প্রেম ও যৌনতা আমাকে প্রভূত আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু নিজের স্বাধীনতায় কেউ নাক গলাতে এলে যত বড় প্রেমিক হোক, যত নিখুঁত যৌনসঙ্গী হোক, আমার কোনও দ্বিধা হয় না তাকে গেট আউট বলতে। এই সম্পর্কটি শেষ হবার পর আবার তুমি, জীবন জুড়ে তোমার না থাকা। যৌনতা তোমাকে ভুলিয়ে রাখে। যৌনতার ছুটি হয়ে গেলে তোমার মৃত্যু আমাকে হতাশার অতলে টেনে নিয়ে যায়। যেখানে শুধু নেই, নেই আর নেই। আমি কাতরাতে থাকি তোমার শোকে। এদিকে আরশোলায় বাড়ি ভরে ওঠে। অবাধে আমার গায়ে রাতে হাঁটাহাঁটি করে। আমার শরীরও তাদের উৎসবের চমৎকার ঘরবাড়ি হয়ে ওঠে। পরিবারের সবার প্রতি আমার অভিমানে নিজেকে সবার কাছ থেকে সরিয়ে এনে অদ্ভুত এক আঁধারে ডুবে যেতে থাকি। কারও সাধ্য নেই আমাকে সেই আঁধার থেকে তোলে। অদৃশ্য মাটি এসে জীবন্ত আমাকে কবর দিয়ে যায়।
.
মৃত্যুময় নিস্তব্ধতার মধ্যে ভাসতে থাকি। খা খা করে বুকের ভেতর, বড় খালি খালি লাগে। কবিতা লিখতে থাকি। অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে কবিতাগুলো লিখি! বাড়ি এলোমেলো পড়ে থাকে। ওর মধ্যেই আমি শুয়ে থাকি। ওর মধ্যেই আমার সারাদিন, ওর মধ্যেই সারারাত। কারও কোনও ফোন ধরি না। কারও সঙ্গে কথা বলি না। জগৎ একদিকে, আর তোমার না থাকা নিয়ে আমি অন্যদিকে। রান্না করি না। বাইরে থেকে তৈরি খাবার কিনে কমপিউটারে লিখতে লিখতেই খাই, এঁটো বাসনপত্র টেবিলে বিছানায়, মেঝেয়, রান্নাঘরে এলোমেলো পড়ে থাকে। কাগজের ঠোঙায় ঘর ভরে যায়। আরশোলারা অবাধে আনন্দ করে। তুমি কিভাবতেপারো তোমাকে নিয়ে কবিতা লিখেছি আমি। যেখানেই থাকো, কবিতাগুলো পড়োমা। তোমার নিশ্চয়ই বিশ্বাস হচ্ছে না মা। কবে যেন হঠাৎ রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে দেখি এক মহিলা সামনে হাঁটছেন, ঠিক তুমি যেমন করে হাঁটতে, মুখের ডানদিকটা সামান্য এক ঝলক যেটুকু দেখা গেছে, মনে হল, ঠিক তোমার মুখের ডানদিকটার মতো। আমি জানি না কী কারণে দ্রুত হাঁটতে শুরু করলাম, যেন মহিলার কাছাকাছি পৌঁছোতে পারি। দ্রুত, প্রায় দৌড়ে, মহিলার সামনে গিয়ে মুখটা দেখতে চাইছিলাম। একসময় গতি শ্লথ হয়ে এলো আমার। হঠাৎ লক্ষ করি, চোখ উপচে জল বেরোচ্ছে আমার। হাতের তেলোয় সেই জল মুছে মুছে হেঁটেছি, তারপর যতটাই হেঁটেছি।
তোমাকে মনে করে আগে লিখিনি কোনওদিন কিছু। তোমাকে ভালোই তো বাসিনি কোনওদিন। তুমি না চলে গেলে তুমি কী ছিলে, কী যন্ত্রণা তুমি জীবনভর পেয়ে গেছে, তা আমি হয়তো টের পেতাম না। ওভাবেই তোমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে যেতাম। যেভাবে করছিলাম। তুমি কে ছিলে, মানুষ হিসেবে কত বড় ছিলে, হঠাৎ যেন টের পেলাম, হৃদয়ে, মস্তিষ্কে, টের পেলাম হাড়ে মজ্জায়। বোধাদয় হলো আমার। চোখের সামনে থেকে সরে গেছে ভারি একটা কালো পর্দা। এসব কবিতা নিয়ে জলপদ্য নামের যে বইটা বেরিয়েছিল, ওর ভূমিকায় লিখেছি, মা বলেছিলো বছরের প্রথম দিনে কাঁদিস না, কাঁদলে সারা বছর কাঁদতে হবে। মা নেই, সারা বছর আমি কাঁদলেই কার কী? মা, তোমার কেমন লাগছে জেনে যে তোমার জন্য দিনের পর দিন কেঁদেছি আমি! বিশ্বাস হচ্ছে না? মা, সত্যি অনেক কেঁদেছি। জীবন কেমন বীভৎস রকম শূন্য হয়ে গেলো হঠাৎ। তুমি ছিলে, মনে হতো চিরকালই তুমি থাকবে। তুমি তো কবিতা ভালোবাসতে খুব। এগুলোকে ঠিক কবিতা বলবো না। তোমার না থাকার দীর্ঘশ্বাস এসব, না থাকার হাহাকার।
০৮. তোমার না থাকা
তোমার না থাকা
তুমি কি কোথাও আছ
মেঘ বা রঙধনুর আড়ালে!
হুহু বাতাসের পিঠে ভর করে মাঝে মধ্যে আসো, আমাকে ছুঁয়ে যাও!
তুমি কি দেখছ চা জুড়িয়ে জল হচ্ছে আমার
আর আমি তাকিয়ে আছি সামনে যে বাড়ি ঘর, মানুষ, যন্ত্রযান
দুপুরের আগুনে রাস্তা, ঝরে পড়া শুকনোপাতা, মরা ডাল
বুড়ো কুকুরের লালা ঝরা লাল জিভের দিকে
আর তোমার না থাকার দিকে!
তুমি কি খুব গোপনে দেখছ তাকিয়ে থাকতে থাকতে
চোখ কেমন জ্বালা করছে আমার–
তুমি কি কোনও বৃক্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে আছ কোথাও,
কোনও পাখি বা প্রজাপতি!
কোনও নুড়ি কোনও অচিন দেশে!
মানুষগুলো খাচ্ছে পান করছে হাঁটছে হাসছে
দৌড়োচ্ছে, জিরোচ্ছে, ভালবাসছে
তোমার না থাকা মাঝখানে বসে আছে, একা।
.
একটি মৃত্যু, কয়েকটি জীবন
একটি মৃত্যুকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল কয়েকটি জীবন।
কয়েক মুহূর্ত পর জীবনগুলো চলে গেল
যার যার জীবনের দিকে।
মৃত্যুপড়ে রইল একা, অন্ধকারে
কেঁচো আর কাদায়–
জীবন ওদিকে হিসেব পত্তরে,
বাড়িঘরে,
সংসারে, সঙ্গমে।
.
আমার মায়ের গল্প
১.
চোখ হলুদ হচ্ছিল মা’র,
শেষে এমন, যেন আস্ত দুটো ডিমের কুসুম!
পেট এমন তেড়ে ফুলছিল, যেন জেঁকে বসা বিশাল পাথর
নাকি এক পুকুর জল–বুঝি ফেটে বেরোবে!
মা দাঁড়াতে পারছে না,
না বসতে,
না নাড়তে হাতের আঙুল,
না কিছু।
মা’কে মা বলে চেনা যাচ্ছিল না, শেষে এমন।
আত্মীয়রা সকাল সন্ধে শুনিয়ে যাচ্ছে
ভাল একটি শুক্রবার দেখে যেন তৈরি মা..
যেন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলতে বলতে
যেন মুনকার নকির সওয়াল জবাবের জন্য এলে বিমুখ না হয়
যেন পাক পবিত্র থাকে ঘর দুয়োর, হাতের কাছে থাকে সুরমা আর আতর।
হামুখো অসুখ মা’র শরীরে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে সেদিন,
গিলে ফেলছে দুফোঁটা যে শক্তি ছিল শেষের, সেটুকুও।
কোটর থেকে ছিটকে বেরোচ্ছে চোখ,
চড়চড় করছে জিভ শুকিয়ে,
ফুসফুসে বাতাস কমে আসছে মা’র,
শ্বাস নেবার জন্য কী অসম্ভব কাতরাচ্ছে–
যন্ত্রণায় কুঁচকে আছে কপাল, কালো ভুরু
গোটা বাড়ি তখন চেঁচিয়ে মাকে বলছে তাদের সালাম পৌঁছে দিতে নবীজিকে,
কারও কোনও সংশয় নেই যে মা জান্নাতুল ফিরদাউসে যাচ্ছে,
নবীজির হাত ধরে বিকেলে বাগানে হাঁটবে,
পাখির মাংস আর আঙুরের রস খাবে দুজন বসে,
অমনই তো স্বপ্ন ছিল, মা’র অমনই স্বপ্ন ছিল।
আশ্চর্য, মা তবু কোথাও এক পা যেতে চাইছিলো না।
চাইছিলো বিরুই চালের ভাত বেঁধে খাওয়াতে আমাকে,
টাকি মাছের ভর্তা আর ইলিশ ভাজা। নতুন ওঠা জাম-আলুর ঝোল।
একখানা কচি ডাব পেড়ে দিতে চাইছিলো দক্ষিণের গাছ থেকে,
চাইছিলো হাতপাখায় বাতাস করতে চুল সরিয়ে দিতে দিতে–
কপালের কটি এলো চুল।
নতুন চাঁদর বিছিয়ে দিতে চাইছিলো বিছানায়,
আর জামা বানিয়ে দিতে, ফুল তোলা..
