ভাবলে আমার অবাক লাগে যে, যত বিজ্ঞান নির্ভর হচ্ছে মানুষ, ততই যেন ধর্মের বিস্তার হচ্ছে জগত্ময়। বিবর্তন তত্ত্বেষথেষ্ট প্রমাণ নেই, এই কারণ দেখিয়ে অলৌকিক সৃষ্টিতে বিশ্বাসী হওয়ার আন্দোলন চলছেতথাকথিত উন্নত বিশ্বেও। সভ্যতা কি শেষ অবদি পেছন দিকে হাঁটবে, মধ্যযুগের অন্ধকারই কি তবে মানুষের গন্তব্য! ধর্মের জালে সবচেয়ে বেশি আটকা পড়ে নারী, এ আমরা সবাই জানি। পুরুষের তৈরি এই ধর্ম, এই সমাজ এই জঞ্জাল থেকে নারী যদি বেরিয়ে না আসে, আগেও বহুবার বলেছি, আবারও বলছি, নারীর মুক্তি নেই। কেবল নারীর নয়, পুরুষেরও নেই। দারিদ্র্য, বন্যা, খরা পীড়িত দেশে পুংলিঙ্গের জয় জয়কার যেমন, পুঁজি-পীড়িত দেশেও তেমন। কোথাও আমি দেখিনি একটি সত্যিকার বৈষম্যহীন সুস্থ সমাজ। অর্থনৈতিক মুক্তিই সকল বৈষম্য থেকে মুক্তি দেবে মানুষকে, এ কেবলই তত্ত্বকথা। যুক্তি এবং মুক্তচিন্তার সুষ্ঠু চর্চাই অন্ধকার সরাতে পারে, পারে ক্ষুধা, অজ্ঞানতা, অশিক্ষা, অন্ধতা, বৈষম্য আর সন্ত্রাসের গ্রাস থেকে বাঁচাতে মানুষকে। আমার মেয়েবেলা বইটির অনেক চরিত্রই, আমার চারপাশের, দরিদ্র নয়, কিন্তু অতি নিচ, অন্ধ, অজ্ঞান। আমি জীবন যেমন দেখেছি, লিখেছি। ও কেবল আমার জীবন নয়, সমাজের অধিকাংশ মেয়ের জীবনই ওরকম। ভয়ে কুঁকড়ে থাকা, বিষাদে বিবর্ণ হয়ে থাকা। ওই বয়সেই মেয়েরা শিখে নিতে বাধ্য হয় যে মেয়েতে ছেলেতে তফাৎ অনেক, মেয়েদের অনেককিছু করতে নেই, ভাবতে নেই, অনেক কিছু বুঝতে নেই, বলতে নেই। আমিও তেমন শিখেছিলাম।
মাত্র দুশ কী আড়াইশ পাতায় পুরো শৈশব কৈশোর কি তুলে আনা সম্ভব! ছিটেফোঁটা যা মনে পড়েছে, আধখেচড়া, অনেকটা খসড়া মত, লেখা। ধোঁয়াটে, ধুলোটে; অস্পষ্ট, অপুষ্ট, অদক্ষ হাতের স্কেচ। সামান্য বইটির জন্য আজ যে অসামান্য সম্মান আমাকে দেওয়া হচ্ছে, তা আমাকে কুণ্ঠিত করছে, সেই সঙ্গে গর্বিতও। আমি ক্ষুদ্র তুচ্ছ মানুষ। ভালবাসা আমি ঢের পেয়েছি, এত ভালবাসা পাবার যোগ্য আমি নই। এ জীবনে দুঃখ সুখ দুটোই বড় প্রবল হয়ে আমার কাছে ভিড়েছে। মাঝে মাঝে মনে হয় এত দুঃখ পাবারও আমার মত সামান্য একজন মানুষের জন্য প্রয়োজন ছিল না। আমার বুঝি ওই ভাল ছিল, সূর্যাস্তের সবগুলো রঙ গায়ে মেখে কাশফুলে ছাওয়া ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে ক্লান্তিহীন, বাতাসের উল্টোদিকে, কেবল দৌড়ে যাওয়া। আমার বুঝি ওই ভাল ছিল, জীবনভর জীবন দেখতে দেখতে যাওয়া। ছোট ছোট দুঃখ সুখে দোলা। বেশ ভাল করেই জানি আমি ভাল সাহিত্যিক নই, ভাল নারীবাদীও নই। জীবন যেহেতু অর্থহীন, আর এই জীবন যেহেতু বড় এক প্রাপ্তিও, তাই জীবনের যা কিছু, সবই ভোগ করতে চাই, আর এই ভোগে যা কিছুই বাধা হয়ে আসে, ডিঙোতে চাই, রীতি, নীতি, যন্ত্র, মন্ত্র, পুরুষতন্ত্র, ধর্ম, বর্ম সবই। মাত্র কদিনের এই জীবনকে খামোকো অদ্ভুত সব নিয়মের জালে জড়াবো কেন! কেনই বা শেকলে বাঁধব! স্বাধীনতা, এই শব্দটির মূল্য আমার কাছে অনেক। এটি পেতে গিয়ে বার বার আমি পরাধীন হয়েছি। বারবার শেকল ছিঁড়েছি। নারীমাংসের গন্ধ পেলে হাঁ-মুখোপরাধীনতা একশ দাঁত মেলে দৌড়ে আসে, কামড়ে খেতে চায়। নারীর জীবন চলে যায় কেবল জীবন বাঁচাতে।
আমি আর যাই করি, প্রতারণা করি না, না নিজের সঙ্গে, না অন্যের সঙ্গে। অকপটে সত্য বলতে আমার বেশ আনন্দ হয়। জীবনে এ নিয়ে অনেক ভুগতে হয়েছে আমাকে। নিজের দেশে যেমন, অন্য দেশেও তেমন। আর লেখার বেলাতেও, বানিয়ে গল্প লেখার চেয়ে সত্য ঘটনা লেখায় আমার আগ্রহ বেশি। চারপাশে কত গল্প ঘটছে আমাদের। কেন বানাতে যাব! আমার কল্পনাশক্তি সম্ভবত কম, আমার স্মরণশক্তির মত। আগাগোড়া দুর্বল মানুষ আমি, লোকে সবল বলে ভাবে, ভুল করে। যত যাই বলি না কেন, আমি নেহাতই সাদাসিধে মানুষ, যারাই আমার কাছে এসেছে, বুঝেছে। আমি খোলস বা মুখোশ এগুলো একেবারে গায়ে রাখতে পারি না, ওসব গায়ে আছে ভাবলেও হাঁসফাঁস লাগে। নিজের জীবনকাহিনী লিখছি, নিজেকে চিনি বলে। নিজের
জীবনের গল্প বলা শেষ হয়ে গেলে হয়ত অন্য কারও জীবন নিয়ে লিখব, যাকে চিনি, যার চরিত্রের গভীরে যেতে পারি অনায়াসে। মানুষ, এখনও আমার কাছে বড় চেনা, আবার বড় অচেনাও। কারও সঙ্গে বত্রিশ বছর কাটিয়েও মনে হয়, তাকে ঠিক চেনা হয়নি আমার। আবার নিজের কথাও মাঝে মাঝে ভাবি, এত যে চিনি বলে ভাবি, নিজেকে কি আসলেই আমি ভাল চিনি!
একসময় বলতাম সকলেরই দু একজন আত্মীয়, সংসার, ঘরে ফেরা, ইত্যাদি কিছু না কিছু থাকে, কেবল আমারই কিছু নেই, কেবল আমারই খরায় ফাটা বুকে বেশরম পড়ে থাকে শূন্য কলস। সকলেরই জল থাকে, দল থাকে, ফুল ফল থাকেই, আমারই কিছু নেই, সমস্ত জীবন জুড়ে ধুধু একপরবাস ছাড়া। এখন আর তেমন করে বলছি না। পরবাস আছে বটে জীবনে, এখন আপনারাও আছেন, যে ভালবাসা আমি পাচ্ছি আজ, তা সঙ্গে করে নিয়ে যাব দূরের দেশে। আমার আকাশ জুড়ে হাজার তারার মত ফুটে থাকবে এসব; অন্ধকারে, দুর্যোগে আমাকে আলো দেবে, আশা দেবে। আমি নিজেকে আরও আরও চিনতে শিখব। আমি লিখতে শিখব। আপনারা, সম্ভবত, প্রায় মরে যাওয়া লেখককে একটু একটু করে বাঁচিয়ে তুলছেন। কী দেব? শুভেচ্ছা, ভালবাসা, শ্রদ্ধা সবই গ্রহণ করুন, আমাকে ধন্য করুন। হোক না অন্য দেশে আমার জন্ম, না হয় থাকি দূরের কোনও দেশে, আমি তো আপনাদেরই মানুষ, আত্মীয়-মতো, আপন। আমার কি কোথাও আর আপন কেউ আছে? নমস্কার।
