তসলিমা নাসরিনের নিরাপত্তা দিতে সরকারের প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন আবেদন জানিয়েছে। বাহ! বেশ কথা। এখন নিরাপত্তা দেওয়া হোক তবে। আমি যখনই চাই আমাকে ভিসা দেওয়া হবে ইউরোপে যাওয়ার, এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের যে কোনও দেশেই আমাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হবে। —এই খবরটি দেখে ঝ উত্তেজিত। তিনি বারবারই বলছেন — তোমার তো এখন আর কোনও দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই।
—কিন্তু..
—কিন্তু কি?
—ওরা যে বলছে যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করবে না! বলছে , একজন কুখ্যাত ও নির্লজ্জ মহিলার পক্ষে ওকালতি করে তথাকথিত সভ্য দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূতরা ঘৃণ্য মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। এ দেশে থেকে নির্লজ্জ মহিলাটি এ দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, কোরান হাদিস, নবী রাসুল ও পীর মাশায়েখগণের বিরুদ্ধে যে অশ্লীল মন্তব্য করে চলেছে, অথচ তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি.. ঝ ঝট করে কেড়ে নিয়ে আমার হাতের কাগজটি, বললেন—বাদ দাও। ওরা কিμছু করতে পারবে না। ইনকিলাবের খবর তোমার পড়াই উচিত না।
আমি বলি—ইত্তেফাকের খবরও তো তাই। প্রতিটি ঘরে নাকি আমাকে সন্ধান করবে এখন। আমার প্রশ্ন, যদি পেয়ে যায়! পেয়ে গেলে তো..
ঝনঝন করে ওঠেন ঝ—আবারও ভাবছো এসব কথা!
বড় শ্বাস ফেলে বলি —ভাবতে তো চাই না!
—তাহলে ভাবার দরকার কি? ভাবা বাদ দিয়ে দাও। ছবি কতদূর আঁকলে বল। ছবির কথা বল।
ছবির কথা আমার বলা হয় না। বিচিত্র সব ছবি রচনা করতে থাকি কল্পনায়। মস্তিষ্কে কুটকুট করে কামড়ায় কতগুলো অসভ্য শব্দ। –তসলিমা নাসরিনকে আশ্রয়দান সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত উস্কানিমূলক এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইউরোপীয়দের গভীর ষড়যন্ত্রের নীল নকশার বহিঃপ্রকাশ। তসলিমা নাসরিন বহিঃশক্তির ক্রীড়নক, তাহাকে আশ্রয়দানের প্রতিশ্রুতিই ইহার জ্বলন্ত প্রমাণ। ইহা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপের শামিল। এটুকু বলতে বা পড়তেই ইত্তেফাকটি আমার হাত থেকে নিয়ে যান ঝ।
কিছুক্ষণ চুপ হয়ে থাকি দুজন। কিছুক্ষণ গানে, ধুমপানে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে মন দিয়ে আবার মন চলে যায় মুফতী আমিনীতে। কাল এক জনসভায় আমিনী বলেছেন, ইউরোপীয় গোষ্ঠী যদি তসলিমাকে রক্ষা করতে আসে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেই জেহাদ ঘোষণা করবো। আমাদের আন্দোলনকে যারা সমর্থন দেবে, তিনি যে মতের বা ধর্মেরই হোক না কেন, তা আমরা সাদরে গ্রহণ করব। যে দাবিতে হরতাল হয়েছিল, তার একটিও সরকার মেনে নেয়নি। কোনও সরকারই তোহিদী জনতার দাবি মেনে নেয়নি। বর্তমান সরকারও মানছে না। তাই সরকারের কলম ভেঙে দিয়ে আমরা সে কলমের অধিকারী হয়েই দাবিসমূহ পূরণ করে নেব। এখন কেবল টুপিওলাদেরই নয়, টুপি ছাড়াদেরও দাবি ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করা।
ঝ মুফতি আমিনী নিয়ে ভাবছেন না, ভাবছেন উনত্রিশ তারিখে লং মার্চের কাফেলা নিয়ে। ঝর বিশ্বাস উনত্রিশ তারিখের আগে যদি কিছু একটা না হয়..
—কিছু একটা না হয়? কিছু একটাটা কি?
—কিছু একটাটা হল তোমার যদি জামিন না হয়, তোমার যদি দেশ ছাড়া না হয়..
—না হলে কী হবে?
—না হলে অনেক কিছু হতে পারে।
অনেক কিছু কি হবে তা ঝ আর বলেন না। বুঝি কি হবে। বুঝি যে আমার খবর যদি কোনওভাবে পেয়ে যায় ওরা, যদি হাতের কাছে পেয়ে যায়, বুঝি যে ঘরে ঘরে তল্লাশি চালিয়ে বা অন্য কোনও বুদ্ধি খাটিয়ে আমাকে যদি ধরে ফেলে ওরা, তবে তো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাহায্যের আর প্রয়োজন হবে না আমার জীবনে। কিছুরই আর কোনওদিনই আমার প্রয়োজন হবে না। বুঝি, ঝ নিঃশব্দে ভাবছেন এসব। তিনি আজ বা কালই, কাল না হলেও পরশু কিছু একটা ঘটুক চাইছেন। মনে মনে তিনি মঙ্গলদীপ জ্বালিয়ে রাখছেন মনে।
ভাবনাগুলো আমাদের আরও নিশ্চুপ করে রাখে। ঝ আর ঘুমোতে যান না দোতলায় তাঁর শোবার ঘরে। এ ঘরেই শুয়ে থাকেন। সারারাত আমি ছবি আঁকি। সারারাত শুয়ে শুয়ে আমার ছবি আঁকা দেখেন ঝ। ক্যানভাসে ঝ। ঝ ক্রমশ সত্যিকার ঝর মতো দেখতে হচ্ছেন। বড় বিনয়-স্বরে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছি —আদৌ কি কিছু হচ্ছে?
ছবির দিকে মুগ্ধ তাকিয়ে থেকে বললেন —তুমি কত বড় লেখক আমি জানি না, তবে তুমি অনেক বড় শিল্পী। যদি বেঁচে থাকো..
ঝ থেমে যান। আমি জিজ্ঞেস করি—যদি বেঁচে থাকি, তবে কী ?
ধীরে বলেন তিনি—লেখালেখি যদি ছেড়ে দাও আমার কোনও আপত্তি নেই, তবে জীবনে ছবি আঁকাটা ছেড়ো না। তুমি অনেক বড় শিল্পী হতে পারবে।
ঝর এই প্রেরণা আমাকে ব্যস্ত রাখে ছবি আঁকায়। আমাকে তিনি আরও ক্যানভাস, আরও রং, আরও তুলি এনে দেন।
৩. অতলে অন্তরীণ – ৪৯
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন তসলিমা নাসরিনকে বাংলাদেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থাকে অনুসরণ করতে হবে। সেটাই তার জন্য মঙ্গলজনক। আজকের কাগজের সাংবাদিকের সঙ্গে তিনি টেলিফোনে তসলিমা বিষয়ে কথা বলেছেন। ইউরোপীয় দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা লেখিকা তসলিমাকে বাংলাদেশের বাইরে যে কোনও দেশে যেতে দেবার যে আবেদন জানিয়েছে তার জবাবে সরকার কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে? বললেন, আমরা এখনও এর জবাব চূড়ান্ত করিনি। ৩০ জন মার্কিন সিনেটরসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তাঁরা অভিযোগ আনছেন যে লেখিকা তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে মামলা করে সরকার মৌলবাদীদের সোচ্চার হতে সাহায্য করেছে। এর জবাবে সরকারের পক্ষ থেকে আপনি কি বলবেন? মন্ত্রী বলেছেন, ২৯৫(ক) ধারায় যে মামলাটি করা হয়েছে, সেই আইনটি বৃটিশরা অত্যন্ত সুচিন্তিত ভাবে প্রণয়ন করে গেছেন। আজকে যদি সরকার নিজে মামলা না করত, তবে দেশের ৬৪টি জেলার কোর্ট থেকে কেউ না কেউ মামলা করে বসত। তখন মেয়েটার অবস্থা কি হত? এই আইনে তাই সরকারকেই মামলা করতে হয়েছে যাতে অন্যরা মেয়েটিকে হয়রানি করার সুযোগ না পায়। যদিও এই আইনটি নন বেইল-এবল, তবু কোর্টের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে মেয়েদের প্রতি উদার সিদ্ধান্ত নেবার। সরকার কি জামাত আর মৌলবাদীদের দাবি অনুসারে ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন করবে? আমি তো পার্লামেণ্টে একবার বলেছি এই ধরনের আইন প্রণয়নের ব্যাপারে পার্লামেন্টই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কি? সরকার এই মুহূর্তে কিছু ভাবছে না। তবে ভবিষ্যতে যে ভাববে না তা এখনই বলা যাচ্ছে না। আমরা সর্বতোভাবে চাইব দেশের আইনগুলোর ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবহার এবং ধর্মনিরপেক্ষ আইনের সংরক্ষণ। দেশের মৌলবাদী তৎপরতায় দাতাদেশগুলোর ক্রমাগত উদ্বেগের ফলে দেশের উন্নয়নের প্রয়োজনে বিদেশি সাহায্য প্রবাহে কোনও অসুবিধে হবে কি? না অতটা খারাপ অবস্থা ঘটার মত দুর্ভাগ্যের কোনও কারণ দেশে ঘটেনি। দেশে মৌলবাদী শক্তিগুলো যে ক্রমাগত রাজনৈতিক শক্তি অর্জনের চেষ্টা করছে সেদিকে তাকিয়ে সরকার কি চিন্তিত? সরকারের জন্য তারা থ্রেট হয়ে উঠছে কি? তাদের এই তৎপরতা খুবই সাময়িক। সরকার বা বিএনপির জন্য তারা কোনও ফ্যাক্টর না। গোলাম আযমের ব্যাপারে আইন যেমন নিজস্ব ধারায় চলেছে, তেমনি তসলিমার ব্যাপারেও আইন নিজস্ব ধারায় চলবে। শেষ প্রশ্নটি ছিল, সরকার কি তসলিমাকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে? মন্ত্রী এ ধরনের উদ্ভট খবরকে জোর গলায় নাকচ করেছেন।
