জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের সেক্রেটারি সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মুফতী ওয়াককাস বলেন, প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের দেওয়া ঈমানী চ্যালেঞ্জ আমরা গ্রহণ করেছি। বিসমিল্লাহর নামে যারা আজ বাংলাদেশের ক্ষমতায় বসে আছে, তারা দেশ ও ইসলাম কোনওটাই রক্ষা করতে পারছে না। পলাতক তসলিমা কি করে বিবৃতি দেয়, তা আমরা সরকারের কাছে জানতে চাই।
জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের সহ সভাপতি মাওলানা শওকত আলী বলেছেন, ১৬ হাজার এনজিওর অধিকাংশই কোটি কোটি ডলার খরচ করছে ইসলামের বিরুদ্ধে। তথাকথিত বিসমিল্লাহর সরকার যৌনবাদী লেখিকা তসলিমাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।
জাগপা সভাপতি প্রধান বলেন, ৩০ জুন সরকার দয়া করে মুরতাদ ঘাদানি চক্রকে তোপখানা রোডে আড়াইশ গজ জায়গা ছেড়ে দিয়েছিল। সেদিন পুলিশ না বাঁচালে জনতা তাদের জন্য মাত্র আড়াই হাত জায়গা নির্ধারণ করত। জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন, ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসাবেন তসলিমা ও দিল্লির সেবাদাস চক্রকে আর রাজপথে চিৎকার করবেন ইসলামের জন্য এটা হয় না। এই সরকার ইসলাম ও স্বাধীনতা কোনওটাই রক্ষা করতে পারবে না। খালেদা জিয়ার সরকারই তসলিমাকে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখেছে।
জনতাকে প্রশ্ন করেন তিনি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বড় না আল্লাহ বড়?
জনতা সমস্বরে ধ্বনি তোলে, আল্লাহ বড়।
প্রধান বলেন, ক্লিনটনের প্রজা হতে আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করিনি।
ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের মুখপাত্র চরমোনাইয়ের পীর সৈয়দ ফজলুল করিম বলেছেন, মৌলবাদী বলে পরিচয় দিতে কোনও লজ্জা নেই। মৌলবাদ মানে মূল জিনিসে বিশ্বাস। কোরান, হাদিস, ইজমা, কিয়াম আমাদের মৌলিক ভিত্তি। মূলে যাদের বিশ্বাস নেই, তারা জারজ। তসলিমার মত মেয়ে সম্পর্কে জনসভায় কথা বলাও লজ্জাজনক। এই মেয়ে কোরানের বিরোধিতা করেছে। আর ক্লিনটন তাকেই সমর্থন করছে।
মুসলিম লীগএর মহাসচিব বলেছেন, একজনের ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য বারো কোটি মুসলমানের অনুভূতিতে আঘাত হানা যায় না। ক্লিনটন তসলিমার পক্ষে সাফাই গেয়ে বারো কোটি মুসলমানকে আঘাত করেছেন।
এরপর আরও আরও…. চলতেই থাকে..। একজনের পর আরেকজন। পড়তে পড়তে ক্লান্তি চলে আসে। আমার আর ইচ্ছে করে না জানতে কে কি বলেছেন। যথেষ্ট হয়েছে। আমি কেবল মিছিলের ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি। মানুষগুলোকে মানুষের মত দেখাচ্ছে। তারা কারও বাবা, কারও কাকা, কারও ভাই, কারও ছেলে। তারা মিছিল শেষে বাড়ি ফিরে যাবে, খাবে, দাবে, ঘুমোবে, জাগবে, আত্মীয় বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলবে, কথা বলবে বাংলায়, মনে সুখ হলে দুএককলি গানও গাইবে, সেও বাংলায়। আর সব বাঙালির মতই জীবন তাদের। কিন্তু এত আলাদা কেন তারা! কেন তারা চাইছে একটি মেয়েকে, মেয়েটি তাদের বোনের মত দেখতে, মেয়েটি তাদের মেয়ের মত দেখতে, খুন করতে! মেয়েটি ভুল করেছে যদি তারা মনে করেই, তাতে কি!ভুল কি মানুষ করে না! তাই বলে মেরে ফেলতে হয় কাউকে!
পাশ ফিরে শুই। দেয়ালে কি কি সব দাগ আছে, দাগগুলোর দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকলে হাতি ঘোড়া বাঘ মানুষ এসব যে কোনও আকৃতি খুঁজে পাওয়া যায়। হাতি ঘোড়া দেখছিলাম, এর মধ্যেই হঠাৎ আমি শোয়া থেকে চকিতে উঠে বসি। এ কী! এ আমি আগে ভাবিনি কেন! কেন ভেবেছি ওরা সব রাজাকার, সব স্বাধীনতার শত্রু! আমার শ্বাস পড়ে খুব দ্রুত। ফ্রীডম পার্টির নেতা কর্নেল ফারুক, কর্নেল রশীদ, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক এলায়েন্সের আনোয়ার জাহিদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির নেতা প্রধান এরা তো সবাই মুক্তিযোদ্ধা! একাত্তরে দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। তবে আজ মুক্তিযোদ্ধা আর রাজাকার এক মঞ্চে উঠে বক্তৃতা করছে, এক দলে নাম লেখাচ্ছে! এই মুক্তিযোদ্ধারা আজ একাত্তরের সবচেয়ে বড় শত্রু গোলাম আযমের সঙ্গে হাতে হাত রেখে চলছে, একাত্তরের ঘাতকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ রেখে হাঁটছে!
শরীরটি একটি মরা সীমের ডালের মত নেতিয়ে পড়ে মেঝেয়।
রাতে জ এলেন। নিজেই বললেন আজ রাতে তিনি আর বাড়ি ফিরে যাবেন না, থেকে যাবেন। আমার খুব ভাল লাগে শুনে। আমি তো ঘুমোই না রাতে, কোনও রাতেই ঘুমোই না। আজ সারা রাত শুয়ে শুয়ে জর জীবনের গল্প শুনি। কি করে একাত্তরে তাঁকে পাকিস্তানি সেনারা দিনের পর দিন ধর্ষণ করেছিল, সেই ভয়ংকর, ভয়াবহ, নিষ্ঠুর, কুৎসিত দিনগুলোর কথা তিনি বর্ণনা করেন। শুনে চমকে উঠি, আঁতকে উঠি, হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়, বুকের স্পন্দন থেমে যায়, পাথর হয়ে থাকি। ঝও এ ঘরে শুয়েছেন। অনেকক্ষণ তিনি ঘুমিয়ে গেছেন। কেবল জ আর আমি জেগে। জ বলছেন, আমি শুনছি। জীবনের ঝুঁড়ি উপুড় করে ঢালছেন জ। জ কে আমার আর সাধারণ কোনও মানুষ বলে মনে হয় না, তাঁকে মহামানবী মনে হয়। গভীর শ্রদ্ধায় আর ভালবাসায় তাঁকে স্পর্শ করে রাখি। জকে একসময় আর মহামানবী বলে আমার মনে হয় না। মনে হতে থাকে জ বুঝি আমার মা, জ বুঝি আমি নিজেই। জর দুটো হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিলাম নিজের হাতে। হাতদুটো আমার ইচ্ছে করে না শিথিল করতে। অন্ধকারে জর মুখটির ওপর ধীরে ধীরে আবছা একটি আলোর চুম্বন পড়ে। ওটুকু আলোতেই জকে বড় উজ্জ্বল লাগে।
জানালা খুলে ভোর দেখার সুযোগ নেই আমাদের, কিন্তু ভোরের সৌন্দর্যটুকু কল্পনা করে নিই। ভোরের সুগন্ধটিও মনে নিয়ে নিই।
৩. অতলে অন্তরীণ – ৪৩
ষোল জুলাই, শনিবার
