বাবা দেশে ফিরে যাওয়ার কিছুদিন পর আমিও ফিরে যাই প্যারিসে। কেন যে যাই কে জানে। অবশ্য কলকাতায় বাড়ি নেই ঘর নেই, এক হোটেলে হোটেলে আর কদিন থাকবো। আর ভিসাও তো ফুরিয়ে যায় দেখতে দেখতে। কিন্তু সেবার কী হলো শোনেনা, বোম্বে থেকে আমার হোটেলে ফোন করলেন অশোক সাহানি, এক মারাঠি লোক, তিনি আমার শোধ উপন্যাসটা বাংলা থেকে মারাঠি ভাষায় অনুবাদ করেছেন। বইটা ছাপাও হয়েছে বোম্বেতে। অশোক সাহানির আবদার এবার যেন কলকাতা থেকেপ্যারিস ফেরারপথে বোম্বেতে আমি কয়েকঘণ্টার জন্য থামি, বইটার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকি। রাজি না হওয়ার কিছু নেই। কলকাতা থেকে সন্ধেয় বোম্বেতে পৌঁছেপ্যারিসের রাতের বিমান ধরার বদলে সকালে বোম্বে পৌঁছে শোধের অনুষ্ঠান শেষ করে রাতে প্যারিসের দিকে রওনা হবো, এতে ক্ষতি নেই কোনও কিন্তু বিশাল গণ্ডগোল বেধে গেল। অশোক সাহানি আমার বোম্বের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার খবর ছাপিয়ে দিয়েছেন ওখানকার পত্রিকায়। আর সঙ্গে সঙ্গে বোম্বের মুসলিম মৌলবাদীদের মিছিল শুরু হয়ে যায়। তারা ঘোষণা করে দেয় বোম্বের মাটিতে পা দেওয়ার কোনও অধিকার আমার নেই। আমি এলে বিমান বন্দরে ওরা আগুন জ্বালিয়ে দেবে। এদিকে এসবখবরে বোম্বের মৌলবাদবিরোধী দলগুলোর প্রতিবাদ শুরু হল। মুহুর্মুহু ফোন আসতে শুরু করলো তিস্তা শীতলবাদি, জাভেদ আনন্দ, এমনকী জাভেদ আখতারেরও। তাঁরা চান আমি যেন আবার ঘুণাক্ষরেও না সিদ্ধান্ত নিই বোম্বে না আসার। আসলে আমি সিদ্ধান্ত না নিলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর উপদেশ ছিল বোম্বে হয়ে না গিয়ে দিল্লি হয়ে যেন প্যারিস যাই। ওতেই রাজি ছিলাম। কিন্তু যতবার ওঁদের বলি, বোম্বে হয়ে যাবো না, ততবারই ওঁরা বলেন, আমি না গেলে মৌলবাদীদের বিজয় ঘোষিত হবে, মৌলবাদীরাপার পেয়ে যাবে এই অবৈধ ফতোয়া দিয়ে। ওঁরা নাহয় আন্দোলন করছেন, কিন্তু মরতে তেহবে একা আমাকে, আমিই যখন টার্গেট। লেখার আরও বই আছে বাকি, জেনে শুনে জীবন হারাতে চাই না এখন। বোম্বের মাটিতেপা দিলে আমাকে মেরে ফেলবে, যারা ঘোষণা করেছে, তারা ছোটখাটো কোনও দল নয়। তারা যে কত ভয়ংকর, তা আমি বাংলাদেশে দেখে এসেছি। মূর্খ উন্মাদের সামনে বুক পেতে দাঁড়াবার কী প্রয়োজন। আর পাশ্চাত্যের নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তার অভিজ্ঞতা যার আছে, তার কখনও এ দেশের নড়বড়ে নিরাপত্তার ওপর আস্থা রাখার প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু ওঁরা বলেই চলেছেন, সরকারের সঙ্গে কথা হয়েছে ওঁদের। নিরাপত্তার ব্যবস্থা কঠোর করা হবে। শেষে অন্তত এইটুকু বলে নিস্তার পেতে চাই যে মুখ্যমন্ত্রী চাইছেন না বোম্বেতে আমি যাই। ওঁরাও জোঁকের মতো লেগে থেকে মুখ্যমন্ত্রীকে রাজি করালেন। বোম্বে যেদিন নামলাম, আমি তো অবাক, মহেশ ভাট, আমার প্রিয়পরিচালক দাঁড়িয়ে আছেন আমার অপেক্ষায়, হাতে ফুল। দাঁড়িয়ে আছেন আমার প্রিয় গীতিকার জাভেদ আখতার, দাঁড়িয়ে আছেন শাবানা আজমি, আমার প্রিয় অভিনেত্রী। শাবানা আজমি দিল্লিতে ছিলেন। দিল্লি থেকে চলে এসেছেন বোম্বের বিমান বন্দরে আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে। পুনে থেকে লজ্জার প্রকাশক এসেছেন। তিস্তা, জাভেদ ওঁরা তো ছিলেনই। ওঁরা হিন্দু মৌলবাদের বিপক্ষে যেমন লড়েন, মুসলিম মৌলবাদের বিপক্ষেও লড়েন। বিমান বন্দরের ভিআইপি রুম আমাকে বিশ্রামের জন্য দেওয়া হল। বিশ্রামের কোনও দরকার ছিল না। আমি রীতিমত উত্তেজিত। কী যে কথা বলবো ওঁদের সঙ্গে বুঝতে পারছিলাম না। সাংবাদিকদের ভীষণ ভিড়। বিমান বন্দর ঘিরে আছে শত শত পুলিশ। আয়োজকরাই বললেন, আমাকে নাকি জেড সিকিউরিটি দেওয়া হচ্ছে। একশ চুয়াল্লিশ ধারা জারি করা হয়েছে শহরে। বোম্বের রাস্তা থেকে জঙ্গিদের গ্রেফতার করাও হচ্ছে। আমাকে প্রথম জুহু বিচে জাভেদ আনন্দর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল। ওখানে দুপুরের খাওয়া। নিজে সে পারসি। কিন্তু ধর্মমুক্ত। কমব্যাট নামের একটা মৌলবাদ বিরোধী ম্যাগাজিন ছাপান তিস্তা আর জাভেদ। ওই বাড়ির উঠোনে বসেশাবানা, জাভেদ আখতার, তিস্তা–ওঁদের সবার সঙ্গে মৌলবাদের উত্থান নিয়ে আলোচনা হয়। মহেশ ভাট বলেন, আমার জীবন নিয়ে তিনি একটা সিনেমা বানাতে চান। কোথাও ঘোষণাও দিয়ে দেন। বিদেশে আমাকে ঘিরে অনেক উৎসব হয়। যত বড় আর জমকালোই হোক না কেন সেইসব উৎসব বা সংবর্ধনা, বোম্বের এই উৎসব আমাকে উত্তেজনা দেয়, কারণ এঁদের কাজের সঙ্গে আমি পরিচিত, আর এঁরা একই লড়াই করছেন, যে লড়াই আমি আমার লেখার মাধ্যমে করছি বহু বছর। আমরা একই উপমহাদেশের মানুষ। আমাদের ইতিহাসটাও যেমন এক, আমাদের লড়াইটাও প্রায় একইরকম। এর আগে জাভেদ আখতারের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল স্টকহোমে। তিনি ভারতীয় অভিবাসীদের আমন্ত্রণে ওখানে গিয়েছিলেন, কবিতা শোনাচ্ছিলেন। আমাকে দেখে ডেকেপাশে বসালেন, পড়েছিলেনও আমাকে নিয়ে একটা কবিতা শব্দের জাদুকর তিনি। কিন্তু কাছে এলে বুঝি কী সাধারণ মানুষ এঁরা। শাবানাও। আমার মতোই সাধারণ। দুঃখ সুখ এঁদেরও আর সবার মতোই। আসলে দেশেবিদেশে যত বড় মানুষের সঙ্গেপরিচয় হয়েছে, কাউকে আমার খুব দুর্বোধ্য ঠেকেনি। রাতে অনুষ্ঠানেরপর জাভেদ আখতার বসে রইলেন টেলিভিশনের সামনে, কখন আমাদের অনুষ্ঠানের খবর বা আমার খবর দেখায় দেখতে। অনুষ্ঠানে সবাই বক্তৃতা করেছিলেন। শোধ বইয়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটা প্রচুর পুলিশ পাহারায়হয়, মূলত মৌলবাদবিরোধী মূল্যবান একটা অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে।
