ক কে বলি ঙর দেওয়া আনা পরচুলার কথা। ক জানেন যে ঙ আমার জন্য নকল চুল এনেছেন।
–কিন্তু চুল কেন, আমার কি জামিন হবে না?
ক মাথা নাড়েন, তিনি জামিনের ব্যাপারে কিছু জানেন না।
–ডঃ কামাল হোসেনের সঙ্গে কি আপনার কোনও কথা হয়নি? তিনি কি কোনও আশা দেননি? তিনি তো বলেছিলেন জামিনের জন্য চেষ্টা করছেন। জামিন হবে এরকম তো আশাও দিয়েছিলেন!
ক চুপ করে শুনলেন আমার কথা। তারপর ধীরে, মাথা নেড়ে, বললেন আমাকে শান্ত হতে। বললেন যে আমার উকিল আমাকে কোনও পথ নির্দেশনা দিচ্ছেন না।
সবকিছুই এখন নির্ভর করছে আমার নিজের সিদ্ধান্তের ওপর। কামাল হোসেনকে যদি আমি বলি যে যে করেই হোক আমি এখন জামিন চাইতে যাবো হাইকোর্টে, তিনি কোনও আপত্তি করবেন না। তিনি চেষ্টা করবেন হাইকোর্টে আমাকে দাঁড় করিয়ে জামিনের জন্য আবেদন করতে। কিন্তু কাজটি করা আমার উচিত হবে না। কারণ ওখানে যাওয়ার ঝুঁকিটি বোঝা না গেলেও খুব বড় ঝুঁকি। জামিনের চেয়ে জীবন বড়। এটুকু বলে কিছুক্ষণ থেমে ক আবার বললেন যে বর্তমান পরিস্থিতিতে হাইকোর্টে আমার উপস্থিতি নিরাপদ নয়। সুতরাং আমার উকিল যদ্দিন না নিশ্চয়তা পাচ্ছেন যে আমার অনুপস্থিতিতে আমাকে জামিন দেওয়া হবে ততদিন তিনি এগোবেন না। তাঁর এগোনো উচিত নয়। জীবনের ঝুঁকি আছে এমন কাজ তিনি করবেন না। যদি আমাকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়, জামিনের ব্যাপারে নিশ্চয়তা দেওয়া হয় তবেই তিনি ঝুঁকিটি নিতে পারেন। তবেই নেওয়া উচিত। এটুকু বলে, দীর্ঘ একটি শ্বাস ফেলে ক বললেন, আপনার উকিল আপনার জামিনের চেয়ে আপনার জীবনের কথা বেশি ভাবছেন।
আমি পা গুটিয়ে হাঁটুতে থুতনি রেখে বসে থাকি।
ক আর কর বন্ধু রাজনীতির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণে মগ্ন হয়ে ওঠেন। আলোচনায় একটু ওঁরা বিরতি দিলেই আমি জিজ্ঞেস করি, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নাকি আমার কথা বলেছেন। নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাকি কথা বলছেন সরকারের সঙ্গে!
ক বললেন, ওগুলো তো বেশ পজিটিভ দিক। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল থেকে শুরু করে বিদেশের হেন কোনও প্রগেসিভ অরগানাইজেশন নেই যে আপনার জন্য আন্দোলন করেনি। তবে লাভ কী হয়েছে? এখন আমেরিকা আর ইউরোপ চাপ দিতে পারে বাংলাদেশকে আপনার মুক্তির ব্যাপারে। কিন্তু মুক্তিটা পাবেন কি করে? বিদেশের পত্রিকায় আপনাকে ডাকা হচ্ছে ফিমেল সালমান রুশদি বলে। কিন্তু আপনার অবস্থা তো সালমান রুশদির মত নয়। সালমান রুশদি ইরানে ছিলেন না। তিনি বৃটেনের মত দেশে ফতোয়া জারির সঙ্গে সঙ্গে হাই সিকিউরিটি পেয়ে গেছেন বৃটিশ গভর্নমেণ্টের কাছ থেকে। আপনি কোথায় বসে আছেন, জানেন? প্রতিদিন এ দেশের লক্ষ লক্ষ লোক আপনাকে খুন করতে চাচ্ছে। আপনি বসে আছেন সবার মাঝখানে। কেবল চারইঞ্চি দেয়ালের আড়াল আপনার আর তাদের মধ্যে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কি করে বাঁচাবে আপনাকে? আপনার দেখা কি করে পাবে? ইউরোপের মন্ত্রীরা আপনার খোঁজ পাবে কি করে? আপনিই বা তাদের সঙ্গে দেখা করবেন কিভাবে? বারো কোটি লোক এ দেশে বাস করে। আপনাকে কি করে উঠিয়ে নেবে কোথা থেকে? এরকম কত লোকের মুক্তির জন্য আমেরিকা ইওরোপের প্রেসিডেন্ট প্রাইম মিনিস্টাররা বলেছে, কিন্তু ওই বলাই সার। বলতে হয় বলে বলা। এতে তো ওদের সত্যিকার কোনও ইন্টারেস্ট নেই। আপনি মরে গেলে ওদের বয়েই গেল। বসনিয়ায় যা হচ্ছে, তা কি কেউ বলে কয়ে ধমক দিয়ে থামাতে পারবে? এ দেশের সরকার মৌলবাদীদের নিয়ে রাজনীতির খেলা খেলতে গিয়ে এখন ফেঁসে গেছে। সরকার এখন গদি বাঁচাবে, আগামী নির্বাচনে জেতার জন্য দেশে পলিটিক্যাল ফিল্ড তৈরি করবে না কি নিজেদের নির্বাচনে জেতার সম্ভাবনা সব ধ্বংস করে আমেরিকার অনুরোধ রক্ষা করবে! আমেরিকা ওরকম সুন্দর সুন্দর অনেক উপদেশ দেয়। মানবাধিকারে বিশ্বাস করে আমেরিকা, তা মানুষকে শোনানোর জন্যই শোনায়। কিন্তু সত্যিই কতটুকু বিশ্বাস করে, তা দেখার বিষয়। দাদাগিরি করতে হয়, তাই করা। যান না এখন অ্যামবেসিতে! আশ্রয় দেবে ভেবেছেন? না, দেবে না। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি।
ক বলেন, আপনাকে এখন সিরিয়াসলি ডিসিশান নিতে হবে কি করবেন। আরেকটা কথা ভেবে দেখবেন, লুকিয়ে থাকতে আপনি কতদিন পারবেন! নিরাপদে লুকিয়ে থাকার একটা পিরিয়ড আছে। পিরিয়ডটি খুব দীর্ঘ নয়। আপনাকে বাড়ি পাল্টাতে হচ্ছে, যত বাড়ি পাল্টানো হয় তত মানুষ ইনভলভড হয় বেশি। যত বেশি মানুষ ইনভলভড হয়, তত বেশি জানাজানি হয়। এক জায়গায় না থেকে মুভ করা নিরাপদ একদিকে, আরেকদিকে কিন্তু ঝুঁকি। সব অবস্থা আপনাকে জানালাম। আগেও জানিয়েছি। এখন আপনি ডিসিশান নেবেন।
ক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ রাত হয়েছে অনেক, এবার ঘুমাতে যান বলে আমাকে পাঠিয়ে দিলেন আমার জন্য বরাদ্দ ঘরটিতে। বিছানায় আমি শুয়ে থাকি। অন্ধকারের দিকে বিষণ্ন তাকিয়ে থাকি। সারারাত। সারারাত ঘুমের নামগন্ধ নেই।
৩. অতলে অন্তরীণ – ৩৭
দশ জুলাই, রবিবার
ছাত্র ইউনিয়নের সেমিনার হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিষয়, ফতোয়াঃ রাষ্ট্র, ধর্ম, সমাজ ও রাজনীতির প্রেক্ষাপটে। কে এম সোবহান বলেছেন, সত্তর দশকে পুঁজিবাদী বিশ্ব আবিষ্কার করে সমাজতন্ত্র ঠেকানোর জন্য মৌলবাদের চেয়ে অব্যর্থ অস্ত্র আর নেই। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, বিএনপি জন্মের পর থেকেই মৌলবাদীদের আশ্রয় ও প্রশ্রয় দিয়ে আসছে। এটা ছিল বিএনপির বিরুদ্ধে আমাদের প্রধান অভিযোগ। কিন্তু দুঃখ এই যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একটি দল রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণের নামে জামাতের সঙ্গে বসে আলোচনা করছে। ফতোয়াবাজির উদ্ভবের পেছনে রাষ্ট্রীয় মদদ ও সরকারি রাজনীতি, গ্রামীণ ক্ষমতা কাঠামোর পরিবর্তন, উপমহাদেশের সাম্প্রতিক মৌলবাদী রাজনীতি, সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতা, ধর্মান্ধতা, বাম রাজনীতির ব্যর্থতা, ইংরেজদের ডিভাইড এণ্ড রুল নীতির কারণে পাকিস্তান নামের মৌলবাদী রাষ্ট্রের উত্থান প্রভৃতি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।
