দেশের সর্বত্র কি এই দাবি? না। ঠিক নয়। এই দাবি অল্প কিছু মানুষের, যারা বুঝতে পারছে এ ছাড়া আর কোনও উপায় নেই দেশটিকে রক্ষা করার।
রাতে জ ঘরে ঢুকলেন তাঁর এক বন্ধুকে নিয়ে। জ বললেন যে বন্ধুটি প্রগতির পক্ষের লোক, যদিও সরকারি চাকরি করেন। এই বন্ধুটির ওপর তাঁর সম্পূর্ণ আস্থা আছে বলেই তিনি এখানে নিয়ে এসেছেন। ঝ আপত্তি করেননি, আমি তো করিইনি। জর বন্ধুর সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর তাঁকে ভাল মানুষ বলেই মনে হয়। বন্ধুটি আমাকে বলেন— আপনার ভয় পাওয়ার কিছু নেই, মোল্লারা আপনাকে কখনই মারবে না। কারণ আপনাকে মারলে তাদের রাজনীতি করার কোনও ইস্যু থাকবে না। আপনাকে আর যারাই মারুক, মোল্লারা চাইবে আপনাকে বাঁচিয়ে রাখতে।
যুক্তিটি খুব খারাপ দেননি তিনি। কিন্তু এতে কি নিশ্চিন্ত হওয়া যায়! মৌলবাদী নেতারা না হয় আমাকে একটি জব্বর ইস্যু ভাবছে, রাজনীতি তাদের উদ্দেশ্য, ক্ষমতা দখল করা উদ্দেশ্য কিন্তু শত শত রাজনীতিঅজ্ঞ ধর্মান্ধ লোকও দলে আছে, ধরা যাক সেসব কোনও লোক অথবা মাদ্রাসার কোনও ছেলে, যে ছেলে রাজনীতি বা ইস্যু এসব এখনও শেখেনি, যাকে তার নেতারা বার বার বলেছে যে তসলিমা ইসলামকে ধ্বংস করে ফেলছে, তার মৃত্যু হওয়া উচিত, শুনে শুনে ছেলে বিশ্বাস করেছে যে আমাকে মারলে সে বেহেসতে যেতে পারবে, সে কেন আমাকে খুন করতে চাইবে না!
বন্ধুটি এই প্রশ্নের কোনও উত্তর দেন না। সারা মুখে চিকচিক একটি আনন্দ নিয়ে বলেন—সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ছাত্র সমাজ আজ সচিবালয় ঘেরাও করেছে। কোনও কোনও শহরে নাকি ডিসি অফিসও ঘেরাও করেছে। ছাত্রসমাজ কিছুতেই সাম্প্রদায়িক শক্তিকে আর বাড়তে দেবে না। বললেন জর বন্ধু।
আচ্ছ!, আমি উদাসীন স্বরে বলি—মৌলবাদীদের কেন আজকাল সাম্প্রদায়িক শক্তি বলা হয়?
—তারা সাম্প্রদায়িক, তাই সাম্প্রদায়িক বলা হয়।
—কিন্তু তারা কি কেবলই সাম্প্রদায়িক? আর এখন তো কোনও সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে মারামারি হচ্ছে না যে তাদের সাম্প্রদায়িক বলে চিহ্নিত করতে হবে!
—তাহলে কি বলা উচিত তাদের? জর বন্ধু জিজ্ঞেস করলেন।
—ইসলামী মৌলবাদী বা ইসলামিক বা ধার্মিক বা ধর্মীয় শক্তি এধরনের কিছু। ধর্মীয় মৌলবাদী হলেই তো সাম্প্রদায়িক হয়, প্রগতিবিরোধী হয়, নারীবিরোধী হয়। আলাদা করে তাদের তো আর সাম্প্রদায়িক বলে ডাকার প্রয়োজন হয় না।
জ বললেন—সাম্প্রদায়িকতা এ দেশে খুব ঘটে বলেই সম্ভবত ওদের সাম্প্রদায়িক বলা হয়।
আচ্ছ!! খানিক থেমে আমি বলি—সাম্প্রদায়িকতা মানেটা কি? ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষদের ঘৃণা করা, এই তো! কিন্তু সম্প্রদায় বলতে এখানে কি বোঝানো হচ্ছে? হিন্দু সম্প্রদায়, মুসলিম সম্প্রদায়, বৌদ্ধ সম্প্রদায়, খ্রিস্টান সম্প্রদায়। তাই তো! সকলে মাথা নাড়েন।—হ্যাঁ তাই।
—তার মানে সম্প্রদায়টা ধর্মের ভিত্তিতে আমরাই সৃষ্টি করে দিচ্ছি। তার মানে আমরা বলে দিচ্ছি গৌতম রায় আর গোলাম হোসেন দুই বন্ধু, একই সঙ্গে একই আদর্শে বড় হয়ে উঠেছে, কিন্তু তারা ভিন্ন, কারণ তারা ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক। ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে এই যে এক একটি সম্প্রদায়ভুক্ত করে ফেলা,আলাদা করে ফেলা, এই ব্যাপারটিই, এই মানসিকতাটিই তো সাম্প্রদায়িক। ধর্ম আমাদের কাছে বড় হচ্ছে কেন?
—তাহলে তাদের কী বলে ডাকবেন, সেই মুসলমানদের, যখন তারা হিন্দুদের অত্যাচার করে?
—তারা মুসলমান বা বৌদ্ধের বিরুদ্ধে অত্যাচার করলে কি বলে ডাকা হবে? অত্যাচারী। মানবতাবিরোধী। এ-ই কি যথেষ্ট নয়?
—না। যথেষ্ট নয়। জর বন্ধু বললেন —কারণ ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে যদি কাউকে ঘৃণা করা হয়, অত্যাচার করা হয়, তবে সেটি এত জঘন্য যে তাদের কেবল অত্যাচারী বললে কম বলা হয়।
—কম বলা হয় না। মানবতাবিরোধী বা মানববিরোধী শব্দটি তো সাম্প্রদায়িক শব্দের চেয়েও অনেক কুৎসিত, অনেক নিষ্ঠুর। আমার মনে হয় সম্প্রদায়ের ভাগটা ধর্মের ভিত্তিতে হওয়া উচিত নয়। হওয়া উচিত আদর্শ বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে। যেমন সেক্যুলার সম্প্রদায় আর মৌলবাদী বা ফাণ্ডামেন্টালিস্ট সম্প্রদায়।
—কিন্তু যারা এই দুই দলের কোনও দলে পড়ছে না। তাদের কি করবেন? যারা সেক্যুলারও নয়, ফাণ্ডামেন্টালিস্টও নয়? জর বন্ধু জিজ্ঞেস করেন।
—বিরোধ তো আসলে দুটো দলেই। সেক্যুলার আর ফাণ্ডামেন্টালিস্টের মধ্যে কনফ্লিক্ট হচ্ছে। এখন না সেক্যুলার না ফাণ্ডামেন্টালিস্ট লোকেরা হয় দূরে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ দেখবে, নয়ত কোনও একটি পক্ষ নেবে।
ঝ, জ, জর বন্ধু একে অপরের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করেন।
হঠাৎ কোনও প্রসঙ্গ ছাড়াই আমি একটি প্রশ্ন করি—শব্দের কথাই যখন হচ্ছে, বলেন তো বর্ণবাদী আর সাম্প্রদায়িক এই দুটো শব্দের মধ্যে কোনটিকে বেশি খারাপ বলে মনে হয়?
জ বলেন — আমার কাছে তো সাম্প্রদায়িককেই বেশি জঘন্য মনে হয়।
বাকি দুজনের কাছেও তাই।
আমি চুপ হয়ে যাই। নিজের বিক্ষিপ্ত ভাবনাগুলো দুহাতে জড়ো করতে থাকি একটি বিন্দুতে।
৩. অতলে অন্তরীণ – ৪৫
আঠারো জুলাই, সোমবার
সারাদিন ছবি আঁকি। ঘোরের মধ্যে ছবি আঁকি। সারাদিন ঝর দেখা নেই। সারারাত দেখা নেই। রাত দশটার দিকে এক থালা ভাত নিঃশব্দে দরজার তল দিয়ে চলে আসে ঘরে। ক্ষিধে তৃষ্ণার বোধ তখন আর নেই আমার। ভাত ভাতের মত পড়ে থাকে। আমি আমার মত।
