আনন্দ পুরস্কার আমি দ্বিতীয়বার পেলাম। আমি একাই পেলাম। পাঁচ লক্ষ টাকা পুরস্কার। টাকাটা আমাকে সত্যিই আকৃষ্ট করে না। এর আগে বিরানব্বই সালে যখন পেয়েছিলাম আনন্দ পুরস্কার, পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা হয়েছিলো পুরস্কার। আর এবার এক লক্ষ থেকে হলো পাঁচ লক্ষ। অনেকে ভাবতে পারে আমার লক্ষ্মী ভাগ্য বা লক্ষ ভাগ্য ভালো। আমি ভাগ্যে বিশ্বাস করি না। প্যারিসের ব্যাংকে ও টাকা জমা করে দেওয়ার পর আমারই অজান্তে দ্রুত উড়ে যায়। আমার লক্ষ টাকার পিঠে অদৃশ্য পাখা থাকে। উড়ে যায় বলে মনোকষ্ট নেই। মনোকষ্ট শুধু তোমার জন্য। যে টাকার অভাবে তুমি সারাজীবন ছিলে, সেই টাকা আমার কাছে যত কাড়ি কাড়ি আসে, তত সেই টাকাকে আমার তুচ্ছ মনে হয়, অপ্রয়োজনীয় মনে হয়, সেই টাকাকে আমার বড় ঘৃণা হয়, মা। সংসারে তুমি ছিলে একা, আর আমি একা। আমার স্বামী সন্তানের উপদ্রব নেই। আমার ধন সম্পদও কারও জন্য রেখে যাওয়ার নেই। এভাবেই জীবন উড়তে থাকে, যে জীবনের, মনে হয় কোনও অর্থ নেই। এভাবেই জীবন ভেসে যেতে থাকে, যে জীবনকে খড়কুটো বলেও মনে হয় না।
বুঝলে মাপ্যারিসহলোইওরোপের কেন্দ্র। আর আমার যত ভ্রমণ, সব এইপ্যারিস থেকেই। বিভিন্ন দেশে যাওয়া আসা হচ্ছেই। বিভিন্ন দেশ থেকে আমন্ত্রণ আসছে, নারীর অধিকার বা মানবাধিকার বিষয়ে কথা বলার জন্য আমন্ত্রণ। ইওনেস্কোতে আমি আন্তর্জাতিক ধর্মমুক্ত মানববাদী আইএইচইইউ এর ডেলেগেশন হয়ে যাই, ওখানে ধর্মমুক্ত রাষ্ট্র, আইন, সমাজ ও শিক্ষার পক্ষে কড়া বক্তব্য রাখি। ইউনেস্কোয় নাকি এমন কঠিন বক্তব্য আগে কেউ রাখেনি। সব নড়েচড়ে বসেছিলো। সবখানেই তাই হয়। ক্রিশ্চান, ইহুদি বা অন্য কোনও ধর্মীয় পরিবারে জন্ম নিয়ে যে কেউ ঠিক একই কথা, যা আমি বলেছি, বললে কেউ চমকায় না। কিন্তু মুসলিম পরিবারে জন্মে ধর্মের সমালোচনা, তাও আবার সব ধর্মের সমালোচনা করলে লোকে চমকে ওঠে। আসলে আমার সংগ্রাম তো আর ধর্ম নাশ করার সংগ্রাম নয়। আমার সংগ্রাম মানবতার জন্য মূলত, সমানাধিকারের জন্য। ধর্মের সঙ্গে নারীর সমানাধিকারের বিরোধ আজন্ম। যেখানেই যাই, যত কোলাহল বা কলরবের মধ্যেই যাই, ফিরে আসি নিজের নিঃসঙ্গতায়। ফোনটা হাতের কাছে, ইচ্ছে করে কেউ জিজ্ঞেস করুক, কেমন আছি, দেশে ফিরবো কবে, ইচ্ছে করে কেউ বলুক আমার জন্য কোথাও সে অপেক্ষা করছে। বলুক আমাকে ভালোবাসে, জিজ্ঞেস করুক, কেমন আছি, কী খাচ্ছি। তুমি নেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোনও পারে যে তোমাকে বলবো কেমন আছি আমি, কেমন থাকি প্রতিদিন। তুমি কোনও দেশে নেই, কোনও শহরে বা গ্রামে নেই। কোনও বাড়িতে নেই। তোমার কোনও ঠিকানা নেই। তোমার কোনও টেলিফোন নম্বর নেই। তোমার কিচ্ছু নেই মা। তোমার এত নেই এর কাঁটা বুকের ভেতরটায় বিঁধে থাকে।
প্যারিসে বসে কবিতার একটি বই ছাড়া আর কিছুই লিখিনি। ফরাসি প্রকাশক, বুঝি, যে, অসন্তুষ্ট। ভালো ভালো উপন্যাস চাইছে প্রকাশক। আমি যে লেখক, আমি যে ভালো লেখক, সে কথা আরও প্রমাণ করি আমি, চাইছে। আমি যে কেবল ধর্মের বিপক্ষে লেখা, মৌলবাদীদের ফতোয়া পাওয়া কোনও নির্যাতিত নির্বাসিত বস্তু নই, তা ফরাসি প্রকাশকও প্রমাণ করতে চান। ফরাসি দেশে নাম আছে, কিন্তু নতুন বই নেই। বন্ধু বলে যাদের কাছে টানি, কিছুদিন পর তাদেরও ঠিক বন্ধু বলে আর মনে হয় না। ভালো না লাগা, হেথা নয়-হোথা নয়-অন্য কোথার বৈরাগ্য জীবন জুড়ে, ঝাঁক ঝাঁক দুশ্চিন্তা মস্তিষ্ক দখল করে নেয়। ঘোর বিষাদ আমাকে গ্রাস করে ফেলে। সুয়েনসনকে জানালাম এখানে আর আমার থাকা সম্ভব হচ্ছেনা। বললো, চলে এসো সুইডেনে। কী এক অদ্ভুত অভিমানে আমি প্যারিস ছাড়লাম। বড় অনিচ্ছায় আমি ফিরে গেলাম। ক্রিশ্চান বেসও আপত্তি করেননি। তিনি যদি বলতেন না যেতে, তাহলে জীবন অন্যরকম হতো। তিনি তো জানতেনই যে সুইডেনকেচিরবিদায় জানিয়ে এসেছিলাম। প্যারিস আমার জন্য শেষ অবধি কোনও আশ্রয় হলো না। নিজেই স্বপ্ন গড়েছিলাম, নিজেই সেই স্বপ্ন ভেঙে ফেলি। আসবাবপত্র যা কিনেছিলাম প্যারিসে, দিয়ে দিলাম যাকে তাকে। বাড়ির কনসিয়াজকে ডেকে এনে বলি, যা ইচ্ছে করে নিয়ে যান ঘর থেকে। ছুটে এসে নিয়ে গেলো, যা ভালো লাগেসব। শুধুবই, কাপড়চোপড়, আর কমপিউটার, প্রিন্টার এসব জরুরি জিনিস নিয়ে গেলাম। আবারও মুভার ডাকো। আবারও হাজার হাজার টাকা খরচ করো। কিন্তু ডিপ্রেশনের ডিপোর কাছে ফিরে গেলে কি আমার ডিপ্রেশন সারবে! সুয়েনসনের বাড়িটা সুন্দর করে সাজিয়ে নিজেকে গুছিয়ে নিলাম। কিন্তু অন্যের বাড়ি নিজের রুচিমতো নিজের টাকা খরচ করে সাজালেই বা কী, ও তো আর নিজের বাড়ি হয়ে যাবে না।
এর মধ্যে ভয়ংকর সব কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে। একটা রক্তচাপ মাপার মেশিন কিনেছিলাম প্যারিস থেকে। ডাক্তারি পড়াকালীন সময় থেকেই মেশিন থাকে আমার কাছে। আগের মেশিনটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর অনেক দিন কোনও নতুন মেশিন কেনা হয়নি বলে কিনেছি। বন্ধু বান্ধবদের অসুখ বিসুখ হলে মেপে দেখি রক্তচাপ নিজেরটাও বছরে দুবছরে হয়তো মাপি। ওই মেশিনটা কেনারপর মাস চলে গেলে প্রথম ব্যবহার করলাম, সুয়েনসনের রক্তচাপ মাপার জন্য। মেশিনেরও উদ্বোধন করার জন্য। সুয়েনসনের রক্তচাপ একেবারে স্বাভাবিক। এরপর নিজের রক্তচাপ দেখে তো আমি আকাশ থেকে পড়লাম। মেশিনের গণ্ডগোল হয়েছে বলে আবার মাপলাম। একই মাপ দেখাচ্ছে। ২৫০/১৫০। সুয়েনসনের রক্তচাপ আবার মেপে দেখি ১২০/৭৫। তার মানে মেশিন ঠিক আছে। ওর বেলায় যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছে না, আমার বেলায় করছে। তার মানে। কি এই যে আমি এখন ব্লাড প্রেশারের রোগী? ব্যাপারটি মেনে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। শবাসনে অনেকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবারও মাপলাম। কোনও দুশ্চিন্তা নেই, কিছু নিয়ে কোনও অস্থিরতা নেই, তবে এই ভয়ংকর রক্তচাপটা কেন! এ নিয়ে তো বসে থাকা খুব ঝুঁকিপূর্ণ, যে কোনও সময়ই দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। সুয়েনসনকে বললাম ক্যারোলিন্সকা হাসপাতালে নিয়ে যেতে। কিছুতেই সে যাবে না। অনর্গল বলে যাচ্ছে এসব আমার ন্যাকামি। তোমার অসুখ হলে বাবা তোমাকে বলতো, তেমন। উল্টো দিকের বাড়িতে পিয়া নামের এক সুইডিশ মেয়ে থাকে, ও হাসপাতালের নার্স। মধ্যরাতে ওর কাছে দৌড়ে যাই, অন্তত যদি কোনও ওষুধ থাকে, অথবা ও যদি কোনও হাসপাতালে আমাকে নিয়ে যায়। না, পিয়া নেই বাড়িতে। আমার দুশ্চিন্তা বেড়ে তখন কী অবস্থায় গিয়েছিলো তোমাকে বোঝাতে পারবো না। অনেক অনুরোধের পর গজগজ করতে করতে গেলো সুয়েনসন আমার সঙ্গে হাসপাতালে। ক্যারোলিন্সকা হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে গিয়ে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও দেখি ডাক্তার আসছেনা, রাগ করে বাড়ি চলে এলাম। এই হল বিদেশের বিপদ। আমি নিজে বলি না আমি কে বা আমি কী। বিদেশের ক্রিমিনাল, বাটপাড়, অ আ ক খরসঙ্গে এক সারিতে বসে আমাকে অপেক্ষা করতে হবে ডাক্তারের। ওই অপেক্ষার সময় এমন হতে পারে যে মাথায় রক্তক্ষরণ হলো অথবা হৃদপিণ্ড বন্ধ হয়ে গেলো। দেশে থাকলে নিজে ডাক্তার বলে, বা চেনা বলে আমাকে তড়িঘড়ি দেখা হত। বিদেশে বিশেষ করে সুইডেনে তা হবার জো নেই। সারারাত চরম অস্থিরতায় এক ফোঁটা ঘুমোত পারিনি। সাত সকালে উপসালা শহরে গিয়ে আগে এক বন্ধুর কাছ থেকে চেয়ে একটা নিফিকার্ডিন নিয়ে জিভের তলায় রেখে দুম করে স্বর্গ থেকে রক্তচাপকে নামিয়ে আনি মর্তে। বাবার পকেটে সবসময় ওই নিফিকার্ডিন নামের ওষুধ থাকে। ওভাবে দ্রুত রক্তচাপ কমানো অনুচিত জেনেও বাবা ওভাবেই কমায়। বন্ধুর বাড়িতে আগে গিয়েছি, জেনেই গিয়েছি যে তার নিজের একটা হৃত্যন্ত্রের অসুখ সম্প্রতি হয়েছিল বলে রক্তচাপ কমিয়ে রাখার ওষুধপত্র রাখছে বাড়িতে। বন্ধুটি শান্তনু দাশগুপ্ত, তুমি তো চেন, উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রোবায়োলজির রিসার্চার। সুয়েনসনের বাড়িতে তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলো। ওর বাড়ি থেকে উপসালার অ্যাকাডেমিস্কা হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে যাই। শান্তনুর সুইডিশ বান্ধবী লেনা সঙ্গে গেল। তখন অনেক কম রক্তচাপ, ওই ওষুধটা খাওয়াতে। কম হলেও স্বাভাবিক হয়নি। ডাক্তার রক্তচাপ কমানোর ওষুধ দিলেন। কিন্তু বিটা ব্লকার আমি খাবো কেন? আমি এ দেশের ডাক্তারদের বিশ্বাস করবো কেন? এ দেশে ডাক্তার দেখানোর কারণ হলো একটাই, এখানে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশান ছাড়া কোনও ওষুধ কেনা যায় না। অ্যাকাডেমিস্কা থেকে দেওয়া ওষুধ আমার পছন্দ হয়নি। ইন্টারনেট ঘেঁটে নতুন মেডিক্যাল জার্নালগুলো পড়ে মনে হয়েছে যে এসিই ইনহিবিটর ওষুধটা ভালো। সুতরাং অন্য এক হাসপাতালে গিয়ে বললাম, আমার হার্ট দেখ, আমার ইসিজি দেখ, আমাকে এসিইইনহিবিটর লিখে দাও, আমাকে সোফিয়া হেমেটে রেফার করো। সোফিয়া হেমেট সুইডেনের সবচেয়ে নামকরা হাসপাতাল, সবচেয়ে দামি। আমার যেহেতু এখন সুইডিশ পাসপোর্ট, আমি বিনে পয়সায় ওখানে দেখাতে পারি। রেফার না করলে সোফিয়া হেমেটে কেউ দেখাতে পারে না। বাবার চোখের চিকিৎসা সোফিয়াতে করিয়েছিলাম, হাসপাতালগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালোটায়। সুতরাং সবচেয়ে ভালো জায়গাতেই আমি যাবো। ছোটখাটো আনাড়ি ডাক্তারদের হাতে তোমাকে মরতে হয়েছে, আমাকে মারতে আমি ওদের দেব না। সোফিয়া হেমেটে গিয়েও আমি ওই ওষুধ দাবি করলাম যে ওষুধকে আমি মনে করছি ভালো। মা, তোমার জীবন দিয়ে তুমি আমাকে শিক্ষা দিয়ে গেলে। আমি মুখ খুলিনি, কথা বলিনি, আনাড়ি ডাক্তাররা যা বলেছিলো, তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে তোমাকে হত্যা করেছি আমি। কোনও চ্যালেঞ্জ করিনি, প্রতিবাদ করিনি, আপোস করেছি সারাক্ষণ। নিজের বেলায় যদি আমিনা হতে দিই, তাহলেও যদি অন্তত প্রতিশোধ নেওয়া যায়। জানি তোমার ভালো লাগছে আমার এই সচেতনতা দেখে। কিন্তু মা, আমার কি প্রতি প্রতিবাদে তোমাকে মনে পড়ছেনা, গায়ে আমার জ্বালা ধরছেনা, এখন যা করছি, অনুতাপ করছিনা এই বলে যে, তখন তা করিনি কেন? আমার শক্তি আমার সাহস কোথায় কোন গুহায় হারিয়ে গিয়েছিল? জানি ওরা আমাকে বোবা বানিয়ে রেখেছিলো, ওরা কোনও তৃতীয় বিশ্বের মেয়েকে জোর গলায় কথা বলতে দেখতে চায় না। কিন্তু নিজের আমিত্ব বিসর্জন দিয়ে ওদের সুখী করে কী পেলাম আমি? আমি তো সব হারালাম, যখন তোমাকেই হারালাম।
