আরমান হত্যাকে পুঁজি করেছে ইসলামী দলগুলো। মিছিল করছে আরমান কেন খুন হল তা নিয়ে। খুলনায় ইসলাম ও রাষ্ট্রদ্রোহী প্রতিরোধ কমিটির বিশাল সভা হচ্ছে, মিছিল হচ্ছে। আবার বামঘেঁষা পত্রিকা জানাচ্ছে, বামফ্রণ্টের সমাবেশ ও মিছিলও হয়েছে, মৌলবাদীদের প্রতিহত করার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানানো হয়েছে। মৌলবাদী পত্রিকায় প্রতিদিনই গরম গরম খবর। সিলেটে তৌহিদী ছাত্র জনতাকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে সিলেটে সমাবেশ হচ্ছে। ধর্মদ্রোহী মুরতাদ নাস্তিক এনজিও চক্রের বিরুদ্ধে গ্রামে গঞ্জে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালন হয়েছে, এবং অমৌলবাদীদের হামলায় আহতদের হিসেব দিয়ে লেখালেখি চলছে।
দেশে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে। এ অবস্থায় আদালতে আমার হাজির হবার যে তারিখটি ছিল, সে তারিখটিও তুমুল তাণ্ডবে ভেসে গেল। হ্যাঁ, কাল ছিল আমার আদালতে হাজিরা দেবার দিন, কাল মুখ্য মহানগর আদালতের হাকিম আমার হাজিরার সময় আরও এক মাস বাড়িয়ে দিয়েছেন।
আজ দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পাট চুকলে ঞ আমার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বললেন। ঞর জীবনের অনেক কথাই বললেন। মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সেই পাকিস্তান আমল থেকে তিনি জড়িত, সে সময় কি রকম সেই আন্দোলন ছিল বর্ণনা করলেন। কি রকম ভাবে তিনি এবং তাঁর তখনকার বন্ধুরা পাকিস্তান সরকারের সাম্প্রদায়িক নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বললেন। টগবগে এক একজন স্বপ্নবান তরুণ যোদ্ধা সরকারি নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, কিন্তু নিজেদের আদর্শ বিসর্জন দেননি। তখনকার দিনের সঙ্গে তুলনা করলে মৌলবাদীদের জোর এখন অনেক বেশি। স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়েছে ঞর। কত সংগ্রামের পর, কত সাধনার পর নিজেদের জন্য একটি দেশ পেয়েছেন, সেই দেশ কি না এখন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ! এত কিছুর পরও ঞর দুচোখে দুফোঁটা স্বপ্ন নক্ষষেনর মত জ্বলে। নক্ষত্র থেকে আলো এসে আমার চোখে পড়ে। আমি বুক ভরে শ্বাস নিই। হারিয়ে যাওয়া একটি শক্তি একটু একটু করে কোত্থেকে যেন ফিরে আসে আমার মধ্যে।
বাংলাদেশঃ মৌলবাদের অভয়ারণ্য–এই শিরোনামে আজ কবীর চৌধুরী আর সৈকত চৌধুরীর লেখা একটি কলাম ছাপা হয়েছে। কলামের শুরুটি এরকম, ‘কেমন আছো, তসলিমা?
ভাল নেই নিশ্চয়ই। ভাল থাকার কথাও নয়। মাথার ওপর হুলিয়া নিয়ে, স্বজন ছেড়ে, সর্বোপরি লেখালেখির জগত থেকে দূরে সরে থাকা যে কোনও সৃষ্টিশীল মানুষের পক্ষেই অসম্ভব এক কষ্টকর কাজ।
ভাল আমরাও নেই তসলিমা। বাংলাদেশ ভাল নেই। সব ভালবাসা আজ নির্বাসনে। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ধর্মের শাশ্বত কল্যাণের বাণী, প্রগতির উর্ধ্বমুখ সব আজ জিম্মি হয়ে আছে এক শ্রেণীর ধর্মান্ধ, ক্রোধান্ধ, বর্ণবাদী, মতলববাজ মানুষের হাতে। ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থতা, লোভ, হিংসা, হানাহানি, ক্ষমতার রশি আঁকড়ে ধরার প্রাণপণ প্রচেষ্টা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। গোটা জাতিকে পরমুখাপেক্ষী মেরুদণ্ডহীন প্রজাতিতে রূপান্তরিত করার হীন প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে সর্বত্র। যে স্নিগ্ধ সহিষ্ণু স্নেহের আঁচলে সাজানো আমাদের গৃহকোণ, সেখানে আজ মৌলবাদের হিংস্র থাবা। এই তো সেদিন ডঃ আহমদ শরীফের বাসায় বোমা হামলা হল, তারপর হামলা এল শফিক রেহমানের ওপর। মৌলবাদী অপশক্তি তাদের শক্তি প্রদর্শন করে ক্ষমতার মহড়া দিচ্ছে প্রগতির শরীরে আগুন ধরিয়ে। ঘরে আগুন, বাইরে আগুন, বুকের ভেতরে আকণ্ঠ এক জ্বালা – এই যেন বেঁচে থাকা। আর এদিকে একত্রিশ শতাংশ ভোটারের গণতান্ত্রিক(!) সরকার গণতন্ত্র এনেছি, গণতন্ত্র দিয়েছি বলে ষাঁড়ের মত চেঁচাচ্ছে। আমাদের চোখ খোলা, খোলা কানও, তবু বুকের ভেতরে মাতম ওঠে কণ্ঠ রোধের কষ্টে। সময়ের ঘড়ি ক্রমশ সামনে এগোয়, আর আমাদের দেশ ক্রমাগত পেছনে যাচ্ছে, হাজার বছরেরও পেছনে। অলিখিত কিন্তু প্রকাশ্য ধর্মযুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে ধর্ম সেবকেরা সকল আইন শৃঙ্খলা সভ্যতার রীতিনীতি উপেক্ষা করে। ধর্মের নামে অমানবিক ফতোয়া দিয়ে ধ্বংস করছে জনহিতকর প্রতিষ্ঠান, ধর্মনাশের ধুয়া তুলে নরপশুরা মাটিতে পুঁতছে সাধারণ জনগণ, সংবাদপত্র অফিসে তথা গণতন্ত্রের প্রাথমিক সৈনিকদের বাসভূমিতে বোমা ছুঁড়ছে। আজ গোটা দেশের আকাশ জুড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে একাত্তরের সেই পুরোনো শকুন। সময় হয়েছে তসলিমা, যুদ্ধে যাবার। বেশ আছো তসলিমা, আপাত নিরাপদ দূরত্বে। কেমন আশায় ছিলাম দীর্ঘ অন্ধকার থেকে আলোয় এসে নব্বইএর গণঅভ্যুত্থান থেকে ফিরে পাবো একটি সেক্যুলার বাংলাদেশ। আমাদের স্বপ্ন সাধনায় চাওয়া পাওয়ায় নতুন মন্ত্রে জেগে উঠবে নতুন স্বদেশ। কেমন ভুলের বাসরে গড়েছিলাম বাংলাদেশ। আর কেনই বা ভুলের ভালবাসার এমন অন্তঃক্ষরণ এই অবেলায়। ..
তারপর অনেক কথা। শেষ করেছেন এভাবে, ‘এদিকে ধর্মান্ধ তৌহিদী পুংগবেরা ৩০ জুনে হরতাল ডেকেছিল। ভণ্ড সরকার সে হরতাল রোখেনি। আমরা স্বাধীনতার পক্ষের মানুষেরা এই হরতাল রোখার জন্য সবাইকে একত্রিত হবার ডাক দিয়েছিলাম। আমরা খুব ভাল করেই জানি যে এর ফলে আমাদের ওপরও হামলা হতে পারে। তবুও আমরা রুখে দাঁড়িয়েছি সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে, সকল ধর্মীয় উন্মাদনার বিরুদ্ধে। আমরা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ধর্ম উন্মাদদের এবং মৌলবাদী সরকারকে জানিয়ে দিতে চাই যে আমরা আমাদের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে হলেও সকল মৌলবাদের বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়ে যাবো। মৃত্যুর ভয়ে আমরা ভীত নই। আমরা সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে এই সরকারের হাতে শুধু ইসলাম ধর্ম এবং লেখক শিল্পী সাংবাদিকরাই বিপণ্ন নয়, একই সঙ্গে বিপর্যস্ত দেশের বারো কোটি মানুষ। ধর্মের নামে ধর্মনাশ করে চলেছে মৌলবাদীরা। আর সরকার গণতন্ত্রের নামে বলি দিচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের চেতনাকে।
