আমার ঘটনার সঙ্গে সালমান রুশদির ঘটনার তুলনা করা হয়েছে নিউইয়র্ক টাইমসে। সালমান রুশদির ঘটনাটি ফতোয়ার ঘটনা ছিল, একটি বই ছিল সে ঘটনার মূলে। পশ্চিমা সাংবাদিকরা এখানেও একই দৃশ্য দেখতে চাইছেন। কিন্তু দৃশ্য এক নয়। লজ্জা বইটির ঘটনা অনেক আগেই ঘটে গেছে। সরকার সে বই নিষিদ্ধ করেছে মাত্র। লজ্জার সঙ্গে আমার মাথার মূল্য ধার্য করা বা আমার ওপর ফতোয়া জারির ঘটনার কোনও সম্পর্ক নেই। আর এখন দেশ জুড়ে যে তাণ্ডব চলছে, এর সঙ্গে লজ্জা বা ফতোয়ারও কোনও সম্পর্ক নেই। একটি ঘটনা আরেকটি ঘটনা ঘটাতে ইন্ধন যুগিয়েছে বলা যায়, কিন্তু কোনও কারণ যোগায়নি। নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয় মন্তব্যে বলা হয়, ‘আসলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই বিশেষ মুহূর্তে মুক্ত চিন্তা চেতনা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে নির্বাক করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইরানের তৎকালীন ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি সে সময় ইসলামী বিপ্লবোত্তর নেতৃত্বকে শক্তিশালী করার অস্ত্র হিসেবে দি স্যাটানিক ভার্সেসকে ব্যবহার করেন।’ মিশরের একজন মানবাধিকার কর্মীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ‘মিশরে শিল্পী ও লেখকদের মৌলবাদীরাই শুধু নাস্তিক বলে না, সাংসদরাও এই উগ্রপন্থীদের সঙ্গে সুর মেলায়।’ সম্পাদকীয়তে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কাছে বাংলাদেশের সরকারের আত্মসমর্পণকে এক কথায় লজ্জা বলে অভিহিত করা হয়েছে। পরিশেষে লেখিকার নিরাপদ দেশত্যাগ নিশ্চিত করতে নরওয়ের উদ্যোগের প্রশংসা করে নিউইয়র্ক টাইমস।
এই হল খবর।
দুপুরে খাবার নিয়ে আজও রুমানা এলেন। ঙ এলে রুমানা গেলেন। ঙ আমার জন্য কাগজে মুড়ে প্যাকেটে ভরে একটি জিনিস এনেছেন। জিনিসটি তিনি আমার হাতে দেন না। আমাকে তিনি আয়নার সামনে নিয়ে দাঁড় করালেন। তিনি পেছনে দাঁড়িয়ে প্যাকেট থেকে জিনিসটি বের করে আমার মাথায় পরিয়ে দিলেন। পিঠ অবধি পড়ছে লম্বা কালো চুল, নকল চুল। ঙ হেসে বললেন, ‘বাহ, দেখেছো, কোনও উপায় নেই তোমাকে চেনার। মুখে আরও রং লাগিয়ে দিলে আরও চেনা যাবে না।’ ঙ আমার জন্য উপহার এনেছেন নকল চুল। ভয়ে আমার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসে। তবে কি আমাকে পালিয়েই যেতে হবে দেশ থেকে! আর কোনও উপায় নেই বেঁচে থাকার!
ধরা গলায় বলি, কোত্থেকে পেয়েছেন এটি?
কিনেছি।
জানি, জেনেও জিজ্ঞেস করি, কেন কিনেছেন চুল?
ঙ বললেন, ইন কেইস।
আমি তো চোরের মত পালাবো না। আমি এই চুল পরব না কোনওদিন। যা হয় হবে। গলায় আমার কান্না, ক্রোধ, লজ্জা, ভয়।
ঙ কারও সঙ্গে রঙ্গ করার লোক নন। দেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের তিনি একজন। গম্ভীর মানুষ। ভেবে চিন্তে কথা বলেন। যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে প্রতিটি পদক্ষেপ রচনা করেন। ঙ একটি লম্বা চুল কিনে এনেছেন আমার সঙ্গে মজা করার জন্য নয়। চিন্তাবিদ হিসেবে তাঁর সুনাম এ দেশে অনেক। যারা চেনে তাঁকে, তিনি সামনে পড়লে তারা মাথা নুয়ে হাঁটে। তিনি যখন নকল চুল এনেছেন, নিশ্চয়ই ভেবে এনেছেন। কর চেয়ে অনেক বয়স্ক তিনি। অভিজ্ঞতা তাঁর অনেক। ঙর পরামর্শ ছাড়া ক এখন কোনও কাজ করেন না। ক আইন নিয়ে ভাবেন, নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন আমার উকিলের সঙ্গে। ঙ ভাবেন সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে। আমার সারা গায়ে লতিয়ে লতিয়ে একটি ভয় উঠে আসে। মাথা নুয়ে বসে থাকি। সামনে চুল।
আজ রাতে ট ফিরবেন না বাড়িতে। তাই ক তাঁর গাড়িচালক বন্ধুকে নিয়ে এখানে চলে এসেছেন। রাতে থাকবেন। ক লিফলেটটি দেখালেন, যেটি ছেপেছেন। শহরে হাজার হাজার লিফলেট ছড়িয়ে দিয়েছেন। দু পৃষ্ঠায় ছাপা এই লিফলেট। দুপৃষ্ঠাতেই স্কেচ আছে। মেয়েরা হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে স্লোগান দিচ্ছে। আর একদিকে কটি টুপিদাড়িঅলা লোকের স্কেচ, তাদের প্ল্যাকার্ডে লেখা, যে সকল বেপর্দা মহিলা কাজ করিয়া আয় করে তাহারা কাফের। আরেকটিতে লেখা মহিলাদের বিরুদ্ধে ফতোয়া! ইসলাম অমান্য করার সাহস কার? লিফলেটটির ওপরে লেখা নারী পুরুষ এক হও, নিচে লেখা ফতোয়াবাজদের প্রতিরোধ কর/ সচেতন দেশবাসী। ভেতরে আমার টুকরো টুকরো স্লোগানগুলো।
ফতোয়াবাজি দূর না হলে নারী মরবে ঘরে ঘরে
ফতোয়াবাজির ধ্বংস ডাকো সুস্থ সবল অন্তরে।
নারীর জন্য নিরাপত্তা, বেঁচে থাকার সমাজ চাও?
ফতোয়াবাজির কালো থাবা ভেঙে তবে গুঁড়িয়ে দাও।
মোল্লাদের মিশন কি? রগ কাটার রাজনীতি।
দেশ বানিয়ে গোরস্থান আনবে তারা পাকিস্তান।
টারগেট ওদের স্পষ্ট খুব, আজ তসলিমা, কাল আমি
রুখতে ওদের না পারলে প্রগতিবাদীর বোকামি ।
তসলিমাকে ছোবল দিচ্ছে মৌলবাদী সাপ
সময় আছে হঠাও এদের, একাত্তরের পাপ
সুযোগ বুঝে সমাজটাকে ধ্বংস করে যাবে।
মুক্তি কারো নাই,
এই সাপই কিন্তু আজ আমাকে, কাল তোমাকে খাবে।
এরা নিচ্ছে একাত্তরে পরাজয়ের শোধ
জাগো মানুষ রুখে দাঁড়াও, এদের কর রোধ।
ধর্ম নিয়ে মাতম করা অধার্মিকের ছল,
এদের এখন মুখোশ খোল,
দেশের সব বিবেকবান যুক্তিবাদী দল।
ক মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনে খুবই ব্যস্ত, তা আমি অনুমান করি। বন্ধুটির সঙ্গে তিনি আরও লিফলেট পোস্টার ইত্যাদি ছাপার কথা আলোচনা করলেন। কিভাবে লিফলেট বিলি হবে, কে কখন পোস্টার সাঁটবে দেয়ালে, সব তিনি হিসেব করে নিচ্ছেন। ক র এই উদ্দীপনা আমাকে মুগ্ধ করে। আমাকে যদি আজ লুকিয়ে থাকতে না হত, আমিও হতে পারতাম আন্দোলনের একজন, লিখতে পারতাম শক্ত শক্ত কলাম।
