প্রতিদিন সারাদেশে সভা মিছিল হচ্ছেই, হচ্ছেই ২৯ জুলাইএর লং মার্চের জন্য। ২৯ জুলাই এর লং মার্চ সফল করার জন্য ব্যাপক আয়োজন চলছে। কোনও নগর বন্দর শহর গ্রাম বসে নেই, প্রচণ্ড উৎসাহ উদ্দীপনা সকলের মধ্যে। কোনও শহর নেই দেশে যে শহরে লং মার্চের জন্য সভা বা মিছিল হচ্ছে না। কোনও গ্রাম নেই দেশে, যে গ্রামে লং মার্চ সফল করার পোস্টার পড়ছে না। কোনও এলাকা নেই দেশে, যে এলাকায় মানুষেরা তসলিমাকে ফাঁসি দেবার স্বপ্ন দেখছে না।
গতকাল জুম্মার নামাজ শেষে দেশের প্রতিটি মসজিদে ২৯ জুলাইয়ের লংমার্চ সফল করার লক্ষ্যে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। খবরটি ঝর মুখে প্রথম শুনি। পরে অবশ্য পত্রিকার পাতাতেও দেখি। বড় বড় মসজিদের দোয়া সমাবেশে লং মার্চের বড় বড় নেতা ভাষণ দেন। তসলিমার মৃত্যু কামনায় আল্লাহর দরবারে হাত ওঠানো হয়।
—বদমাশগুলো এখন খতিবকে বাঁচাবার চেষ্টা করছে। ঝ বলেন।
—কি রকম? খতিব আবার মরলো কবে?
—ওই যে বলেছিল যে সংসদে কেউই মুসলমান নয়। এখন মৌলবাদ-বিরোধীরা বলছে খতিব সংসদকে অপমান করেছে। খতিবের শাস্তি হওয়া উচিত। শুনে মৌলবাদীরা বলছে, বিশেষ করে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর কথা, যে, তাঁকে তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে আর জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
গান চলছে, গানের আড়ালে কথা বলছি আমরা। খেতে খেতে কথা বলছি। এক থালা থেকে ভাত তুলে খেতে খেতে কথা। ঝর থালা থেকে খেয়ে খেয়ে এখন অভ্যেস হয়েছে, আলাদা পাতে কি করে খেতে হয়, বোধহয় ভুলেই গেছি। গান চলতে থাকলেই কেবল কথা বলতে হয় আমার। এতেও এমন অভ্যেস হয়ে গেছে যে গান থেমে গেলে কথাও আমার থেমে যায়। বাড়ির সকলে জানে যে ঝ আজকাল এ ঘরে একা বসে তাঁর খাবার খান, সকলে জানে যে ঝ একা একা অনেক রাত পর্যন্ত গান শোনেন, জানে যে ঝর কিছু হাতে গোনা বন্ধু বান্ধবকে ওপরের এই ঘরটিতে ডেকে আনা হয়, এ ঘরে বসেই তাঁরা কথা বলেন। বাইরের বন্ধুরা চলে গেলে ঝ এই ঘরে একা একা গান শোনেন আর ছবি আঁকেন। জানে যে ঝ ছাড়া এ ঘরটিতে আর কোনও প্রাণী নেই।
—মৌলবাদীরা ঠিক কম্যুনিস্টদের মত কাজ করছে। আমি বলি।
ঝ জোরে হেসে উঠে বললেন—এরা তো একজন আরেকজনের শত্রু।
আমি বলি—কম্যুনিস্ট পার্টি যেভাবে কাজ করত, যেরকম অরগানাইজড ছিল তারা, যেরকম কমিটেড, মৌলবাদী সংগঠনগুলো ঠিক তাই, তারা কম্যুনিস্ট পদ্ধতিটা ব্যবহার করছে।
ঝ বললেন—তা ঠিক। এদিকে কম্যুনিস্টরা হয়ে গেছে ফাঁকিবাজ।
কতটুকু ফাঁকিবাজ হয়েছে অথবা আদৌ হয়েছে কি না সে নিয়ে আমাদের আলাপ বেশি এগোয় না কারণ দরজায় ঝর বাড়ির কাজের এক মেয়ে এসে দরজায় টোকা দিয়ে বলে, বাড়ির দরজায় কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে ঝর সঙ্গে দেখা করতে। ঝ দ্রুত উঠে যান। বাইরে থেকে এ ঘরের দরজায় তালা লাগাতে ঝ ভোলেন না। অনাকাঙ্খিত কারও উপস্থিতি আমাদের আতঙ্কিত করে। কোনও অচেনা আগন্তুক এ বাড়ির দরজায় দাঁড়ালে অবশ্যই আশঙ্কা হওয়ার কথা। কে এসে দাঁড়িয়েছে, সে আমি জানি না। আমি কান পেতে থাকি, কোনও অশোভন শব্দ ভেসে আসে কি না। আশঙ্কায় কান পেতে থাকি। খোপের দিকে চোখ চলে যায় বারবার। দোতলার বারান্দায় কথাবার্তা হচ্ছে কোনও, শব্দ কানে আসে। কিন্তু অনুমান করতে পারি না, কি কথা। কি কথা কার সঙ্গে! ঘণ্টা খানিক পর ঝ দুমিনিটের জন্য এসে বলে যান, তাঁর এক আত্মীয় এসেছিল, দুদিন থাকার ইচ্ছে নিয়ে এসেছিল আত্মীয়টি, তাকে নানা কৌশল করে বিদেয় করেছেন তিনি।
রাতে ঝ আর এ ঘরে আসবেন না। সারারাত আমাকে অন্ধকারে স্থির শুয়ে থাকতে হবে, সারারাতই আশঙ্কারা আমার চারপাশে নৃত্য করবে, এরকমই জানি। এরকমই হয় আমার একাকী রাতগুলোয়। কিন্তু রাত তখন কত জানি না, আমাকে চমকে দিয়ে ঝ দরজা খুলে ঢোকেন। হাতে তাঁর ছোট্ট একটি টর্চ। ঝর পেছনে ঙ, ঙর পেছনে যে মানুষটি, তাঁকে দেখে নিজের চোখকে আমি বিশ্বাস করতে পারি না। তিনি শামসুর রাহমান। ভালবাসায় আবেগে কাউকে জড়িয়ে ধরার অভ্যেস আমাদের নেই। কিন্তু আমার ইচ্ছে করে শামসুর রাহমানকে জড়িয়ে ধরতে, তাঁর কাঁধে মাথা রেখে আকুল হয়ে কাঁদতে। শামসুর রাহমান, ঙ, ঝ সব মেঝেয় বসে গেলেন। ঘরের আবছা আলোর বাতিটি জ্বেলে দেওয়া হল। আমার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে রইলেন শামসুর রাহমান, আমার একটি হাত তাঁর হাতে। এই হাতটি আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, আশ্বাস দিচ্ছে, এই হাতটি আমাকে নির্ভরতা দিচ্ছে, অভয় দিচ্ছে। আমরা দুজন কেউ কোনও কথা বলছি না। কেবল তাকিয়ে আছি দুজন দুজনের দিকে। আমাদের চোখে নিশ্চয়ই কোনও ভাষা আছে, যা আমরা পড়তে পারছি। আমরা তো জানি আমাদের কথা। আমরা তো জানি কি ঘটে যাচ্ছে আমাদের জীবনে। যুদ্ধক্ষেষেন পরাজিত দুজন সৈনিক যেমন করে নিজেদের দিকে তাকায়, যে সহমর্মিতা নিয়ে, যে উৎকণ্ঠা আর আশাহীন বেদনা নিয়ে, যে কষ্ট আর যন্ত্রণা নিয়ে, তেমন করে আমরা তাকিয়ে আছি। নীরবতা ভাঙলেন ঙ।
—যেদিন আমি শামসুর রাহমানকে বললাম তুমি কোথায় আছো তা আমি জানি, তারপর অনেকদিন তিনি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত আজ হল সুযোগ।
শামসুর রাহমান ধীরে মৃদু কণ্ঠে বললেন—তুমি কিছু মনে করো না সেদিনের সেই ফোন রেখে দেওয়ার জন্য। আমি খুব নার্ভাস ছিলাম।
