বাবাকে জানিয়েছি আমার রক্তচাপ বাড়ার কথা। এত অল্প বয়সে রক্তচাপ বাড়লো বলে বাবাও অবাক। আমার রক্তে ছিল এই রোগ, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। কিন্তু দুশ্চিন্তা ত্বরান্বিত করেছে রোগটি। চল্লিশে পড়িনি এখনও, উচ্চ রক্তচাপের রোগী হলাম। দায়ী কে মা, দুশ্চিন্তা কে দিচ্ছে আমাকে! মানুষগুলোই তো, যারা আমাকে নিয়ে বছরের পর বছর ধরে রাজনীতির নোংরা খেলা খেলছে! তোমার না থাকা দিচ্ছে, ভাই বোনের নির্লিপ্তি দিচ্ছে। যাদের ভালোবাসি, তারা যদি দূর থেকে ক্রমশ দূরেই যেতে থাকে, তবে হতাশার কোলে বসে আমি দিন রাত দোল খাবো না কেন, বলো। সুইডেনে বসে এক লেখা ছাড়া আর করার কিছু থাকে না। সামাজিকতা মাচায় তুলে যে সুইডেনের মতো দেশে থাকতে হয়, তা তো দেখেছেই। তবে তুমি একেবারে নির্মম অবস্থাটাই দেখে গেছে। একটা অন্য গ্রহে যেন বসবাস। মানুষের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। কারও যাওয়া আসা নেই বাড়িতে। শুধু ভূতের মতো বসে থাকো, যেখানে বসে আছো। প্যারিসে আমার কাছে বন্ধুবান্ধব দেশ বিদেশ থেকে ছুটে আসতো, আমাকে দেখার নাম করে প্যারিসকেই দেখতো তারা। আর সুইডেনে থাকলে কেউ আমাকে দেখতে আসতে চায় না। এই অন্ধকার দেশে কে আসবে বলো। অন্ধকার ঠিক কেমন অন্ধকার, তো তুমি দেখেইছে। তবে গ্রীষ্মকালের দিন রাতের ঝকঝকে আলো, এই মধ্যরাতের সূর্যের দেশটায় প্যারিসের পাট চুকিয়ে ফিরে এসে ঘরদোর ভীষণভাবে সাজিয়ে লেখালেখিতে মনও দিলাম। বাড়ি সাজানোয় তো আমার কোনও লাভ নেই, আপাতত না বুঝলেও কিছুদিন পর তো হাড়ে হাড়ে টের পাবো, ওতে শরীর, মন, অর্থ ঢেলে লাভ কিছু নেই। বিদেশ বিভুইএ থাকারইচ্ছেও আমার নেই, তাছাড়া অন্যের বাড়ি সাজালে অন্যের লাভ হয়, নিজের কিছু হয় না, বিশেষ করে সেই অন্যের সঙ্গে যদি হৃদয়ের কোনও সম্পর্ক না হয়। ওসব ফালতু কাজ। ভালো কাজের মধ্যে যা করেছি, তা চারটে বই লিখেছি, ফরাসি প্রেমিক নামের একটি উপন্যাস, খালি খালি লাগে নামের একটি কবিতার বই, উতল হাওয়া আর দ্বিখণ্ডিত, আত্মজীবনীর দ্বিতীয় খন্ড আর তৃতীয় খন্ড।
অভিমান আমাকে কুঁকড়ে রেখেছিলো। আমি তো সেই যে দেশ ছাড়লাম, পরিবারের সবাইকেই ছাড়লাম। দাদা, ছোটদার কাছে কোনও কোনও করিনি, এমনকী ইয়াসমিনের সঙ্গেও যোগাযোগ পুরোটাই বন্ধ করে দিয়েছি। কারও স্বার্থপরতাকে ক্ষমা করতে আমি পারিনি। আমার কেনা গাড়ির মালিক হয়ে বসে আছে দাদা, যে মালিক তোমার ওই অসুস্থ অবস্থাতেও সে গাড়িটা চড়তে দেয়নি তোমাকে। তার বউ ছেলে মিলে তোমাকে জ্বালিয়েছে। তারা মশারির নিচে নরম বিছানায় ঘুমিয়েছে। আর তুমি বারান্দার মেঝেয় মশার কামড় খেতে খেতে রাত পার করেছে। যে টাকা তোমার সম্বল ছিলো অবকাশের নারকেল ডাব বিক্রি করে কিছু টাকা পেতে, সেটিও হাসিনা নিজে বিক্রি করে দেয় তোমার অনুপস্থিতিতে। শুভও জেনে গেছে, তুমি এ বাড়ির সবচেয়ে অবহেলা পাওয়া, অবজ্ঞা পাওয়া একটা তুচ্ছক্ষুদ্র মেয়ে মানুষ, আদরে আহ্লাদে বড় হওয়া লাটসাব হওয়া, নবাব হওয়া শুভও তোমাকে মানুষ বলে মনে করে না। গ্লানি আমাকে কুরে খাচ্ছে, আমি আর তোমাকে অবজ্ঞা করা মানুষদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে গ্লানির ভার বাড়াতে চাই না। তুমি যদি একটুখানি ভালোবাসা পেতে, উজাড় করে দিতে, আসলে তোমার টাকা পয়সা ছিলো না বলে হয়তো তুমি ভালোবাসা পাওনি। ভালোবাসার সঙ্গে তো আজকাল অর্থকড়ির সম্পর্ক বেশ আছে। তুমি যা পারতে, যেভাবেই পারতে, সেভাবে মানুষের জন্য করেছে। ভিক্ষে করতে যারা আসতো, তুমি বাড়ির গৃহিণী বলে মনে করতো তুমিও বুঝি ধনী। তুমি ওদের কাছে ডেকে বলে দিতে, তুমি ধনীর বাড়িতে থাকে, কিন্তু তুমিও ওদের মতো দরিদ্র, বলতে, আসলে ওদের চেয়েও বেশি দরিদ্র, ওদের তোভিক্ষে করে যা হোক কিছু উপার্জনের সামর্থ্য আছে, ওদেরও একধরনের স্বাধীনতা আছে যা তোমার নেই। একটা সময়, আমার মনে আছে, তোমাকে যখন পড়াশোনা কেউ করতে দিলোই না, তোমার যখন কোনও চাকরি বাকরি করার অধিকারও নেই, তখন বলতে তোমার মানুষের বাড়িতে কাজ করে জীবন চালাতে ইচ্ছে করে। মানুষের বাড়িতে কাজ করলে খাবারও জোটে, মাস গেলে বেতনও জোটে। স্বনির্ভর হতে চাইতে। দারিদ্রে তোমার আপত্তি ছিলো না, কিন্তু অত কুৎসিত ভাবে অপমানিত হতে চাইতে না। অপমান তোমাকে করেছি সবাই, মানুষ বলে মনে করিনি। বাবার কাছ থেকেই সম্ভবত সবাই শিখেছি। কিন্তু বাবার অনেক কিছুই তো আমি মানিনি। কিন্তু তোমাকে অপমান করাটাই শুধু মেনেছি। বাকি আর যা কিছুমানি বা না মানি। বাবার সঙ্গে তোমার যে কোনও দ্বন্দ্বে আমি তো চিরকালই বাবার পক্ষই নিয়েছি। বিদেশ থেকে বাবাকে টাকা পাঠিয়েছি। বাবা তার অ্যাকাউন্ট নম্বর কোনওদিন দেয়নি আমাকে। তখন টাকা তোমার অ্যাকাউন্টে পাঠিয়েছি, বলেছিপুরো টাকা তুলে নিয়ে গিয়ে বাবাকে দিয়ে আসতে। হ্যাঁ তুমি তাই করেছে। বাবাকে কেন আমি টাকা পাঠাতাম? বাবার কি টাকার অভাব ছিলো? ছিলো না। বাবা ভালো জামা কাপড় কেনে না, ভালো জুতো কেনে না, ভালো সেইভিং কিটস কেনে না, সে তো অভাবের জন্য নয়, সে তো স্বভাবের জন্য। সারা জীবন তা জেনেও আমি জানিনি। বাবার প্রতি ভালোবাসা বোঝাবার আর বোধহয় অন্য কোনও পথ আমার ছিলো না। যাকে বাবা বলে, যাকে তুমি বলে কোনওদিন ডাকতে পারিনি, তাকে কী করে বলবো ভালোবাসার কথা। তোমাকেও তো একসময় তুমি বলা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম, তোমার সঙ্গে ভাববাচ্যে কথা বলতাম। বোধহয় ভাববাচ্যেই কয়েক বছর কাটিয়েছিলাম। সুইডেনে ফের সম্বোধন করতে শুরু করেছি। ওটাই বোধহয় তোমার জন্য ছিল সুখের ঘটনা। একদিনই তোমার বাথটাবে স্নান করতে দিয়েছিলাম, ফেনা বানিয়ে ফেনার মধ্যে তোমাকে ডুবিয়ে। তুমি বাচ্চা মেয়ের মতো খুশি হয়েছিলে। কী অল্পতে তুমি খুশি হতে মা, অথচ তোমাকে খুশি করতে কেউ আমরা সামান্য চেষ্টাও করিনি। কী কঠিন ছিল হৃদয় আমার। তোমারই সন্তান, তোমার মতো মাটির মানুষের, তোমার মতো বিরাট মনের। অথচ স্বার্থপরতা, হীনতা, নীচতা সব আমাদের সম্বল ছিল। তুমি আমার জীবন বদলে দিয়েছে। টাকা পয়সা এখন আমার কাছে তুচ্ছ একটি জিনিস। তোমার চলে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া আমাকে জীবনের নতুন অর্থ দিয়েছে, একইসঙ্গে অর্থহীনতাও। যদি কিছুর মূল্য আমি দিই জীবনে, সে ভালোবাসার, আর কিছুর নয়। পরিবার পরিজন, বন্ধু, স্বজন, নাম যশ খ্যাতি সব অর্থহীন আমার কাছে। যেখানে ভালোবাসা, সেখানেই দৌড়ে যাই। যাকে ভালোবাসি, তাকে উজাড় করে দিই, তাকেই বোঝাই যে ভালোবাসি। ভালোবাসার জন্য মাইল মাইল পাড়ি দিই। জীবন বাজি রাখি।
