তসলিমা, যৌবন যার, মনের বিশ্বাসের সঙ্কল্পের ক্ষেষেন, তার জন্য যুদ্ধে যাবার এখনই শ্রেষ্ঠ সময়।’
কলামটি পড়া শেষ করে চোখ বুজি, বোজা চোখের বাঁধ ভেঙে জল নামে, গড়িয়ে নামতে থাকে গালে। দুহাতে মুছি জল। জল আরও নামে। মুখটি বালিশে গুঁজি রাখি। বালিশ ভিজে যেতে থাকে। থাক, ভিজুক। আজ ভিজে যাক সব।
গভীর রাতে ক তাঁর বাহিনী নিয়ে ঝড়ের বেগে এসে আমাকে তুলে নিয়ে গেলেন ঞর বাড়ি থেকে টর বাড়ি। টও একজন শিল্পী, তবে ঞর মত বিখ্যাত নন, ঝর মতও বিখ্যাত নন। ক আর তাঁর গাড়িচালক বন্ধু আমাকে আজ এ বাড়ির ভেতর ঢুকিয়েই বিদেয় হননা। তাঁরাও ভেতরে ঢোকেন। টর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন আমার। ট অপেক্ষা করছিলেন আমাদের জন্য। ঘরগুলোর আলো নিবিয়ে বৈঠক ঘরে অল্প একটি আলো জ্বেলে রেখেছিলেন শুধু। এটি আলাদা কোনও বাড়ি নয়। অ্যাপার্টমেণ্টে বিল্ডিং। ট এই অ্যাপার্টমেণ্টে একা থাকেন। ক, কর বন্ধু আর ট টর বৈঠক ঘরের কার্পেটে বসে অনেকক্ষণ দেশের অবস্থা নিয়ে কথা বললেন। আমি নির্বাক শ্রোতা। অত্যন্ত প্রতিভাবান যুবক এই ট। একসঙ্গে হাজারটা কাজ করেন। বহুকাল ইউরোপে ছিলেন। এখন দেশে ফিরে এসে শিল্পের জগতে নিজেকে নিবেদন করেছেন। কর অনেকদিনের বন্ধু ট। কর কারণেই সম্ভব হয়েছে টর বাড়িতে আমার আশ্রয় পাওয়া। কিন্তু এখন ঝামেলা হল, এবাড়িতে রাঁধেন না, বাড়েন না। তিনি সকালে বেরিয়ে যান, ফেরেন রাত্তিরে। এই অবস্থায় আমার থাকাটি চলবে এখানে, কিন্তু খাওয়াটির ঠিক কি হবে কও ঠিক জানেন না। ক বলেন যে তিনি নিজে অথবা কাউকে যোগাড় করবেন খাবার নিয়ে আসার জন্য। কেবল খাবার নিয়ে আসাই নয়, আমার সঙ্গে দিনের বেলাটা কেউ যেন থাকতে পারে, সে ব্যবস্থাও করবেন। ককে আমার আগের চেয়ে বেশি প্রাণবন্ত লাগে। আগের সেই দুশ্চিন্তাটি এখন আর তাঁর মধ্যে নেই। আসলে বিপদের মধ্যে দীর্ঘদিন কাটালে বিপদকে বোধহয় আর বিপদ বলে মনে হয় না। ক এখন মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনে রীতিমত একজন সাহসী যোদ্ধার ভূমিকায়। আমাকে একটি গুরুদায়িত্বও দিলেন, ফতোয়াবাজদের বিরুদ্ধে ছড়া মত কিছু স্লোগান লিখে দিতে হবে। তিনি শিগরি একটি লিফলেট ছাপবেন। বললেন কাল এসে তিনি নিয়ে যাবেন ছড়াগুলো।
ক আর তার সুদর্শন গাড়িচালক বন্ধুটি বিদেয় হলে ট আমাকে নিয়ে অন্ধকার বারান্দাটিতে বসলেন। কালো একটি আকাশ চোখের সামনে। নিঝুম সারা পাড়া। ট বলতে থাকেন স্বপ্নময় কণ্ঠে তাঁর জীবনের টুকরো টুকরো কথা। এ বাড়িতে তিনি তাঁর প্রেমিকাকে নিয়ে বহুদিন থেকে সংসার করছেন। প্রেমিকাটি এখন লন্ডনে পড়াশুনা করতে গেছেন, ফিরে আসবেন মাস কয় পর। ট এবং তাঁর বান্ধবী বিয়েতে বিশ্বাসী নন, তাঁরা ভালবাসায় বিশ্বাসী। ভালবাসাই তো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখে। জিজ্ঞেস করলাম বিয়ে না করে স্বামী স্ত্রীর মত বাস করার কারণে কোনও অসুবিধে হয় কি না, অর্থাৎ লোকেরা মন্দ বলে কি না।
ট চমৎকার হেসে বললেন, লোকে মন্দ বললে আমার বয়েই গেল!
–আপনার বান্ধবীও কি তাই? পরোয়া করেন না লোকের কথা?
–ও তো আমার চেয়েও বেশি সাহসী।
এমন জুটি সমাজে বিরল। তারপরও ভাল লাগে ভাবতে এই কুসংস্কারাচ্ছত সমাজেই সাহসী কিছু মানুষ নিজেদের পছন্দমত জীবন যাপন করছেন। সংস্কার অনেকেই ভেতরে ভেতরে ভাঙছে। একদিন, আমার বিশ্বাস, পুরোনো পচা নীতিরীতিগুলো ভেঙে গুঁড়া হয়ে যাবে, মানুষ তার নিজ সত্ত্বা নিয়ে, অধিকার নিয়ে, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে বাস করবে একটি শিক্ষিত সুন্দর সমাজে। ট আর আমি বারান্দায় বসে রাতের অপরূপ রূপ দেখি। শীতল হাওয়া এসে এই গ্রীষ্মের আগুনে পোড়া আমাদের শরীরে শীতল শান্তির পরশ বুলিয়ে যায়। আমাদের মনেও ফুরফুরে হাওয়াটি বইতে থাকে। আমরা আর দেশের অবস্থার কথা বলে দুঃখ করি না। জীবন ও জগতের সৌন্দর্যের কথা বলি। অনেকদিন পর আমার মনে হয় জীবন খুব সুন্দর, একে হারানোর কোনও অর্থ হয় না।
রাতে ট তাঁর শোবার ঘরটি ছেড়ে দেন আমার জন্য। নিজে তিনি অন্য ঘরে ঘুমোন।
৩. অতলে অন্তরীণ – ৩৩
ছয় জুলাই, বুধবার
সকালে ট বাইরে থেকে পাউরুটি আর ডিম কিনে এনে রুটি গরম করে আর ডিম ভেজে আমাকে ডাকলেন খেতে। খাবার ঘরটির চারদিকে জানালা, পর্দাহীন জানালা। আমি দাঁড়াতেই এক ঝাঁক আলো আমার চোখ ধাঁধিয়ে দিল। অনেকদিন আলো দেখে অভ্যস্ত নই আমি। ট হঠাৎ লক্ষ করলেন জানালায় পর্দা নেই। আশেপাশের বাড়ি থেকে কেউ তাকালেই আমাকে দেখে ফেলতে পারে। রান্নাঘরে যাবার আমার কোনও উপায় নেই, ও ঘরের জানালাতেও কোনও পর্দা নেই। ট মুশকিলে পড়লেন। অগত্যা আমাকে নাস্তা খেতে হল বৈঠক ঘরে বসে।
আমি যে ঘরে শুয়েছি সে ঘরে বিছানার কাছে একটি টেলিফোন রাখা। টেলিফোনটি তালা দেওয়া। টকে বলেছিলাম যে আমি একটি ফোন করব, খুব জরুরি ফোন, চাবিটি যেন তিনি দেন আমাকে। ট নিরস মুখে বললেন, চাবি ছিল তার কাছে, এখন হারিয়ে গেছে। আমি ঠিক বুঝি, এটি কঞ্চর শিখিয়ে দেওয়া। আমি যেন কোথাও কোনও ফোন করতে না পারি, সে ব্যবস্থা আমি এ বাড়িতে আসার আগেই তিনি করে রেখেছেন।
ট বেরিয়ে গেলেন। আমার কাছে দরজার চাবি দিয়ে গেছেন। বলে গেছেন, ক বা কর পাঠানো কেউ যদি আসে তবে যেন দরজার তল দিয়ে চাবিটি দিই তাকে। দরজায় ছিদ্র আছে বাইরে দাঁড়ানো মানুষকে দেখার। সে ছিদ্র দিয়ে আগে যেন দেখে নিই কে এসেছে।
