রুমানা আমার কাছে কোনও পরামর্শ চান না। লুকিয়ে থাকা মানুষ সাধারণত দুর্বল হয়, দুর্বল মানুষের কাছে কেউ পরামর্শ চায় না। আমি নিজেই তো পরামর্শ চেয়ে বেড়াচ্ছি এখন। যেমন ক-কে পেলেই জিজ্ঞেস করি, কি করব? ক-কে আমার খুব শক্তিমান বলে মনে হয়। ক বলেন, ‘পালিয়ে যান, অথবা লুকিয়ে থাকুন। আপাতত এ দুটো ছাড়া আপনার আর করার কিছু নেই।’ আমার ইচ্ছে এখন এমনই সীমিত যে আমার যা ইচ্ছে করে তা আমি করতে পারি না। আমার এখন মনে হয়, মেয়েরা যখন পরামর্শ চাইত আমার কাছে, তাদের ইচ্ছেও খুব সীমিত থাকত বোধহয়। যা ইচ্ছে তাই করতে কজন মেয়ে আর পারে।
রুমানার সঙ্গে আমার সারাদিন কেটে যায়। কাল রাতে তিনি দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার সেঁটেছেন বন্ধুদের নিয়ে। ফতোয়াবাজ নিপাত যাক স্লোগান লেখা পোস্টার। রুমানার মত আমারও ইচ্ছে করে পোস্টার সাঁটতে, মিছিলে যেতে। আমারও ইচ্ছে করে মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনের একজন কেউ হতে। কিন্তু সে ক্ষমতা আমার নেই।
৩. অতলে অন্তরীণ – ৩৫
আট জুলাই, শুক্রবার
আজ দুপুরে খাবার নিয়ে জ-র কন্যা এল। দুশ্চিন্তাগুলোকে আপাতত দূরে সরিয়ে জীবনের ছোটখাটো জিনিস নিয়ে যদি মগ্ন হতে পারতাম! কিন্তু কি করে তা সম্ভব। জর কন্যার সঙ্গে কথা বলতে বলতে বারবার আনমনা হয়ে পড়ি। মন স্থির হতে পারে না কোথাও। ভেতরে তুমুল তুফান নিয়ে বাইরে স্থবির বসে থাকতে হয়, এমনই স্থবিরতা যে একটু বাতাসও বয় না ভুল করে। জর কন্যার মুখে কুয়োকাটার গল্প শুনি, শুনতে থাকি, মন কিন্তু আমার কুয়োকাটায় নয়, মন বায়তুল মোকাররমে, মন পল্টনে, মন মিছিলে, মিটিংএ। রাতে ঙ এলেন। দেশের ভয়াবহ অবস্থার কথা বর্ণনা করেন তিনি। ভয়াবহ অবস্থাই বটে। জামাতে ইসলামীর সমাবেশ হয়েছে। ধর্মদ্রোহী, জাতিদ্রোহী, নাস্তিক ও মুরতাদদের শাস্তির দাবিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে জামাত। পল্টনের বিশাল সমাবেশে মতিউর রহমান নিজামী বলেছেন, জ্ঞদেশ আজ দুই দলে বিভক্ত। একদল কোরানের পক্ষে, অন্যদল বিপক্ষে। কোরানের বিরুদ্ধ শক্তিকে প্রশ্রয় দিয়ে বিএনপি ধর্মপ্রাণ ভোটারদের সমর্থন পাবার অধিকার হারিয়েছে। তাদের কাজের এই ধারা অব্যাহত থাকলে অচিরেই সরকার পতনের আন্দোলন শুরু হবে। যে ক্ষুদ্রগোষ্ঠী ইসলাম ও কোরানের বিরুদ্ধে বলছে ও লিখছে তারা দেশ, জাতি ও সংবিধান বিরোধী। বাক স্বাধীনতার অজুহাত তুলে এরা ধর্মের বিরুদ্ধে বলছে। পৃথিবীর কোথাও এমন নজির নেই। বিএনপি সরকার এদের দমন করতে ব্যর্থ। তারা এক্ষেষেন অদক্ষতা ও অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে। আমি তাদের পরিস্কার ভাষায় আরেকবার সতর্ক করে বলতে চাই, এর পরিণাম ভাল হবে না। এর জন্যে তাদের বড় ধরনের মূল্য দিতে হবে। সরকারের এনজিও বিষয়ক ব্যুরো ৫২টি এনজিওর বিরুদ্ধে দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উত্থাপন করেছে। সরকার এ ক্ষেষেনও স্পষ্ট ভূমিকা রাখতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। তারা যদি ব্যর্থতার এই ধারা বজায় রাখে তবে তাদের পক্ষে বেশিদিন আর ক্ষমতায় টেকা সম্ভব হবে না। .. কোরান না থাকলে আমরা থাকি না। আমরা কোরানের মর্যাদা রক্ষার জন্য সংগ্রাম করছি। দেশে যারা ধর্মদ্রোহিতা করছে আমরা শুধু তাদের বিরুদ্ধে নই বরং তাদেরকে আন্তর্জাতিক যেসব মুরুব্বি নাচাচ্ছে, আমরা তাদের বিরুদ্ধেও। .. বিএনপির মধ্যে ওৎ পেতে থাকা রাম ও বামপন্থীরা বার বার মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে। সরকার এসব ট্যাকল করতে না পারলে তাদের ভবিষ্যত অন্ধকার।’ বক্তাদের মধ্যে ছিলেন মতিউর রহমান নিজামি, মাওলানা আবদুস সোবহান (দুজনই সংসদ সদস্য), মুহম্মদ কামরুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা, জসিম উদ্দিন সরকার, সাইফুল ইসলাম খান মিলন, আবু জাফর মোহাম্মদ ওবায়েদুল্লাহ ইত্যাদি লোকজন।
ইসলাম ও কোরানের অবমাননাকারীদের শাস্তির দাবিতে ১৩টি সংগঠনের সংগ্রাম পরিষদ গঠন হয়েছে। এই পরিষদে আছেন তাঁদের দলবলসহ বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা ওবায়দুল হক, নারিন্দার পীর সাহেব, ইসলাম ও রাষ্ট্রদ্রোহী তৎপরতা প্রতিরোধ মোর্চার আহবায়ক মাওলানা মুহিউদ্দিন খান, মহাসচিব ফজলূল হক আমিনী, এনডিওর সেক্রেটারি আনোয়ার জাহিদ, ফ্রিডম পার্টির সেক্রেটারি প্রাক্তন জেনারেল মেজর বজলুল হুদা, খেলাফত মজলিশের অধ্যাপক আখতার ফারুক, জাগপার সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, ইসলামি শাসনতন্ত্র আন্দোলনের মাওলানা এটিএম হেমায়েত উদ্দিন, মুসলিম লীগের এডভোকেট মোহাম্মদ আয়েনউদ্দিন, নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি আশরাফ আলী, পিএনপির সভাপতি শেখ শওকত হোসেন নীলু, ভারতীয় দালাল প্রতিরোধ কমিটি গোলাম নাসির, যুব কমাণ্ডের সদস্য সচিব আবু নাসের মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ। সংগ্রাম পরিষদ থেকে সম্মিলিত কর্মসূচীর মাধ্যমে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জোট ভুক্ত কোনও সংগঠন এককভাবে কোনও কর্মসূচী গ্রহণ করবে না। কিসের জন্য সংগ্রাম? সংগ্রাম হচ্ছে ইসলাম ও কোরানের অবমাননাকারীদের শাস্তি প্রদান, ব্লাসফেমী আইন প্রবর্তন, কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা, ধর্মদ্রোহী, দেশদ্রোহী ও একশ্রেণীর এনজিওর অপতৎপরতা প্রতিরোধ, ভারতীয় আগ্রাসন ও বিজাতীয় হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ। ১৪ ও ২৯ জুলাইয়ের সম্মিলিত কর্মসূচী সফল করার জন্য মূল প্রতিনিধিদের এক জরুরি সভা আগামীকাল সন্ধে সাতটায় ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হবে। সভা ও বিক্ষোভ আগের মতই চলছে। দেশব্যাপী। খেলাফত ছাত্র আন্দোলন, জাতীয় নাস্তিক নির্মূল কমিটি, মুসলিম ব্রিগেড, ইসলামিক পার্টি, বাংলাদেশ ইমাম উলামা পরিষদ, মুসলিম লীগ, ইসলামি শাসনতন্ত্র আন্দোলন, সত্য সন্ধানী আন্দোলন ইত্যাদি দল এখন রীতিমত ব্যস্ত।
