পাওয়ার পর মনে পড়লো, লাল সুটকেসে ছিল ও জিনিস, আর সেই সুটকেস মিরিয়ামের বাড়িতে। ওকে ফোন করলাম, আমার সুটকেসটা চাই। মিরিয়াম বললো, কিসের সুটকেস? সেই যে আমার লাল সুটকেস, ঘরে জায়গা নেই বলে বা ঘর নিরাপদ নয় বলে যেটি তুমি নিয়ে গিয়েছিলে! মিরিয়াম বললে কোনও সুটকেস টুককেস তার কাছে নেই। সে কিছুই নেয়নি। আমি ভাবলাম, বোধহয় একটু মজা করছে আমার সঙ্গে। কিন্তু আবার বলাতে সে আবারও সাফ বলে দিল, কোনও সুটকেসই সে নেয়নি। তার কাছে আমার কিছু নেই। ফোন রেখে দিল। এভাবেই প্রতিশোধ সে নিল তার সঙ্গে প্রেম না করার। বড়লোক মানুষ এরা, অথচ দেখ কত নিচে নামতে পারে। ওর ভালোবাসা কি ভালোবাসা ছিল মা? আমি তো কাউকে একবার ভালোবাসলে, সেই ভালোবাসা উবে গেলেও এত নিষ্ঠুর হতে পারতাম না। আর ভালোবাসার দরকার কী, কোনও ঘোরশত্রুর সঙ্গেও কি এই অন্যায় করতে পারবো আমি! অসম্ভব। প্রতিশোধ নিতে গিয়ে লরোঁকে দেখেছি সে কী করেছে। লরোঁ বলতো আমাকে সে ভীষণ ভালবাসে। আমার বিশ্বাস হত না। কলকাতা থেকে ফিরে লরোঁকে বিদেয় করে দিই, কিন্তু তারপরও ঠিক বিদেয় করা হয় না। রাতদিন ফোন করে হু হু করে কাঁদতো, আমাকে ছাড়া নাকি বাঁচবেনা। ছুটি পেলেই ছুটে আসতো আমার কাছে। একবার তো আমাকে ওর বাবা মার বাড়ি আর বোনের বাড়িতে নিয়ে গেল। ওদের সঙ্গে আমাকে ওর প্রেমিকা হিসেবেই পরিচয় করালো। আমাকে ওরা নামে চিনতো, পেয়ে মহা খুশি। ওর বাবা মা আমাকে আর লরোঁকে এক ঘরে ঘুমোতে দিল রাতে। বাবামার বাড়িতে প্রেমিকা নিয়ে যাওয়া পশ্চিমের দেশগুলোতে খুব বড় ব্যাপার। সম্পর্ক অতীব গুরুত্বপূর্ণ না হলে এঘটনা ঘটে না। নিজের বউকে প্রথম দিনই আমাদের সম্পর্কের কথা জানিয়ে দিয়েছিলো। প্রয়োজনে ফোন করে লরোঁকেনা পেলে আমার বাড়িতেই ফোন করতে লরোঁর বউ। লরোঁ বউ বাচ্চা ছেড়ে আমার সঙ্গে বাকি জীবন থাকার স্বপ্ন দেখছিলো। বার বার আমাকে বলেছে আমি যেন প্যারিস ছেড়ে তুলুজ চলে গিয়ে ওর সঙ্গে জীবন যাপন শুরু করি। শহরে আলাদা একটা অ্যাপার্টমেন্টও সে ভাড়া নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু কখনও মন সায় দেয়নি আমার। ওর বাড়িতে গিয়ে ওর সঙ্গে বাস করার ইচ্ছে আমার হয়নি। খুব যেতে বলায় একবার দিন পাঁচেকের জন্য বেড়াতে গিয়েছিলাম। লরোঁকে আমি ভালোবাসতাম কিনা জানি না, তবে ওর সুন্দর শরীরটার দিকে তাকালে তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করতো। কলকাতার হোটেলে প্রথম ওকে আমি জীবন থেকে বিদেয় করার কথা ভাবি। দ্বিতীয়বার ভাবি লন্ডনের কমপিউটারের দোকানে। আমি একটা ল্যাপটপ দেখছি কেনার জন্য। আমি যেটাপছন্দকরছি, সেটা সে কিছুতেই আমাকে নিতে দেবে না। বলে, এত দাম দিয়ে এটা কিনো না। তোমাকে ঠকাচ্ছে এরা। কম দামে কমপিউটার কিনে সব হার্ডওয়্যার সফটওয়্যার লাগিয়ে নেবে। আমি বললাম, এটাই আমি কিনবো, এটাই আমারপছন্দ হয়েছে। শুনে সেফুসতে শুরু করলো। উপদেশনা শুনলে পুরুষদের আবারভীষণ রাগ হয়। রাগেফুসতে থাকে বুনো মোষের মতো, আর বলতেই থাকেআমি বোকার মতো কাজ করেছি। আমি ঠাণ্ডা গলায় বললাম, হ্যাঁ করেছি, আমারইচ্ছেহয়েছে করেছি। ডিনারেও যখন দেখলাম, তার আদেশ বা উপদেশ না মানার কারণে তার ফুঁসে থাকা বহাল রয়েছে, আমি শান্ত কণ্ঠে বললাম, এই সম্পর্কটা অনেক আগেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, মনে হয় শেষ হয়ে যাওয়াই উচিত। রাতে হোটেলে ফিরে এলে লরোঁ বারবার জিজ্ঞেস করতে লাগলো, তুমি কি সত্যিই শেষ করে দেবে সম্পর্ক? সত্যিই আমাকে ছেড়ে চলে যাবে? বলি, হ্যাঁ। অমনি সে নমি কি ত্য পা, নমি কি ত্য পা বলে কাঁদতে লাগলো, এরপর দেয়ালে মাথা ঠুকতে লাগলো। মাথা ফেটে রক্ত বেরোবে এবার ছেলের। দেয়াল থেকে আমি টেনে আনলাম লরোঁকে। সে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো, নমি কি ত্য পা, ছেড়োনা আমায়। এরপর আমাকে আদর করলো বেঘোরে। শরীর চায় ওকে, শরীরই বলে। কিন্তু মন চায় না। পরদিন লণ্ডন থেকেপ্যারিসে ফেরার পথে ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে ওর বোনের বাড়িতে আমরা রাত কাটাই। রাতেও একই প্রশ্ন, তুমি কি সত্যিই ছেড়ে যাবে আমাকে? বললাম, হ্যাঁ যাবো। যতবার প্রশ্ন করে, একই উত্তর পায়। একসময় লরোঁর ভেতরের বুনো মোষটি ধারালো শিং বাগিয়ে তাড়া করে আমাকে। আমাকে সে বেরিয়ে যেতে বলে বাড়ি থেকে। আমি যত বলি, সকালে বেরোবো, এখন নয়। সে বলে, এক্ষুনি। কাপড়ের ব্যাগটা নিয়ে সে আমাকে বাড়ির বাইরে বের করে দিয়ে আসে। রাত তখন দেড়টা বোধহয়। রাস্তার মাতাল বদমাশ একলা মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কী করবে লরোঁ একবারও ভাবেনা। না, ও সময় কোথায় ট্রেন, কোথায় বাস, কোথায় ট্যাক্সি জানি না। প্যারিস অনেক দূর, কোনও পথেই প্যারিসে যাওয়ার উপায় নেই। শেষে বেল টিপলাম বাড়ির। অন্তত লরোঁর বোন এভলিন ঘুম থেকে উঠে তার দাদার কাণ্ড দেখুক। কিন্তু বেল বাজার সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে দেয় লরোঁ। আমি বলি, আমাকে রাতটা এখানে থাকতেই হবে। সকালে বেরিয়ে যাবো। রাত কাটিয়ে সকালে একা বেরোতে নিলে লরো সঙ্গে যায়। পথে পাগলকে আমি আর ছেড়ে যাওয়ার কথা কিছু বলি না। শুধু স্তব্ধতার মধ্যে কাটে আমার দীর্ঘ সময়। আমার প্যারিসের অ্যাপার্টমেন্টে সেও ঢোকে। অপেক্ষা করি তার চলে যাওয়ার। লরোঁ বলে, আমাকে বিদেয় করার জন্য অস্থির হচ্ছো তাইনা! মনেমনে বলি, হচ্ছি। লরোঁ অস্থির পায়চারি করতে থাকে ঘরে, আর আমি ভয় পেতে থাকি। ভালোয় ভালোয় আপদ বিদেয় হলে বাঁচি। আবার যেন কোনও অঘটন না ঘটায়। তার সমস্ত রাগ গিয়ে আবার দেয়ালে পড়ে। প্রচণ্ড এক ঘুষি মেরে দেয়াল দাবিয়ে দেয়। আমি চোখ বুজে শুয়ে থাকি। একসময় বাথরুম থেকে অদ্ভুত শব্দ এলে গিয়ে দেখি লরোঁ বাথটাবের জলে শুয়ে আছে, হাতে তার ছুরি। সে হাতের শিরা কাটছে। আমি তড়িঘড়ি হাতে ব্যাণ্ডেজ করে লরোঁকে টেনে তুলে আনি জল থেকে। বিদেয় শেষ পর্যন্ত তাকে হতেই হবে। তাকে তুলুজ ফিরতে হবে। লরোঁ বেরিয়ে যাওয়ার পর দরজা বন্ধ করি। কী যে আমার স্বস্তি হয় মা, তোমাকে বোঝাতে পারবো না। মনে হয় দীর্ঘ সময় আমি এক বদ্ধ পাগলের সঙ্গে এক খাঁচায় বন্দি হয়ে ছিলাম। সবেমুক্তি পেলাম। মুক্তির আনন্দ অসীম। এরপর লরোঁ অনেক ফোন, ইমেইল, ইত্যাদিতে অনেক চেষ্টা করেছে যোগাযোগ করতে, আমি সাড়া দিইনি। যখন বুঝেছে কোনও আর উপায় নেই আমাকে পাওয়ার, তখনই সে চিঠি লিখতে শুরু করে। দেশে বিদেশে আমার যত বন্ধু আছে, যাদের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে, অথবা হয়নি, ক্রিশ্চান বেস থেকে শুরু করে কলকাতার ছোটখাটো সাংবাদিক সবাইকেই। তার মূল উদ্দেশ্য, আমাকে ধ্বংস করা। ধ্বংস করতে গেলে আমার যারা চেনাপরিচিত বন্ধু, যারা আমাকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে, স্নেহ করে, তাদের মনে আমার সম্পর্কে বিরূপ ধারণা দিতে হবে, আমার সম্পর্কে মন্দ কথা বলতে হবে, যেন বন্ধুরা আমাকে ত্যাগ করে। লরোঁর স্বপ্ন সার্থক হয়নি। কেউ আমাকে ত্যাগ করেনি। চিঠির খবরটা আমার বন্ধুরাই আমাকে দিয়েছে। আমি জানি, মিরিয়ামের চেয়েও লরো অনেক বেশি ভয়ংকর। প্রতিশোধপ্রবণতা, কুৎসিত ঈর্ষা, হিংসে, মানুষকে আর মানুষ রাখে না।
