমার কমপিউটারের পাশে, আমি পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে সিগারেট খেতে খেতে, কোরানের উদ্ধৃতিগুলো লিখতাম কমপিউটারে। যেমন লিখেছি সিগারেট না খেয়ে। সেই শৈশবে আমি মায়ের আদেশে কোরান স্পর্শ করেছি অযু করে আসার পর। কিন্তু বুদ্ধি হওয়ার পর কোরান স্পর্শের আগে অযু করার প্রয়োজন অনুভব করিনি। কোরানকে অসম্মান করার জন্য যে ইচ্ছে করেই অযু করিনি তা নয়। কোরানকে আমি মনে করিনি যে এটি পবিত্র কোনও বই, এটি ছুঁতে হলে আমাকে পাক পবিত্র হতে হবে। আর অযু করলেই যে পাক পবিত্র হওয়া যায়, তাও আমি মনে করি না। কনুই পর্যন্ত হাত, গোড়ালি পর্যন্ত পা, মুখটা, নাকটা, কানের ভেতরটা, কানের পেছনটা পানিতে ধুয়ে নিলেই কোনও মানুষ পবিত্র হয়ে যায়, এটি নিতান্তই যুক্তিহীন কথা। আমি যদি কুৎসিত চিন্তা করি, আমি যদি অন্যের অনিষ্ট করার কথা ভাবি, অন্যকে যন্ত্রণা দেওয়ার ভাবনা করি, যদি অসততা করি, মিথ্যে বলি, তবেই আমি অপবিত্র হব। এগুলো মন থেকে সরিয়ে মানুষের ভালর জন্য, সুখের জন্য শান্তির জন্য, শুদ্ধ সুন্দর চিন্তা ভাবনা করলেই তবে আমি মনের অপবিত্রতা দূর করতে পারব, পবিত্র হতে পারবো, হাত পা মুখ আর কানের পেছন ধৌত করে পবিত্র হতে পারবো না। সোজা কথা।
আমার সোজা কথায় কার কী যায় আসে! যারা আমার মুণ্ডু চাইছে, তারা আরও বেশি চিৎকার করে আমার মুণ্ডুর দাবি করতেই থাকে।
৩. অতলে অন্তরীণ – ৫০
তেইশ জুলাই, শনিবার
সারা দেশে ২৯ জুলাইএর লংমার্চ এবং মহাসমাবেশ সফল করার জন্য মিছিল হচ্ছে, সভা সমাবেশ হচ্ছে। এমনকি মসজিদগুলোয় বিশেষ মোনাজাত হচ্ছে। সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদের গতকাল বায়তুল মোকাররম থেকে জুম্মার নামাজের পর মিছিল বের করে। নেতারা ঘোষণা করেছেন, ২৯ জুলাইয়ের আগে যদি সরকার তসলিমাকে ফাঁসি না দেন আর ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন না করেন, তবে ঢাকায় সেদিন মহাবিস্ফোরণ ঘটবে, ব্লাসফেমি আইন এদেশে কেউ ঠেকাতে পারবে না। আজ বাদ জোহর, বাদ আসর কেবল ঢাকায় নয়, সংগ্রাম পরিষদের নেতারা মানিকগঞ্জে যাচ্ছেন বক্তৃতা করতে, সাভারে যাচ্ছেন।
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকারমে গতকাল মসজিদের খতিব মাওলানা ওবায়দুর রহমান খুতবা পাঠ করেন, তসলিমা সহ সকল মুরতাদের ফাঁসি চাওয়া এখন প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানী দায়িত্ব।
সুপ্রীম কোর্টের রায়ে গোলাম আযম এ দেশের নাগরিকত্ব পেয়ে গেছেন। তাঁকে অভিনন্দন জানাতে এখন লোক যাচ্ছে জামাতে ইসলামির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। এসোসিয়েশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের প্রতিনিধিরাও তাঁকে অভিনন্দন জানাতে গিয়েছে। তাদের উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে গোলাম আযম বলেছেন, ইসলামকে বিজয়ীর আসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রয়োজন সঙ্ঘবদ্ধ প্রচেষ্টার। আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করতে হলে যে যেখানে আছে, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ২৮৮ ২৬ তারিখে চট্টগ্রামে গোলাম আযম জনসভা করবেন, জনসভাটি বিশাল এবং সফল করার জন্য জামাতে ইসলামী এখন চব্বিশঘন্টা ব্যস্ত। শক্তিশালী একটি মুল প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বারোটি সাবকমিটিও করা হয়েছে। পোস্টারিং, মাইকিং, যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা, প্রচার, আপ্যায়ন, নিরাপত্তাসহ নানা রকম সাব কমিটির কর্মীদের এখন দম ফেলার সময় নেই । গোলাম আযমের সভা হবে শুনে চট্টগ্রামের ছাত্রঐক্য বলছে, যে কোনও মূল্যে এই সভা ঠেকাবে তারা, প্রয়োজনে রক্ত ঝরবে।
