বাবার সঙ্গে আরেকবার দেখা হতে আমারপারতো। কলকাতার আনন্দপুরস্কার অনুষ্ঠানে বাবাকে অনেক বলেছিলাম আসতে, আসেনি। সম্ভবত আমার চেয়েও তখন তার প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে দেশের বাড়ি, চেম্বার, তার সকাল সন্ধে রোগী দেখা, দাদার সংসারের দায়িত্ব নেওয়া। আনন্দ পুরস্কার দেওয়া হয়েছিলো আমার মেয়েবেলার জন্য, যে আনন্দ থেকে আমার বইটা ছাপানো হয়নি, সেই আনন্দই আমাকে পুরস্কার দিল! এই প্রথম পুরস্কার অনুষ্ঠান গ্র্যান্ড হোটেলের বদলে রবীন্দ্র সদনে করা হল। পুরস্কার অনুষ্ঠানের মঞ্চ অসাধারণ, যেন বনেদি একটি বৈঠক ঘর। সেই অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তোমার কথা বলেছিলাম মা। বক্তৃতার পুরোটাই তোমাকে শোনাতে ইচ্ছে করছে, শোনো।
নমস্কার। এখানে আগেও এসেছিলাম আমি, এই মঞ্চে, এসেছিলাম পাশের দেশ থেকে, তখন ঢাকার হাসপাতালে চাকরি করি, পাশাপাশি লিখি, কটি মাত্র বই বেরিয়েছে। এবার এলাম, তবে আর পাশের দেশ থেকে নয়, বহু দূরের দেশ থেকে, এখন আর ডাক্তারি করা হয় না, কেবল লেখাই কাজ। তখনকার সেই বিরানব্বই সালের আমি আর আজকের আমির মধ্যে অনেক পার্থক্য। মাঝখানে আট বছর কেটে গেছে, আর এই আট বছরে অনেক কিছু ঘটে গেছে এই একটি জীবনে। যা ঘটেছে, সবই লেখার কারণে। লিখি বলে ডাক্তারি ছাড়তে হয়েছে, লিখি বলে মিছিল হয়েছে, হত্যার হুমকি এসেছে, মাথার মূল্য ধার্য হয়েছে, লিখি বলে মামলা জারি হয়েছে, হুলিয়া বেরিয়েছে, ধর্মঘট হয়েছে, মানুষ খুন হয়েছে, লিখি বলে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি পালাতে হয়েছে রাতের পর রাত। লিখি বলে স্বজন বন্ধু সব ছাড়তে হয়েছে, ছাড়তে হয়েছে ঘর বাড়ি, ব্রহ্মপুত্র, দেশ। লিখি বলে আবার পুরস্কারও জুটেছে।
জীবন এমনই! অনিশ্চিত। আজ সম্মান পাচ্ছি, কাল হয়ত অসম্মানের চূড়ান্ত হব। আজ ঢিল ছুঁড়ছে কেউ তো কাল বাহবা দেবে। আজ মনে রাখছে তো কাল ভুলে যাবে। আজ বেঁচে আছি, কাল মরে যাব। জীবনের কোনও তো অর্থ নেই আসলে, যদি না নিজেরা অর্থপূর্ণ করি জীবনকে। একটি ব্যাপার আমি বেশ বুঝতে পেরেছি, ধর্মান্ধ সন্ত্রাসীরা আমাকে তাড়া করতে করতে যেখানে নিয়ে ফেলেছে, অনাত্মীয় একটি পরিবেশে, অচেনা একটি জগতে, যেন আমি একা একা কষ্ট পেতে পেতে মরে যাই, যেন আমি হারিয়ে যাই বিষম বিরুদ্ধ স্রোতে, ভুলে যাই কী কারণে এই আমি, আমি সেখানে, এটা ঠিক, আমাকে রীতিমত যুদ্ধ করতে হচ্ছে, নিজের সঙ্গে নিজেকেই। এক আমি চাই সবার অলক্ষ্যে একটি বিন্দুর মত, ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যেতে, অভিমানে, বিষাদে। আরেক আমি হঠাৎ হঠাৎ বিষাদ ঝেড়ে উঠে দাঁড়াই বাঁচব বলে। বেঁচে থাকতে হলে আর এমন কিছু নেই আমার, যে, নিয়ে বাঁচি। এক লেখা ছাড়া।
বাংলা থেকে দূরে আমি, লিখি বাংলায়। বাঙালির জীবন থেকে হাজার মাইল দূরে বসে বাঙালির গল্প লিখি। এ যে কী রকম কঠিন কাজ, সে আমি বুঝি। আমার প্রতিদিনকার জীবন যাপনে বাংলার ছিটেফোঁটা নেই। স্মৃতি নির্ভর সব, যা কিছুই লিখি। ছ বছরপর কলকাতায় আসার সুযোগ হল, এ আমার জন্য পরম পাওয়া! এ সুযোগ আমি হারাতে চাই না। এর মধ্যেই সুযোগটি কেড়ে নেবার পাঁয়তারা চলছে, জানি না, ভারতে এই আমার শেষ আসা কিনা। আগেই বলেছি, জীবন অনিশ্চিত। আর আমার জীবনে অনিশ্চয়তা বরাবরই বড় বেশি।
.
যে বইটির জন্য আজ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে, সেই বইটিই, মাত্র আধঘণ্টার উড়ান দূরত্বে, পাশের দেশে, আমার নিজের দেশে, নিষিদ্ধ। ওখানে ছাপা হওয়ার আগেই এটি নিষিদ্ধ। বলা হয়েছে, এ অশ্লীল একটি বই, বলা হয়েছে, এটিপড়লে লোকের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগবে। এরকম কথা আমার অন্য বই সম্পর্কেও বলা হয়, যা কিছুই উচ্চারণ করি আমি, ওই একই দোষ। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছি এই অপরাধে আমাকে বারবার আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। এসব আমার অধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়। কিন্তু কারও অধর্মীয় অনুভূতিকে মোটে মূল্য দেওয়ার বিধান কোথাও নেই, কোনও আইন নেই যে আশ্রয় নেব। আমার জন্য এই দিনটি অবিশ্বাস্য একটি দিন, যখন বাংলা সাহিত্য থেকে দূরত্ব আমার ক্রমশ বাড়ছে, এবং আমি আশংকা করছি দিন দিন এই ভেবে যে লেখার শক্তি বুঝি আমার ফুরিয়ে গেছে, আমার বুঝি শুরুতেই সারা হল, তখনই এই আশ্চর্য সম্মান নাছোড়বান্দার মত একটি ইচ্ছে জাগাচ্ছে ভেতরে আমার, লেখার ইচ্ছে। …আজ যদি আমার মা বেঁচে থাকতেন, বিষম খুশি হতেন। স্বামী এবং কন্যা চিকিৎসক, আর তাঁকে মরে যেতে হয়েছে বিনা চিকিৎসায়। অভাবে, অনাহারে, অনাদরে, অবহেলায়, অসম্মানে, অত্যাচারে মার সারা জীবন কেটেছে। আমার মার একার গল্পই যথেষ্ট সমাজে নারীর অবস্থান জানতে। আমি যখন নারী পুরুষের বৈষম্যের বিরুদ্ধে লিখছিলাম, লিখে নাম করছিলাম, আমি কিন্তু নিজের মার দিকে ফিরে তাকাইনি। দেখিনি কতটা যন্ত্রণা তিনি সইছেন, দেখিনি পুরুষতন্ত্রের পাকে পড়ে কেমন একটি দাসী বনেছেন তিনি, যে দাসীর প্রধান এবং প্রথম কাজ স্বামী সন্তানের সেবা করা, তাদের সুখী করা। মা আমাদের সবাইকে সুখী করেছিলেন নিরন্তর সেবায়, তাঁর নিজের যে আলাদা একটি জীবন আছে, এবং সে জীবনটি যে কেবল তাঁরই, সে জীবনটি যেমন ইচ্ছে যাপন করার অধিকার তাঁর আছে, তা তাঁকে কখনই জানতে দেওয়া হয়নি। নারী যে সম্পূর্ণ মানুষ তা সেই আদিকাল থেকেই স্বীকার করা হয়নি, আজও হয় না। পুরুষের পাঁজর থেকে তৈরি নারী, পুরুষেরা যাহা বলিবে, নারীকে তাহাই করিতে হইবে, না করিলে তাহাকে আচ্ছা করিয়া পিটাইতে হইবে। নারীর ঘাড়ের একটি হাড় বাঁকা, তাই তারা বাঁকা পথে চলে। স্বাধীনতায়, আর যারই অধিকার থাকুক, কুকুর বেড়াল গরু ছাগল, নারীর অধিকার নৈব নৈব চ। এই আমিও, নারীবাদের জন্য দিনরাত আপোসহীন লড়াই করেও মাকে আমি মা ছাড়া আলাদা কোনও নারী হিসেবে দেখিনি, আর মা মানেই তো, সমাজ আমাদের যা শিখিয়েছে, সংসারের ঘানি টানে যে, সবচেয়ে ভাল রাঁধে যে, বাড়ে যে, কাপড় চোপড় ধুয়ে রাখে, গুছিয়ে রাখে যে; মা মানে হাড় মাংস কালি করে সকাল সন্ধে খাটে যে, যার হাসতে নেই, যাকে কেবল কাঁদলে মানায়, শোকের নদীতে যার নাক অবদি ডুবে থাকা মানায়। সমাজের অনেক কিছুই আমরা মেনে নিই না বটে, প্রতিবাদ করি, কিন্তু অজান্তে অনেক সংস্কারই গোপনে লুকিয়ে থাকে এই আমাদের ভেতরই। আসলে পিতৃতন্ত্র বা পুরুষতন্ত্র এত শক্ত হয়ে বসে আছে আমাদের ঘাড়ে, এত বেশি ছড়িয়ে আছে আমাদের রক্তে, মস্তিষ্কে, অনেক সময় এ থেকে দূরে এসেছি ভেবেও কিন্তু এরই বীর্যে খাবি খেতে থাকি।
