আমি বললাম—রাহমান ভাই, আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। আমি খুব ভুল বুঝেছিলাম আপনাকে। আমার মাথার ঠিক ছিল না তখন!
—বুঝি। বুঝতে পারি সব।
একটু থেমে, আগের সেই ভুল বোঝাটিকে মন থেকে বিদেয় করি।
—কী হচ্ছে রাহমান ভাই এসব? এসব কী হচ্ছে দেশে?
—কি বলব বল। ভাষা নেই কিছু বলার।
—আমি কি বেঁচে থাকতে পারব রাহমান ভাই? নাকি ওরা আমাকে সত্যিই মেরে ফেলবে?
দীর্ঘশ্বাস ফেলেন শামসুর রাহমান। চোখ তাঁর ছলছল করে।
—যদি ব্লাসফেমি আইন পাস হয়ে যায়!
—তাহলে আমাদের সবাইকেই মরতে হবে।
—এই যে মোল্লাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে এখন, এতে কি ঠেকানো যাবে না ব্লাসফেমি আইন?
—আন্দোলনে কতটুকু কাজ হবে জানি না। চেষ্টা তো করছি কিছু করতে। খালেদা জিয়ার সরকার দেশটাকে ধ্বংস করে দিল। মোল্লাদের পক্ষে কাজ করছে। তাই তো দেশসুদ্ধ যা ইচ্ছে তাই করছে মোল্লারা।
দেশ নিয়ে আমাদের আরও কথা হতে থাকে। রাজনীতির আরও গভীর আলোচনা হতে থাকে। ধীরে ধীরে এমন হয় যে আমি ভুলে যাই যে আমি এখন পলাতক, আমার সামনে ফাঁসির দড়ি। ভুলে যাই যে একটি ভয়াবহ অনিশ্চিত জীবন আমার। যেন আমি আগের আমি। আগের আমি যেমন করে শামসুর রাহমানের সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করতাম যে কোনও বিষয়ে, দেশ সমাজ রাজনীতি সাহিত্য সংস্কৃতি, তেমন গল্প করছি। দুচোখে স্বপ্ন আমাদের। সত্যিকার একটি গণতান্ত্রিক সেকুলার রাষ্ট্রের স্বপ্ন, বৈষম্যহীন একটি সুস্থ সমাজের স্বপ্ন। কোনও নির্যাতন নেই, অত্যাচার নেই, অন্যায় নেই, দুর্নীতি নেই, উৎপীড়ন নেই এমন জীবনের স্বপ্ন। হঠাৎ সেসব হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলো ফিরে আসতে থাকে আমার মধ্যে। নিজের ছোট্ট গণ্ডির মধ্যে নিজের মৃত্যুভয়টি নিয়ে বেঁচে থাকা আমি অন্যরকম হয়ে উঠি। বেশিরকম আমি হয়ে উঠি। শামসুর রাহমান আমার প্রাণটি আমার দৃঢ়তাটুকু আমাকে ফিরিয়ে দিয়ে যান। যান, যেতে হয় তাঁকে। যান অনেক রাতে।
সেই রাতেই ঝকে বলি, আমি ছবি আঁকব।
ঝ জিজ্ঞেস করলেন—ছবি আঁকতে জানো তুমি।
—জানি না কিন্তু চেষ্টা করব।
—কি ছবি আঁকবে?
—তোমাকে।
—আমাকে?
—তোমার একটি ছবি দাও।
ঝ একটি ক্যানভাস আর ছবি দিলেন। রঙ তুলি দিলেন। কি করে রং তুলিতে নিতে হয় শিখিয়ে দিলেন। আমি শুরু করে দিই। সারারাত আঁকি। যেন নতুন একটি জীবন আমার, এই জীবনের সঙ্গে গত প্রায় দুমাসের জীবনের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। যেন ইচ্ছে করলেই আমি ঘর থেকে বেরিয়ে কোথাও হেঁটে আসতে পারি। যেন কোথাও কেউ কখনও আমাকে মেরে ফেলার দাবি ওঠায় নি কোনওদিন।
৩. অতলে অন্তরীণ – ৪৪
সতেরো জুলাই, রবিবার
খবরের তো শেষ নেই। প্রতিদিনই ঘটনা, প্রতিদিনই খবর। তসলিমা নাসরিনদের সংস্কৃতি দেশ ও সমাজকে কলুষুষতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে —- এই শিরোনামটিতে নজর পড়ে। ঘটনাটি কি? ঘটনা হল পূর্তমন্ত্রী ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে মাদকবিরোধী এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দিয়েছেন। কিন্তু মাদকবিরোধী অনুষ্ঠানে তসলিমা-প্রসঙ্গ কি করে ওঠে? ওঠে। ওঠাতে চাইলেই ওঠে। দেশের সর্বত্র যখন এই প্রসঙ্গ যে কোনও কিছুতেই উঠছে, তবে মাদকাসক্তি থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষার জন্য যে বক্তৃতা সেখানে উঠবে না কেন! উঠছে ধর্ম প্রসঙ্গে। রফিকুল ইসলাম মিয়ার বিশ্বাস, ধর্মীয় মূল্যবোধ না থাকলেই লোকে মাদকদ্রব্য সেবন করে। ধর্মীয় মূল্যবোধটি নষ্ট করল কে? নষ্ট করেছে তসলিমা। তাই দেশে মাদকাসক্তি বাড়ার কারণটিও তসলিমা। দেশে খুন হত্যা সন্ত্রাস যা কিছুই ঘটবে, তার সবকিছুর কারণ তাহলে তসলিমা। কারণ তসলিমা ধর্ম মানে না। ধর্ম না মানলে যত মন্দ কাজ আছে সমাজে, সবই করে লোকে। মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে রফিকুল বললেন, সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে, এটা কোরানের কোথাও লেখা নেই, এ নিতান্তই কোরানের বিরুদ্ধে প্রচারণা, ধর্মকে আঘাত করে, ধর্মের অবমূল্যায়ন করে কেউ কিছু লিখবেন না, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করবেন না, এ দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ ধর্মের ওপর আঘাত সহ্য করে না, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধকে নস্যাৎ করার জন্য একটা মহল তসলিমাকে নিয়ে মাতামাতি করছে, এরা সমাজ সভ্যতাকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করছে। যে কথাটি জোর দিয়ে পূর্তমন্ত্রী বলেছেন তা হল, তসলিমা নাসরিনদের মত লেখকদের লেখার কারণে মানবসভ্যতা বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। তাদের তথাকথিত সংস্কৃতি দেশ ও সমাজকে কলুষতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। শরীর আমার সিদ্ধান্ত আমার এই সব বক্তব্য সভ্যতার চিহ্ন নয়। এরা সভ্যতাকে ধ্বংস করতে চায়।
তাহফিজে হারমাইন পরিষদের সভাপতি মাওলানা সাদেক আহমেদ সিদ্দিকী বিবৃতি দিয়েছেন, কোরান হাদিসের অবমাননাকারী তসলিমা ধর্মদ্রোহী ও রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরও সরকার রহস্যজনক কারণে সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। আজ এ কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে তসলিমা নাসরিন ভারতের হাতের পুতুল। সে আত্মগোপন অবস্থায় বিদেশি সংবাদ মাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে যাচ্ছে, অথচ সরকার তাকে খুঁজে পাচ্ছে না — এ কথা মানা যায় না। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, সরকার ভারতকে অখুশী করতে চায় না।
এসব খবর আমি শুনতে চাই না, সামান্য হলেও দেখতে চাই কিছু একটা ঘটছে দেশে, দেশটি মৌলবাদীদের হাতের মুঠোয় চলে যাচ্ছে না, আমি বিশ্বাস করতে চাই না যে, দেশটিতে এখন ইসলামী শাসন কায়েম হবে, আল্লাহর আইনে চলবে দেশ, মেয়েদের ঘরবন্দি করা হবে, পান থেকে চুন খসলে পাথর ছুঁড়ে মারা হবে। না, আমি ভাবতে চাই না আর কি কি হবে। অন্যরকম কিছু একটা দেখতে চাই। কতটুকু সত্য তা জানি না, কিন্তু আজকের কাগজ, যে কাগজটি মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনের কথা যে করেই হোক লেখে, লিখেছে মৌলবাদী শক্তির উত্থানের বিরুদ্ধে দেশে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠার প্রস্তুতি চলছে। সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ছাত্রসমাজ সচিবালয় ঘেরাও করবে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট দেশব্যাপী ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য মৌলবাদ বিরোধী পক্ষ পালন করবে। একাত্তরের ঘাতক বিরোধী আন্দোলনের জাতীয় কেন্দ্র জাতীয় সমন্বয় কমিটি নিয়মিত বৈঠক করছে। নারী সংগঠনগুলো ব্যাপক কর্মসূচির কথা ভাবছে। এই ভাবাভাবির পর পত্রিকার মন্তব্য, জামাত বনাম অন্যান্য ধর্মান্ধ শক্তির মধ্যে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের যে লড়াই লক্ষ করা যাচ্ছে, মৌলবাদী শিবিরে অনৈক্যের এই প্রধান দুর্বলতার কথা মাথায় রেখে প্রগতিশীল সামাজিক রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যে ঐক্যের কোনও বিকল্প নেই, এই দাবি এখন দেশের সর্বত্র।
