যাকে কেবল কাঁদলে মানায়
শোকের নদীতে যার নাক অবদি ডুবে থাকা মানায়
মা মানে যার নিজের কোনও জীবন থাকে না।
মা’দের নিজের কোনও জীবন থাকতে নেই!
মা ব্যথায় চেঁচাতে থাকলে বলি
ও কিছুনা, খামোকা আহ্লাদ!
মরে গেলে মাকে পুঁতে রাখে মাটির তলায়,
ভাবি যে বিষম এক কর্তব্য পালন হল
মা নেই।
আমাদের এতেও কিছু যায় আসে না।
.
সাধ
তোমাকে কখনও বেড়াতে নিইনি
যেখানে চাঁদের নাগাল পেতে পাহাড়ের কাঁখে চড়ে বসে থাকে একটি দুধু নদী, গায়ে-হলুদের দিনে একঝাঁকনক্ষত্রের চোখ ফাঁকি দিয়ে চুপ চুপ, টুপ করে জলে পড়ে নদীর সারা গায়ে চুমু খায় চাঁদ!
তোমাকে কি নিয়েছি
যেখানে সমুদ্র মন খারাপ করে বসে থাকে, আর তার জলতুতোপাখিগুলো অরণ্যের বিছানায় শুয়ে রাতভর কাঁদে। সমুদ্রের মন ভাল হলে নেমন্তন্ন করেপাখিদের, অঢেল খাবার আরপানীয়ের ছড়াছড়ি–পাখিরা বিষম খুশি, কিছু ফেলে, কিছু খায়। নাচে, গায়!
তোমাকে বড় নিতে ইচ্ছে করে
যেখানে বরফের চাঁইএর হাঁটুতে মাথা রেখে সুবোধ বালকেরমত ঘুমিয়ে আছে আগ্নেয়গিরি, আর দিগন্তের মাথায় ঠোকর খেয়ে কেঁদে কেটে চোখ লাল করে অভিমানে দৌড়ে বাড়ি ফেরে হাওয়ার কিশোরী, দেখে বরফের চোখেও জল জমে মায়ায়।
তোমাকে কত কোথাও নিতে ইচ্ছে।
যেখানে সাতরঙ জামা পরে প্রজাপতি চুমু খেতে যায় ঘাসফুলের ঠোঁটে, পাড়ার ন্যাংটো হরিণ তার জামা কেড়ে নিতে দৌড়ে আসে, দেখে প্রজাপতি লুকোয় রাধাচূড়া মাসির শাড়ির আঁচলে, ঘাসফুল ভেজা ঠোঁটে অপেক্ষা করে আরেকটি চুমুর।
তুমি নেই বলেই কি ইচ্ছেরা জড়ো হচ্ছে এমন ..
.
প্রায়শ্চিত্ত
একটি অসুখ চাইছি আমি, ঠিক সেই অসুখটি–
সেই বৃহদন্ত্রের অসুখ, হামাগুড়ি দিয়ে যকৃতে পৌঁছবে,
যকৃত থেকে হেঁটে হেঁটে হাড়ে, হাড় থেকে দৌড়ে ধরবে ফুসফুস
ফুসফুস পেরিয়ে রক্তনদী সাঁতরে মস্তিষ্ক।
ভুল কাটাছেঁড়া, ভুল ওষুধ, ভুল রক্তের চালান
অসুখের পেশিতে শক্তির যোগান দেবে, কুরুক্ষেত্রে বাড়তি সৈন্য, রণতরী।
সেরকম পড়ে থাকব বিষণ্ণ বিছানায় একা, যেরকম ছিলে তুমি
যেরকম আস্ত কঙ্কাল, যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া হাড়ের কঙ্কাল
মাংস খসে পড়ছে, রক্ত ঝরে যাচ্ছে
ধসে পড়ছে স্নায়ুর ঘরবারান্দা
ঠিক সেরকম হোক আমারও,
আমারও যেন চোখের তারা জন্মের মত অচল হয়
যেন তীব্র শ্বাসকষ্ট হয়, ফুসফুস
ফুলে ঢোল হয়ে থাকে জলে, নিশ্বাসের হাওয়া পেতে যেন কাতরাই,
যেন হাত পা ছুঁড়ি,
যেন না পাই।
যেন কারও স্পর্শ পেতে আকুল হই,
যেন কাতরাই, হাত বাড়াই,
যেন না পাই।
০৯. প্যারিস থেকে আবার কলকাতা
প্যারিস থেকে আবার কলকাতা চলে যাই। বইমেলায় যাবো। বাঁচতে যাই কলকাতায়। তোমাকে সম্ভবত আবার ভুলে থাকতে যাই। কিন্তু সত্যি কি ভোলা হয়! তুমি কখনও কলকাতায় আসোনি মা। তোমাকে দেশের কোথাও নিয়ে যাইনি, কলকাতায় নিয়ে আসার কথা কল্পনার মধ্যেও কখনও ছিলো না। দেশে যখন ছিলাম, বন্ধুদের নিয়ে কলকাতা বেড়াতে আসতাম। তুমি যখন ছোট ছিলে, তোমার বাবা কলকাতা থেকে তোমার জন্য লাল একটা জামা কিনে নিয়ে গিয়েছিল। কলকাতার কথা শুনেছো শুধু, কোনওদিন দেখনি কলকাতা কেমন দেখতে। আমি যখন দেশে ফিরে কলকাতার গল্প করতাম, তুমি নিঃশব্দে শুনতে। কোনওদিন বলোনি আমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে কলকাতা। বলার সাহস হয়তো পেতে না। তোমার স্বপ্নগুলো ঠিক কেমন ছিল মা? কখনও উড়তো কি? নাকি চিরকালই খাঁচায় বন্দি ছিল? তুমি যেমন ছিলে? এবার বাবাকে কলকাতায় আসতে বলি। আমি বললেই তো ঘটনা ঘটে যায় না। বাবাকে রাজি করানো মানে হিমালয় পর্বতকে নড়ানো। ময়মনসিংহ থেকে তাকে ঢাকায় আনা, ভিসা করা, টিকিট করা, বিমানে ওঠানো ছোটদাই করে এই কাজগুলো। বাবা আর সুহৃদ আসে কলকাতায় আমার সঙ্গে দেখা করতে। তবে বইমেলা শেষ হয়ে যাওয়ার পর, একেবারে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মাত্র কয়েক দিনের জন্য আসে। তখন কলকাতায় একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করা হচ্ছে। বাবাকে নিয়ে শহীদ মিনারে ফুল দিই। ঢাকার শহীদ মিনারে একুশে ফ্রেব্রুয়ারির ভোরে খালি পায়ে হেঁটে ফুল দিতাম, হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে। সেই শহীদ মিনারের তুলনায় কলকাতার মিনার কিছু নয়। লোকও নেই বেশি। তারপরও তো শহীদ মিনার। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা স্মরণ করছে বাংলা ভাষার জন্য পূর্ববঙ্গের বাঙালির আত্মত্যাগ এ বড় ভালো লাগা দেয়। বাংলার পূর্ব আর পশ্চিমকে আমি আলাদা করে দেখি না। দেখিনা বলেই আমি কলকাতায় এলে মনে করি দেশে ফিরেছি। যে দেশে এলে নিজের দেশের মানুষের সঙ্গে দেখা হতে পারে, সে দেশ দেশ নয়তো কী!
তাজ বেঙ্গল হোটেলেই আমার সঙ্গে কদিন থাকে বাবা আর সুহৃদ। সুহৃদ সেই যে তোমার অসুখের সময় দেশে গিয়েছিলো, দেশেই থেকে গেছে। ওকে দেশেরইস্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে সে চাইলেও আর ফিরতে পারছে না আমেরিকায়। আমেরিকায় ফেরারই কী দরকার, আমি বুঝি না। আমার শান্তিনগরের বাড়িতে থাকে। ওকে নিয়মিত টাকা পাঠাই বিদেশ থেকে। বই, কমপিউটার, কাপড়চোপড়, বইপত্র, খাওয়া দাওয়া যা দরকার সবকিছুর জন্য। তার নাকি দেশের পড়াশোনা ভালো লাগে না। আসলে সত্যি বলতে কী, আমেরিকার ইস্কুলের তুলনায় দেশের ইস্কুলেরপড়াশোনার চাপ বেশি, তাই ভালো না লাগায় ধরেছে। ছোটদা ছেলেকে খুব মানুষ করতে পারছে আমার মনে হয় না। সুহৃদ, লক্ষ করলাম, বন্ধুদের জন্য আনা যে হুইস্কি আনিয়েছিলাম, তার থেকে খানিকটা খেয়ে নিয়েছে। খেয়ে ধরা পড়ারপরও মিথ্যে বলছে যে খায়নি। বিশ্বাস হয় না এই ছেলেকে কী ভীষণ আদর দিয়েই না বড় করেছিলে! ছোটদাতার অগুণতি প্রেমিকা নিয়ে ব্যস্ত থাকলে ছেলের দেখাশোনা করবে কখন, বলো! মাস্টার রেখে দিয়েছে, সে মাস্টারের কাছেও নাকি যায় না। আমেরিকার ক্লাস এইটের ছেলের বিদ্যে বাংলাদেশের ইস্কুলে ক্লাস ফাইভের ছেলের মতো। প্রাইভেটে পরীক্ষা দেবে ব্রিটিশ ইস্কুলের নিয়মে, ও লেভেল। কিন্তু পড়াশোনা করার ছেলে কি ও? এই অতি-চাপ থেকে বাঁচতে ওর এক চিন্তা আমেরিকায় ফিরে যাবে কী করে। আমেরিকার গ্রিন কার্ডও তখন ওর হয়নি। বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে এবার আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। পড়াশোনা না করলেও টেনিস খেলাটা সে নিয়মিত খেলছে। টেনিসের দল নিয়ে এশিয়ায় কোন কোন দেশে নাকি খেলেও এসেছে। কলকাতায় আসার কয়েক মাস পর কয়েকজন টেনিস খেলোয়ারের সঙ্গে লন্ডন গেছে খেলতে, ওখান থেকেপরিকল্পনা কানাডাতে খেলতে যাবে, কানাডা থেকে আমেরিকায়। তখনও আমেরিকার ভিসাতার জোটেনি। ছোটদা লন্ডনে ফ্রি টিকিটে নিয়ে এলো সুহৃদকে। ওকে দিয়ে আমাকে ফোন করালোপ্যারিসে, চলে যাচ্ছে আমেরিকায়, দেখা কবে হয় কে জানে। আমি যেন এক্ষুণি চলে আসি লন্ডনে।
