অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের টনক নড়েছে এতদিনে। বলেছেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের চেতনার সঙ্গে মৌলবাদের কোনও সম্পর্ক নেই। এদেশের মানুষ মৌলবাদী হতে পারে না। ধর্মান্ধতা ও ফতোয়াবাজির কারণে আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে এবং এতে দেশের উন্নয়ন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপার, এসব নিয়ে বাড়াবাড়ির পরিণাম ভাল হবে না।’ সাইফুর রহমানের টনক এইজন্য নড়েছে যে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা নাকি আর টাকা বিনিয়োগ করতে চাইছে না এ দেশে। মৌলবাদীরা দেশকে যে অচল করে ফেলছে তার প্রতিবাদ করতে গিয়ে দিব্যি বলে দিলেন যে ধর্ম ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু এ দেশে তো ধর্ম কোনও ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়। ধর্ম এখানে রাষ্ট্রীয় ব্যাপার, ধর্ম এখানে আইনের ব্যাপার।
আজকের কাগজের খবর, বাংলাদেশে মৌলবাদীদের সহিংসতার কারণে গত দু মাসে ৮টি বিদেশি কোম্পানী বিনিয়োগ না করে ফিরে গেছে। এরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে এসেছিল কিন্তু মৌলবাদী তৎপরতার কারণে তারা পরিবেশ অনুকূল নয় বলে চলে গেছে। এর মধ্যে তিনটি ছিল জাপানি প্রতিষ্ঠান। এরা বাংলাদেশে যৌথভাবে ইলেকট্রনিক শিল্পের সম্ভাবনা যাচাই করতে এসেছিল। বৃটিশ কোম্পানী ম্যাক্সওয়েলের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা এসেছিলেন যৌথ উদ্যোগে গার্মেন্টস স্থাপনের চিন্তা মাথায় নিয়ে। একই প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল একটি জার্মান কোম্পানী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জেভিয়ার্স কোম্পানীর এক কর্তা এসেছিলেন খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের সম্ভাবনা পর্যবেক্ষণ করতে। এ সময় বাংলাদেশে একের পর এক মৌলবাদী তৎপরতা,প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি, পত্রিকা অফিসে হামলার ঘটনায় ওঁরা বিস্মিত হয়েছেন বলে জানা গেছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এ ধরনের ঘটনা কি করে ঘটছে এই প্রশ্ন ওঁরা করেছিলেন স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে। মার্কিন কর্তাটি এসেছিলেন ৩০ জুনের হরতালের দিন। ঐদিন সারা বেলা ওঁকে সফরসঙ্গীদের দিয়ে বিমানবন্দরে কাটাতে হয়েছে। পরে মার্কিন দূতাবাস থেকে বাংলাদেশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে পরের ফ্লাইটে তিনি চলে গেছেন। সোনার গাঁ হোটেলে তাঁর হোটেল বুকিং ছিল ১১ জুলাই তারিখ পর্যন্ত। ওটা তিনি বাতিল করে দেন। বিভিন্ন দূতাবাসগুলোতে যখন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা খোঁজ নিচ্ছেন তখনই তাঁরা জানছেন বাংলাদেশের ফতোয়ার ঘটনা, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী কর্তৃক পত্রিকা অফিসে হামলার ঘটনা, সরকার কর্তৃক এনজিও বিরোধী আইন তৈরির চেষ্টার খবর। এসব জেনে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন।
রাতে শুতে যাবার আগে কর দিয়ে যাওয়া প্লাস্টিকের ব্যাগে যে তোয়ালে ছিল, সেটি ভেজা হাত মুখ মোছার জন্য তুলতে গিয়ে দেখি ভেতর থেকে টুপ করে একটি কাগজ পড়ল পায়ের ওপর। কাগজটি একটি চিঠি। ছোট্ট চিঠি। ইয়াসমিনের লেখা। বুবু, কোথায় আছো কেমন আছো কিছুই জানি না। যেখানেই থাকো, বেঁচে থেকো। কতটুকু ভাল থাকতে পারবে তা জানি না। এই সময়ে বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে জরুরি। একটা কথা মনে রেখো, আমরা সবাই সারাক্ষণ তোমার কথা ভাবছি। আমরা সবাই তোমাকে খুব ভালবাসি বুবু।
রাতে শুয়ে কোনও ঘুম আসে না। এপাশ ওপাশ করি। শ্বাসকষ্ট হতে থাকে। একটি গোঙানোর শব্দ আমি ভেতর থেকে বেরোতে থাকে। বাড়ি যাবো বাড়ি যাবো বলে ভেতর থেকে শিশুর মত একটি কান্না উথলে উঠতে থাকে। কান্নাটিকে থামাই, গোঙানোকে থামাতে পারি না। শব্দ শুনে ট এলেন আমার ঘরে। উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা আমার শিয়রের কাছে বসে আমার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। ২৪৪
৩. অতলে অন্তরীণ – ৩৬
নয় জুলাই, শনিবার
আজ দুটো ভাল খবরের দিকে চোখ পড়ল সকালবেলাতেই। আজ থেকে বামফ্রণ্টের প্রতিরোধ পক্ষ শুরু হচ্ছে। দাবিগুলো হচ্ছে, ঘাতক দালাল যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচার, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ, নারী অধিকার, শিক্ষাস্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কর্মসূচী, মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে মৌলবাদী ফতোয়াবাজদের আক্রমণ প্রতিরোধ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এর খবরদারি বন্ধ, গ্যাট চুক্তি, কালো আইন কালো টাকার দৌরাত্ম্য বন্ধ, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি বন্ধ, শিল্প কৃষি রক্ষা, শ্রমিক কৃষকসহ শ্রেণী পেশার ন্যায্য দাবি আদায় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন। এক এক দিন, বামফ্রন্ট ঘোষণা দিয়েছে, এক এক জায়গায় সভা করবে। বেশ ভাল।
দ্বিতীয় খবরটি নিউইয়র্ক টাইমসএর সম্পাদকীয়। মৌলবাদীদের কাছে বাংলাদেশ সরকারের আত্মসমর্পণ লজ্জার কথা। সম্পাদকীয়টির শিরোনাম মৃত্যুর মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা। লেখা হয়েছে, তসলিমা নাসরিনের লজ্জা এবং সম্প্রতি একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে তার কথিত অবমাননাকর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সে দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তি ফুঁসে ওঠে। ঐ শক্তি লেখিকার ফাঁসি দাবি করে। এমনকি একজন ধর্মীয় নেতা তাঁর খণ্ডিত মুণ্ডুর জন্য আড়াই হাজার মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে। উগ্রপন্থী ধর্মান্ধ গোষ্ঠী তসলিমা নাসরিনের নারীবাদী মতামতকে ইসলাম ধর্মের সরাসরি অবমাননা বলে মন্তব্য করে। সরকার সাম্প্রদায়িক শক্তির দাবি অনুযায়ী তাঁর লজ্জা উপন্যাস নিষিদ্ধ করে। সম্প্রতি একটি আদালত লেখিকার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার ফলে লেখিকা আত্মগোপন করেন।
