জ বললেন যে সুফিয়া কামালের সঙ্গে তাঁর একদিন কথা হচ্ছিল, আমার প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি, সুফিয়া কামাল, খুব বিরক্ত হয়ে বললেন, তসলিমা মেয়েটি খুব বেয়াদব। ওকে আমি এত খবর দিলাম ও যেন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে। মেয়ে এল না!
অবাক হই শুনে। তিনি আমার শান্তিবাগের বাড়িতে একবার লোক পাঠিয়েছিলেন খবর দিতে তাঁর সঙ্গে যেন দেখা করতে যাই। আমি গিয়েছিলাম পরদিনই। তিনি আমার সঙ্গে হেসে কথা বলেছেন, মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করেছেন। জকে বলি সে কথা। জ বললেন আমার সেই দেখা করার খবর তিনি জানেন। সুফিয়া কামাল নাকি আমাকে আরেকদিন ডেকেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয়বারের ডাকার খবর আমি পাইনি। খবরটি যাকে দিয়ে পাঠিয়েছিলেন সে আমার কাছে আসেনি। কিন্তু সে কথা কি জানেন সুফিয়া কামাল যে তার দূত আমাকে তাঁর কোনও খবর আদৌ পৌঁছে দেয়নি!
জ মাথা নাড়লেন, জানেন না তিনি।
সুফিয়া কামালের সঙ্গে তাঁর বাড়িতে ছাড়াও আরেকবার আমার দেখা হয়েছিল, দেখাটি হয়েছিল পূরবী বসুর একটি বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে। সুফিয়া কামাল ছিলেন প্রধান অতিথি, আমি ছিলাম বিশেষ অতিথি। পূরবী বসুর বই সম্পর্কে আমাদের বক্তৃতা দেওয়ার কথা। আমি যেহেতু বক্তৃতায় পারদর্শী নই, অল্প কথায় পূরবী বসুর লেখার প্রশংসা করে বসে যাই। সুফিয়া কামাল অনেকক্ষণ ধরে বলেছিলেন। তিনি কেবল পূরবী বসুকে নিয়ে বলেননি, আমাকে নিয়েও বলেছিলেন। আমার লেখালেখি নিয়ে। তাঁর বক্তব্য শুনে আমি বিস্ময়বোধ করেছিলাম, তিনি বলেছিলেন যে নারীবাদী লেখা লিখছি সে ভাল কথা, তবে তা উগ্র যেন না হয়। হ্যাঁ মেয়েরা হল মায়ের জাত, মেয়েদের সহনশীল হতে হবে, পুরুষেরা যদি ভুল করে, রাগারাগি করে তবে ঘর সামলানোর জন্য মেয়েদেরই নরম হতে হয়। পুরুষ স্বভাবতই গরম, নারীও যদি গরম হয়,তবে সংসার চলবে কি করে! মায়ের জাতের দায়িত্ব অনেক। মায়ের জাতের দায়িত্ব হল পুরুষকে আদর দিয়ে ভালবাসা দিয়ে কাছে টানা, তাদের বুঝতে শেখা, তারা ভুল করলে ক্ষমা করে দেওয়া। মায়ের জাতের দায়িত্ব সন্তানকে সুষ্ঠুভাবে লালন পালন করা। ইত্যাদি। মেয়েদের রাগ করা, চিৎকার চেঁচামেচি করা, পুরুষদের ডিঙিয়ে যেতে চাওয়া, পুরুষের বিরুদ্ধে বলা, উগ্রতা দেখানো কিছুই উচিত নয়। এতে মেয়েদের কমণীয়তা নষ্ট হয়।–দেশের সবচেয়ে বড় নারী সংগঠনের সভানেত্রীর মুখে এসব শুনে বড় বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ বসে থেকেছি। পরে পূরবী বসুর কানে কানে বলেছিলাম, আমি তো জানতাম না এমন অদ্ভুত চিন্তাভাবনা তাঁর!
পূরবী বসু বললেন, পুরোনো মানুষেরা ওভাবেই ভাবেন।
তা ঠিক। পুরোনো মানুষরাও হয়ত ওভাবেই ভাবেন। আমার নানিও হয়ত এভাবেই ভাবেন। নাহ, নানি কিন্তু এভাবে ভাবেন না। মনে আছে রুদ্রকে ছেড়ে আসছি ছেড়ে আসছি করছি যখন, নানি বলেছিলেন, লাত্থি দিয়া আইয়া পড়তে পারস না! অত দোনামনার কি আছে! তর আবার চিন্তা কি? নিজে ডাক্তার হইছস। ডাক্তারি করবি, আর নিজের পছন্দ মত থাকবি! ব্যাডইনগর শয়তানি সহ্য করার কি ঠ্যাকা পড়ছে তর? তবু নানি তো নানিই, নানির কথার কি মূল্য আছে জগতে! পাড়াপড়শি আর আত্মীয়কুল ছাড়া নানিকে কেউ চেনেই না। নানি তো আর সুফিয়া কামালের মত অত লেখাপড়া করেননি, তাঁর মত শুদ্ধ ভাষায় কথাও বলতে পারেন না। সুফিয়া কামালকে সকলে চেনেন। ইশকুলের পাঠ্য বইয়ে তাঁর সাঁঝের মায়া কবিতাটি আমাদের বয়সী সকলেই পড়েছি। সেই সুফিয়া কামাল চোখের সামনে বসে আছেন। নানির মত অমন না হলেও এই বয়সেও তিনি যে সভা সমিতি করছেন, বলছেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, এই তো অনেক। আমরা যখন বুড়ো হব, আমাদের অনেক কথাই হয়ত নতুন প্রজন্মের লেখকদের কাছে বড় পুরোনো ঠেকবে।
আমার তন্ময়তা ভেঙে যায় জর কণ্ঠস্বরে, একটা ব্যাপার কি তুমি বেশ অনেকদিন থেকে খেয়াল করছ তসলিমা যে তোমাকে কাউণ্টার দেবার জন্য হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই বেগম রোকেয়াকে আমদানি করা হয়েছিল?
মানে? আমি অবাক তাকাই।
যখনই তুমি নারীবাদী লেখা লিখে বিখ্যাত হয়ে গেলে, অমনি একদল মানুষ ভুলে যাওয়া বেগম রোকেয়াকে কবর থেকে টেনে হিঁচড়ে তুলে আনল, ১০০ বছর আগের সেই রোকেয়াকে। তিরিশ বছর আগে রোকেয়ার কথা ইশকুলের বইয়ে পড়েছিলাম, দ্যাটস অল। এতকাল রোকেয়াকে নিয়ে কোনওদিন কোনও লেখালেখি বা কোনও সভা হতে দেখিনি। শত খুঁজেও তাঁর কোনও বইও পাইনি কোনওদিন পড়ার। হঠাৎ এই দুতিন বছর ধরে শুরু হল রোকেয়া নিয়ে উৎসব। বেগম রোকেয়া। বেগম রোকেয়া! চারদিকে লেখালেখি, তসলিমার অনেক আগেই বেগম রোকেয়া লিখে গেছেন নারীবাদ নিয়ে, তসলিমা আবার কিসের নারীবাদী! নারীবাদী ছিলেন রোকেয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। রোকেয়ার বই নতুন করে বেরোনো শুরু হল। যেন রোকেয়াই এখন এই সমাজে নারীমুক্তি ঘটাবে। এ সবই হল তোমাকে আড়াল করার জন্য। মৃতকে জীবিত বানিয়ে জীবিতকে কবর দেওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য। হিংসে হিংসে, তোমার খ্যাতি দেখে হিংসেয় লোকে মরে।
আমি হেসে বলি, আমি নিজেই তো বেগম রোকেয়াকে নিয়ে লিখেছি।
তা লিখেছো। তোমার লেখা আর তাদের রোকেয়া-পাগলামোতে পার্থক্য আছে। তুমি শ্রদ্ধা নিয়ে লিখেছো, তারা যা করছে কুমতলব নিয়ে করছে। রোকেয়া বেঁচে নেই বলেই করতে পারছে। বেঁচে থাকলে ওঁকেও হিংসে করত।
আমি ম্লান হাসি।
