জ বলেন, তোমাকেও কিন্তু কোনও এক সময় কবর থেকে তুলে আনা হবে তসলিমা! বুক ধ্বক করে ওঠে। কবরের কথা উঠছে কেন!
কবরের কথা উঠছে এই জন্য যে, জ বললেন, মানুষ তো মরবেই, আমিও মরব একদিন, তুমিও মরবে। ভবিষ্যতের বাংলাদেশে যদি কোনওদিন কোনও মেয়ে প্রচণ্ড নারীবাদী লেখা লিখতে শুরু করে, নারীর অধিকারের কথা খুব জোরে সোরে বলে বা লেখে, তখন তাকে অবজ্ঞা করার জন্য তোমাকে কবর থেকে তুলে আনবেই আমাদের বুদ্ধিজীবী ওরফে কুচক্রীজীবীরা। তারা চিরকালই ছিল, থাকবে।
আমার খানিকটা অস্বস্তি হয় এসব শুনে।
তোমার ফতোয়ার বিরুদ্ধে, জ বললেন, খেয়াল করেছো যে মহিলা পরিষদ কোনও রকম প্রতিবাদ করেনি! সুফিয়া কামাল জনকণ্ঠের সাংবাদিকদের মামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, তোমার মামলার কথা কিছু বলেননি!
আমি মাথা নাড়ি, জানি।
জ দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। আমি গোপন করি।
জ বললেন, তোমাকে যারা চেনে না, তারা তোমাকে খুব ভুল বোঝে।
হেসে বলি, যারা আমাকে চেনে, তারাও কিন্তু আমাকে ভুল বোঝে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলি, হয়ত ভুল বোঝে না, ঠিকই বোঝে, আমার আচার আচরণ, স্বভাব চরিত্র, আমার চিন্তা ভাবনা তাদের ভাল লাগে না।
৩. অতলে অন্তরীণ – ৩৮
এগারো জুলাই, সোমবার
খবরগুলো দেখি। খবরগুলো জামাতে ইসলামীর। জামাতে ইসলামী ৪ দফা দাবির স্মারকলিপি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে যাচ্ছে।
৪ দফার প্রথম দাবি ধর্মজাতি ও রাষ্ট্রবিরোধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান। বাকি দাবি জাতীয় সংসদে জামাতে ইসলামির আনা ধর্ম অবমাননাকারীদের শাস্তির বিধান সম্বলিত আইন প্রণয়নের বিল পাস করা, কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা করা, এনজিওদের জাতি, ধর্ম ও সামাজিক মূল্যবোধ বিরোধী তৎপরতা বন্ধ করা। বিশাল সমাবেশ হল হাউজ বিল্ডিং ফাইনান্স কোম্পানীর সামনে। সেখানে মওলানা মতিউর রহমান নিজামী ভাষণ দিলেন। বললেন বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোনও অধিকারই নেই। কারণ এই সরকার ধর্মদ্রোহী তসলিমার এবং কাদিয়ানি ও এনজিওগুলোর জাতীয় স্বার্থবিরোধী কাজ প্রতিহত করার দায়িত্ব মোটেও পালন করেনি। জামাতে ইসলামীর আরও নেতা বক্তৃতা করেন। তারপর মহামান্য নেতাগণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপিটি দেন। খবরগুলো দেখি, জাতীয় সংসদে আজ সোমবার তসলিমাকে নিয়ে আলোচনা হতে পারে। ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা ওবায়দুল হক সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৬৮ ধারা অনুযায়ী সংক্ষিপ্ত আলোচনার জন্য সংসদ সচিবালয়ে নোটিশ জমা দিয়েছিলেন। খবরগুলো একসময় আর দেখতে ইচ্ছে করে না। আর আমার জানতে ইচ্ছে করে না সংসদে কি কি কথা হল আমাকে নিয়ে। আমি জানি কি কথা হবে, কেমন কথা হবে। আমি জানি আমাকে আজ কোথায় কোন অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে মানুষ। অল্প কজন মানুষ আমার যে পাশে আছেন তা ঠিক, কিন্তু দেশের বেশির ভাগ মানুষই আমার পাশে নেই। দেশের বেশির ভাগ মানুষই কায়মনোবাক্যে আমার মৃত্যু চাইছে। জানি আমি।
বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ ক আর তার বন্ধু গভীর রাতে এসে ঘোমটা মাথার আমাকে তুলে নিলেন গাড়িতে। গাড়ি থামল ঝর বাড়িতে। ঝ অপেক্ষা করছিলেন গেটের কাছে। আমাকে নিয়ে তুললেন সেই ঘরে, সেই পুরোনো ঘরে।
৩. অতলে অন্তরীণ – ৩৯
বারো জুলাই, মঙ্গলবার
ঘরে বন্দি পাখির মত বসে থাকি সারাদিন। বসে থাকতে থাকতে পিঠ ব্যথা হয়ে গেলে শুয়ে থাকি। শুয়ে থাকতে থাকতে মাথা ধরলে উঠে বসি। বসে থাকতে থাকতে বমির উদ্রেক হলে আবার শুয়ে পড়ি। শুয়ে থাকতে থাকতে একটু বমির উদ্রেক কমলে আবার উঠে বসি। বসে থাকতে থাকতে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ জ্বালা করলে আবার শুয়ে পড়ি। চোখ বুজে শুয়ে থাকতে থাকতে শ্বাস কষ্ট শুরু হতে থাকলে আবার উঠে বসি। বসে থাকতে থাকতে শ্বাস কষ্ট কমে গেলে আবার শুয়ে পড়ি। শুয়ে থাকতে থাকতে ঘামে শরীর ভিজে এলে আবার উঠে বসি। বসে ঘামগুলো মুছে একটু গরম গেলে শরীর থেকে আবার শুয়ে পড়ি। শুয়ে চোখে ঘুম নেমে এলে দুঃস্বপ্ন দেখে আবার উঠে বসি। বসে থাকতে থাকতে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে যে ওটা কেবলই দুঃস্বপ্ন ছিল, বাস্তব বলে কিছু ছিল না, শুয়ে পড়ি আবার। শুয়ে দুঃস্বপ্ন দেখার ভয়ে আমি দুচোখে ঘুমকে বসতে দিই না। ঘুম যদি না বসে চোখে তবে শুয়ে থাকার অর্থ হয় না বলে আবার উঠে বসি। অনেকক্ষণ বসে থাকতে থাকতে বসে থাকার অর্থ হয় না বলে আবার শুয়ে পড়ি। সারাদিন সারারাত পাঁচ ফুট বাই তিন ফুট একটি জায়গার মধ্যে আমার শোয়া বসা চলে।
» ৩. অতলে অন্তরীণ – ৪০
তেরো জুলাই, বুধবার
কালও কোনও পত্রিকা ছিল না, আজও নেই। ঝর দেখা নেই। ঝ যখন ঢুকলেন ঘরে, তখন রাত। দুদিন পর খাবার জুটল। খাবার গিলতে গেলে গলায় যন্ত্রণা হয়। রাত দশটার দিকে ক আর ঙ এলেন। নিঃশব্দে এলেন। ওঁরা নিঃশব্দেই আসেন। নিঃশব্দে এসে নিঃশব্দে চলে যান। কথা যখন বলেন, প্রায় নিঃশব্দেই বলেন। ওঁরা এলে ওঁদের এই জগতের কেউ বলে মনে হয় না। যেন স্বর্গ থেকে দেবদূত এলেন। স্বর্গ বলে কোথাও কিছু নেই জেনেও আমার এরকমই মনে হয়। ওঁরা জানেন সব, বোঝেন সব। আল্লাহর ওপর লোকে যেমন নিজের জীবনটির দায়িত্ব দিয়ে ভারমুক্ত হয়, আমিও তেমন ওঁদের কাছেই জীবনের দায় দায়িত্ব দিয়ে বসে আছি। নিজের ওপর আমার বিশ্বাসটুকু অনেককাল হারিয়ে গেছে। আমার বিশ্বাস এখন ওঁদের ওপর। ওঁরা ইচ্ছে করলে আমাকে বাঁচাতে পারেন, ইচ্ছে করলে বাঁচাতে ওঁরা নাও পারেন। ওঁরা যতক্ষণ থাকেন, ততক্ষণ আমি নিজের কোনও অস্তিত্ব অনুভব করি না। ওঁদের মুখে দেশে ঘটতে থাকা নানারকম তাণ্ডবের গল্প শুনি। আমার কিছুতেই মনে হতে থাকে না যে যাবতীয় তাণ্ডব এই আমি মানুষটির জন্য। মনে হয় তসলিমা নামের মেয়েটি অন্য কেউ। ওঁদের সঙ্গে সঙ্গে তসলিমার জন্য আমিও দীর্ঘশ্বাস ফেলি। কী এক ঘোরের মধ্যে থাকি যে মনে হয় না ওঁরা বসে আছেন বা কথা বলছেন বা শুনছেন। ওঁরা চলে গেলে বুঝি ওঁরা এসেছিলেন। ঙ জানালেন সরকারের সঙ্গে বিদেশি কূটনীতিকদের দীর্ঘ দীর্ঘ বৈঠক হচ্ছে। আমার উকিলের সঙ্গেও বৈঠক হচ্ছে। কিন্তু সরকার রাজি নয় আমাকে জামিন দিতে। ঙর হাতে চুল।টর বাড়িতে যে পরচুলাটি ফেলে এসেছিলাম, সেটি তিনি নিয়ে এসেছেন। চুল হাতে নিয়ে বসে থাকি। ভাবলেশহীন মুখে বসে থাকি। স্পন্দনহীন বসে থাকি।
