প্যারিসে পৌঁছোনোর পর খবর পাই, ‘আমার মেয়েবেলা’ বইএর জন্য আমি এবারের আনন্দ পুরস্কার পেয়েছি। কত তোপুরস্কার পেয়েছি বিদেশে। কিছুই আমাকে এত সুখ দিতেপারে না, যত সুখ আনন্দ পুরস্কারের খবরটি দেয়। খুব গোপন একটি তথ্য আমাকেপুরস্কার কমিটির একজন জানান, তা হল, বিরানব্বই সালে কমিটির একজনই আমার আনন্দ পুরস্কার পাওয়ার বিরুদ্ধে ছিলেন, এবার দুহাজার সালেও ওই একজনই বিরোধিতা করলেন, তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। মানুষের মুখ ও মুখোশ আমি কখনও আলাদা করতে পারি না। মুখোশকেই মুখ বলে চিরকাল মনে করেছি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার কোনওকালেই কিছু নিয়ে বিরোধ ছিল না। তাঁকে শ্রদ্ধা করি, লেখক হিসেবে তো বটেই, তাঁর নাস্তিকতা এবং বাংলা ভাষা নিয়ে তাঁর লড়াইএর ঘোর সমর্থকআমি। তিনিও সবসময় বলে আসছেন, আমাকে ভালোবাসেন, স্নেহ করেন। অনেক আগে, বাংলাদেশে লজ্জা নিষিদ্ধ করার পর বিবিসি একটা তথ্যচিত্র করেছিলো আমার ওপর। ওই তথ্যচিত্রেই দেখিয়েছে আমার সম্পর্কে কলকাতার কফি হাউজে বসে বুদ্ধদেব গুহ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, নবনীতা দেব সেন–তিন বড় সাহিত্যিকের আলোচনা। তিনজনের মধ্যে একজনই আমার অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন, তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁকে সবসময় খুব কাছের মানুষ ভাবতাম। কখনও কল্পনাও করিনি আনন্দ পুরস্কার কমিটির সভায় বসে আমার বিরুদ্ধে বলেন তিনি। হতেই পারে যে তিনি মনে করছেন না পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য আমি। হতেই পারে তিনি আমাকে লেখক বলেই মনে করছেন না। কিন্তু মুশকিল হল তাঁর সঙ্গে কথা বললে সেটা বোঝার কোনও উপায় থাকে না। বরং মনে হয়, আমাকে বিশাল গুরুত্বপূর্ণ লেখক ভাবেন আর আমার পক্ষে এইমাত্রই হয়তো কোথাও থেকে যুদ্ধ করে এলেন। এরপর তোমা, তুমি জানোনাপশ্চিমবঙ্গে আমার বই নিষিদ্ধ হয়, এবং যে কয়েকজন বুদ্ধিজীবী আমার বই নিষিদ্ধ করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন, তার মধ্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একজন। কিছু কিছু সত্যকে, আজও, সবকিছু জানার পরও, আমার অসম্ভব বলে মনে হয়।
দুদুবার বিজেপি সরকার আমাকে ভিসা দিয়েছে ভারত ভ্রমণের। কিন্তু আনন্দপুরস্কার নিতে কলকাতায় যাওয়ার জন্য ভারতের ভিসা নিতে গেলে দূতাবাস থেকে বলে দিলো ভিসা দেবে না। কী কারণ, বোম্বেয় আমার বিরুদ্ধে মুসলমানদের মিছিল হয়েছে, তাই। কলকাতায় জানিয়ে দিলাম খবর, আমাকে ভিসা দেওয়া হচ্ছে না। মহেশ ভাটের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল, তাঁকেও জানালাম। কী কী সব মন্ত্রী টস্ত্রীর সঙ্গে নাকি কথা বলেছেন, তাতে কাজ হবে বলে মনে করেছিলেন। শেষে দেখলেন অসম্ভব। ওদিকে কলকাতা থেকে আনন্দবাজারের মালিক অভীক সরকার চেষ্টা করতে লাগলেন, শুনলাম তিনি দিল্লি অবধি গেছেন এ নিয়ে সরকারের বড় কারও সঙ্গে কথা বলতে। অবাক হই ভেবে বিজেপি নাকি মুসলমান বিরোধী। বিরোধীদলে বসে অনেক কিছুই হয়তো বলে, কিন্তু ক্ষমতায় বসে অন্য দল যেভাবে দেশ চালায়, বিজেপিও একইভাবে চালায়। মুসলমান মৌলবাদীদের অন্যায় আব্দার অন্য দলের মতো বিজিপিও মেনে নেয়। মুসলমানের ব্যক্তিগত আইন যেটি খুব উলঙ্গভাবে নারীবিরোধী, সেটি দূর করে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির কথা বললেও ক্ষমতায় এসে সেই বিধি ভাবনা উড়িয়ে দেয় বিজেপি। অনেক চেষ্টা তদবিরের পর শেষ মুহূর্তে ভিসার অনুমতি জোটে। কিন্তু যারা আমাকে আগে রীতিমত আদর যত্ন করেছিলো দূতাবাসে, তারা আদর যত্ন তো দূরের কথা, বরং গম্ভীর মুখে আমাকে শর্তের একটি কাগজ দেয় সই করার জন্য। ভিসা পেতে হলে যা আমাকে মানতে হবে, তা হল, ভারতের রাজনীতি নিয়ে কোনও শব্দ উচ্চারণ করা চলবে না, কলকাতা ছাড়া আর কোনও শহরে পা দেওয়া চলবে না, পুরস্কার সম্পর্কিত অথবা সাহিত্য সম্পর্কিত বিষয় ছাড়া কোনও সাক্ষাৎকার দেওয়া চলবে না। ভিসা দেওয়ার আগে টিকিট দেখে নিয়েছে যে ফিরছিপাঁচদিনপর। না, পাঁচদিনের বেশি আমাকে ভিসা দেওয়া হয়নি।
টিকিট পড়ে রইলো টেবিলের কাগজপত্রে ডুবে। ভিসা পাসপোর্টও কিছুর তলায়। সেদিন আমি ভুলে গেছি যে আমার কলকাতায় যাওয়ার কথা। দিব্যি মগ্ন ছিলাম কবিতায়, ভাসছিলাম, ডুবছিলাম চিরাচরিত নিঃসঙ্গতায়। যারা আমার জন্য অপেক্ষা করছিল দমদম বিমান বন্দরে, তাদের ফোনে আমার গভীর রাতের ঘুম ভাঙে। তুমি আসোনি কলকাতায়? বললাম, কাল আমার ফ্লাইট। বলো কি, তোমার তো ফ্লাইট আজকে ছিলো! উঠে কাগজপত্রের জঙ্গল থেকে টিকিট বের করে দেখলাম ভুল আমিই করেছি। কলকাতা থেকে আবার জরুরি টিকিটের ব্যবস্থা করে দিল যেন পরদিন আমি ফ্লাইট ধরতে পারি। যেদিন আনন্দ পুরস্কার দেওয়া হবে সেদিন গিয়ে কলকাতা পৌঁছোলাম। বন্ধুরা আমার পুরস্কার পাওয়ায় রীতিমত উত্তেজিত। আমার দুএকটা সাদামাটা শাড়ি দেখে বিশ্ব রায় দৌড়ে গিয়ে গরদের একটা লাল পাড় শাড়ি কিনে নিয়ে এলো, ব্লাউজও বানিয়ে নিয়ে এলো অল্প সময়ে। বিশ্ব রায় গতবারের কলকাতা ভ্রমণে চমৎকার বন্ধু হয়ে উঠেছিলো। যত বেশি থাকা হয় কলকাতায়, তত বেশি বন্ধু গড়ে ওঠে। অনেকে নাম দেখে, যশ দেখে বন্ধু হতে চায়। কিন্তু সেই বন্ধুত্বে কোনও না কোনওসময় চিড় ধরেই। বাঙালিরা, লক্ষ করেছি খুব দ্রুত বন্ধু হতে পারে। বিদেশিরাও বন্ধু হয়, তবে এমন তুড়ি বাজিয়ে হয় না। বন্ধু হতে ওরা সময় নেয় অনেক। স্বতস্ফূর্ততা আমার রক্তে। বাঙালির ভালোবাসা আমার নির্জনতা নিমেষে ঘুচিয়ে দেয়। জানি না কী দেয় আমাকে, মনে হয় হারিয়ে যাওয়া গোটা একটা দেশ দেয়।
