আমাকে একটিবার দেখতে চায়, যেহেতু কাছেই আছি। আমি খবর পেয়ে উড়ে চলে গেলাম লন্ডনে। ছোটদা আর সুহৃদকে পেয়ে আমার কী যে ভালো লাগলো। কিন্তু খানিক পরই ছোটদা সোজাসুজি বলে দিল, সে লন্ডন পর্যন্ত সুহৃদকে এনেছে। কালই সে ঢাকা ফিরে যাচ্ছে বিমানে, সুহৃদকে কানাডা বা আমেরিকার টিকিটের টাকা দেওয়া, ওখানে থাকা খাওয়ার খরচ দেওয়া তারপক্ষে সম্ভব নয়। তার মানে টাকা আমাকে দিতে হবে। আসলে আমি জানতাম না, আমাকে দেখার জন্য নয়, সুহৃদকে দিয়ে প্যারিস থেকে আমাকে লন্ডন ডেকে পাঠানোর মূল উদ্দেশ্য হল, আমার ঘাড়ে সুহৃদকে ফেলা। যে ছেলেকে তার জন্ম থেকে ভালোবাসছি, সে ছেলেকে তো মাঝপথে রেখে তার বাবা চলে গেলেও আমি চলে যেতে পারি না। তার জন্য আমি তো নিঃস্ব হয়ে গেলেও, জীবন দিয়ে হলেও যা কিছু করার করবো। কিন্তু আমি তো অঢেল টাকা আনিনি। ছোটদার সে নিয়ে ভাবনা নেই। সে জানেনা কী করে সমস্যার সমাধান হবে। চলে গেল ছোটদা। আমার ওপর সুহৃদের সব দায়িত্ব ওর কানাডায় যাওয়া, হোটেলে থাকা, কানাডা থেকে আমেরিকা, যদি আমেরিকায় ঢুকতে না দেয় তবে ঢাকায় ফেরত যাওয়া, তার ওপর আবার যদি কোনও অঘটন ঘটে, সেই অঘটন সামলান। লন্ডনের কোনও এক হোটেলে গিয়ে ক্রেডিট কার্ড থেকে যত ক্যাশ টাকা তোলা যায় তুলোম। কিন্তু ও টাকায় ওর যাত্রা হবেনা। ছোটদা দেখ আমাকে কী দুরবস্থার মধ্যে ফেলে চলে গেল। এখন কোত্থেকে আমি টাকা পাবো, লন্ডনে আমার কোনও ব্যাংক নেই যে আমি টাকা তুলবো। প্রত্যেকটা ক্রেডিট কার্ডের জন্য একটা নির্দিষ্ট টাকার অংক থাকে, যেটুকু তুমি তুলতে পারো। আশংকা আমাকে আঁকড়ে ধরে লন্ডনের ব্যাংক থেকে জার্মানির হামবুর্গেশহরের ব্যাংকের ফোন নম্বর যোগাড় করি, সেখানে ফোন করে ব্যাংকের লোকদের লন্ডনের ওই ব্যাংকে এক্ষুণি দশ হাজার ডয়েচে মার্কপাঠিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করি। সাধারণত এ ধরনের অনুরোধ মানে না ব্যাংক, কিন্তু জানি না কেন, মানলো। যে কেউ তো এমন উড়ো ফোন করে টাকা চাইতে পারে। কী করে জার্মানির ব্যাংক জানবে যে ফোনটা আমিই করেছি! কিছুরই তো প্রমাণ নেই। হাতে তো আমার অ্যাকাউন্টের তথ্যাদিও কিছুই ছিল না যে ওদের জানাবো। কণ্ঠস্বরও চেনা হওয়ার খুব কোনও কারণ ছিল না। সুহৃদকে টিকিট করে দিলাম কানাডা যাওয়ার নানা দেশের টাকা আমার ওয়ালেটে থাকে, ওসব ভাঙিয়েও কানাডার টাকা করে দিলাম। জার্মানির ডয়েচে মার্ককে পাউণ্ড করা, পাউণ্ডকে ডলার করা। এভাবেই আব্দার আহ্লাদ যার ছোটবেলা থেকেইপূরণ করে আসছি, পূরণ করি। সুহৃদকে কানাডার উড়োজাহাজে তুলে দিয়েতবে আমি ফিরলাম প্যারিসে। সুহৃদ শেষ অবদি পৌঁছেছিল নিউইয়র্কে, বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়েই। যে টাকা দিয়েছিলাম, তার অর্ধেকও তার দরকার পড়েনি। একদিন নাকি নিউইয়র্কের রাস্তায় কালো একদল গুণ্ডা তার বাকি টাকাগুলো কেড়ে নিয়েছে। এভাবেই আমার কষ্টের উপার্জন গেছে। বাবাকে কলকাতায় ডাক্তার দেখালাম। ওষুধপত্র যেভাবে খেতে বলেছে, সেভাবে বারবার অনুরোধ করলাম খেতে। চেয়েছিলাম বাবা আরও কটা দিন থাকুক। কিন্তু যে মানুষ ময়মনসিংহের বাড়ি আর চেম্বার ছেড়ে কোথাও যেতে চায় না, তাকে আর কতদিন রাখা যায়! শুধু তোমার অসুখের সময় বেরিয়েছিল। আমাকে দেখতে বেরোলো বটে, কলকাতায়, কিন্তু যেহেতু আমি আর দুদিন বাদে মরছি না, বাবার যাই যাইটা মাত্রা ছাড়া হয়ে উঠলো। জোর করে, ধমক দিয়ে, বুঝিয়ে, অনুরোধ করেও বাবাকে বেশিদিন রাখতে পারিনি। একটাই বিছানা ছিল বড় তাজের সুইটে। ওতে বাবা, সুহৃদ আর আমি একসঙ্গে ঘুমিয়েছি। অনেক রাত জেগে গল্প করেছি। বাবার বোনের ছেলে মোতালেব এসেছিলো। ওকে দিয়ে খাবারটাবার বাইরে থেকে আনিয়েছি। হোটেলের রেস্তোরাঁয় খেতে চাইনি, অকারণে অত্যধিক দাম, তাই। এখন আবার ভাবি, কেন আমি বাবাকে ভালো রেস্তোরাঁয় প্রতিদিন খাওয়াইনি। কেন বাবাকে যত সময় দিয়েছি তার চেয়েও বেশি দিইনি। নিখিল সরকারের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলাম বাবাকে। বাবা অনেকটা যেন স্বস্তি পেলেন কেউ আমাকে বাবার মতো স্নেহ করছে দেখে। যে মেয়ে দেশে ফিরতে পারছে না, সেই মেয়েকে যারা ভালোবাসছে, তার ভালো মন্দ যারা দেখছে, তাদের সঙ্গে কথা বলে বাবা বিনয়ে গলে পড়েছে। সুইডেন থেকে দেশে ফিরে যাওয়ার আগের দিন মাইকেলকে জড়িয়ে ধরে ‘টেইক কেয়ার মাই ডটার, প্লিজ মাইলে, টেক কেয়ার মাই ডটার’ বলে জোরে জোরে কাঁদছিলে তুমি। নিখিল সরকারকে জড়িয়ে ধরে না কাঁদলেও বাবার চোখে মুখে তোমার সেই আকুতিই ছিলো। বুদ্ধদেব গুহ আমার হোটেলে এসেছিলেন। তাঁকে দেখে, তাঁর গান শুনে বাবা বিষম মুগ্ধ। দেশ থেকে জাদুকর জুয়েল আইচ এসেছিলেন। তাঁর জাদু দেখেও বাবা ভীষণ খুশি। এমনকী কোনও এক কালে বাবার চণ্ডিপাশা ইস্কুলের ছাত্র ছিলো দাবি করে এক বয়স্ক লোক বাবার সঙ্গে দেখা করার নাম করে মূলত আমাকেই দেখতে আসতো, তাঁর সঙ্গেও বাবা ঘণ্টা দুঘণ্টা বসে কী কথা বলতো কে জানে। বাবা একসময় কী কথায় যেন বাড়িঘর জমিজমা ভাগ করার পরিকল্পনা করছে বললো। আমি বলেছিলাম সব চারভাগেসমান ভাবে ভাগকরতে। পরে অবশ্য বলেছিলাম, আমার কিছুই চাইনা, শুধু অবকাশটা চাই। আমার বড় হয়ে ওঠা, আমার কৈশোর, যৌবন যে বাড়িতে, যে আঙিনায় কেটেছে, দাবি করেছি সেই স্মৃতিটুকুই। বাবা শুধু রহস্যের হাসি হাসলো। বাবার এই হাসি আমার জন্ম থেকে চেনা। বাবার রহস্য চিরকালই আমার কাছে রহস্যই থেকে যেত। যেদিন বাবাকে কলকাতার দমদম বিমান বন্দরে নামিয়ে দিতে গেলাম, বুক ফেটে যাচ্ছিল। শুধু মনে হচ্ছিল, বাবার সঙ্গে এই বোধহয় আমার শেষ দেখা! আমার সেই মনে হওয়াটা ভুল ছিল না মা। বাবার সঙ্গে ওই-ই ছিল আমার শেষ দেখা।
