বিবিসিতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর অ্যানিটা টিসেন বলেছেন, মৌলবাদীরা তসলিমা নাসরিনকে হত্যার হুমকি দেওয়ার পরও সরকার তাকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা তসলিমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাহার করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহবান জানাচ্ছি। আমরা তার নিরাপত্তার উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং যারা তাকে হত্যার হুমকি দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানাচ্ছি। নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধানের প্রশ্নে সরকারের একটা দায়দায়িত্ব রয়েছে। আমরা দেখতে চাই, মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বাংলাদেশেও সমুন্নত রয়েছে। তসলিমা নাসরিন তার দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিলে এবং স্বদেশে ফিরে গেলে তার প্রাণের ভয় থাকলে আমরা তাকে জোর করে ফেরত না পাঠানোর জন্য দ্বিতীয় দেশটির কাছে আহবান জানাবো।
বিবিসি থেকে বাংলাদেশ সরকারের পূর্ত মন্ত্রীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় এ ব্যাপারে। রফিকুল ইসলাম মিয়া যা বলেন তা হল, তসলিমা আসলে কোথায় আছেন সরকার তা জানে না। কয়েকদিন আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও সংসদে এ কথা বলেছেন। তসলিমা অ্যামনেস্টির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, কিন্তু সরকারের সঙ্গে কেন যোগাযোগ করছেন না! তাঁর বিরুদ্ধে একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। কারও বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হলে, দেশের আইন অনুসারে তিনি নিজেকে স্বাভাবিকভাবেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে সোপর্দ করবেন। এছাড়া তিনি আদালতের মাধ্যমে জামিনের আবেদন করতে পারেন। তসলিমা যদি আদালতে আত্মসমর্পণ করেন, তবে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাঁকে পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হবে। কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তা যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তারা তসলিমার বিরুদ্ধে কিছু করতে পারবে না। তসলিমাকে কেউ হত্যার হুমকি দিয়েছে, এ খবর সরকারের জানা থাকলে নিশ্চয়ই তাকে যারা হুমকি দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নেবে।
আমার ভাল লাগে ভাবতে যে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মত বড় একটি সংস্থা আমার জীবন বাঁচাবার জন্য চেষ্টা করছে। এতে কি কাজ হবে? ঝ বলেন, নিশ্চয়ই হবে। আমার প্রশ্ন, দেশে দেশে কত মানুষকেই তো অত্যাচার থেকে বাঁচাতে অ্যামনেস্টি চেষ্টা করে। অ্যামনেস্টি কি সকলকে বাঁচাতে পারে? পারে না তো। অ্যামনেস্টির আবেদন কি সব দেশের সরকারের কানে ঢোকে? ঢোকে না তো! ঢুকলে দেশে দেশে বর্বরতা জন্মের মত শেষ হত।
ঝর হাতেই দিয়েছিলাম অ্যামনেস্টির কাছে লেখা আমার চিঠিটি গত পরশুদিন। ঝ আমাকে বলছিলেন এভাবে মরার মত বসে না থেকে চেষ্টা করতে কিছু। চেষ্টা করার আছে কি আমার! অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, লেখক সংগঠন পেন ফতোয়ার পর আমাকে চিঠিপত্র পাঠিয়েছিল। তারা যেহেতু আমাকে সাহায্য করার জন্য নিজ দায়িত্বেই এগিয়ে এসেছিল, তাদেরকেই জানানো যেতে পারে যে পারলে যেন আমাকে সাহায্য করে এবার। এখনই আমার সত্যিকার সাহায্য প্রয়োজন। ঝ ফ্যাক্স করে দিয়েছেন অ্যামনেস্টির কাছে লেখা চিঠিটি। আদৌ চিঠিটি কারও হাতে পৌঁছবে কি না, আদৌ চিঠিতে কোনও কাজ হবে কি না, তা না জেনেই শেষ চেষ্টা করার মত লিখেছিলাম চিঠি, পারলে আমাকে যেন এই বিপদ থেকে উদ্ধার করার চেষ্টা করে, যেন আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার জন্য সরকারকে বলে। কিন্তু সরকার মুখে যতই কথা বলুক, কি করে বিশ্বাস করতে পারি যে এই সরকার আদৌ আমাকে কোনও নিরাপত্তা দেবে! ঝকে বলি, তাহলে আদালতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করিই না হয়। ঝ বলেন, তোমার মাথা খারাপ হলে যাও।
—কেন, এখন তো ঠেলায় পড়ে সরকার থেকে বলা হচ্ছেই যে আমি চাইলে আমাকে নিরাপত্তা দেওয়া হবে।
—বলেছে তো ঠিক। কিন্তু আদালতে যাবেই বা কোন সাহসে? সরকার তোমাকে নিরাপত্তা দেওয়ার আগেই যদি মোল্লারা তোমাকে খুন করে বসে!
—আমাকে নিরাপত্তা দিক তা হলে, আমি যাই আদালতে।
—তুমি আসামী। হুলিয়া জারি হওয়া আসামীকে কেউ কি নিরাপত্তা দিতে আসে নাকি! ওরা বলছে, তুমি আদালতে আত্মসমর্পণ করবে, তারপর প্রচলিত আইন অনুযায়ী তোমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে ওরা। কথাটি ওরা বলছে, কিন্তু মানবে যে তার গ্যারেন্টি কি?
—কিন্তু এ ছাড়া আর তো উপায়ও নেই। এ কাজটিই আমাকে যে করেই হোক করতে হবে।
ঝ বললেন—তোমার উকিলের পরামর্শ ছাড়া কিছুই করা তোমার পক্ষে ঠিক হবে না।
—কিন্তু ক সেদিন তো আমাকেই ডিসিশন নিতে বললেন। উকিলও নাকি বলেছেন।
—তোমার উকিল তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে বললেও তুমি তা নিতে যেও না। এই ভুলটা কোরো না। এখন উকিলকেই সিদ্ধান্ত নিতে দাও। উকিলের ওপরই ছেড়ে দাও সব।
এদিকে তসলিমাকে ফাঁসি দেওয়ার দাবিতে ২৯ জুলাই তারিখে যে লং মার্চ হবে, এবং মানিক মিয়া এভিন্যুতে যে মহাসমাবেশ, তা সফল করার জন্য দেশ ক্ষেপে উঠেছে। ৩০ জুনের হরতাল সফল হওয়ার পর প্রবল উত্তেজনায় ইসলামপন্থীরা এখন লাফাচ্ছে। সত্যিকার লাফানো যাকে বলে। দেশ জুড়ে সভা হচ্ছে, মিছিল হচ্ছে। ইসলামী নেতারা এক শহর থেকে আরেক শহরে সফর করছেন বিশাল বিশাল জমায়েতে তসলিমার ফাঁসি হওয়ার গুরুত্ব বোঝাতে। নেতারা সবখানেই সাদর সম্বর্ধনা পাচ্ছেন। বিস্তর হাততালি মিলছে তাঁদের। তাঁরা ঘোষণা দিচ্ছেন, সেদিন, মানে ২৯ জুলাই তারিখের সফলতা প্রমাণ করবে যে এ দেশে কোরানের সম্মান সুরক্ষিত হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হবে কোরানের বিধান।
