বইটি তোমার কারণেই লেখা হয়েছিল, মা। ছোটবেলার কত ঘটনা তুমি আমাকে বলেছো। অপ্রিয় কত সত্য কথাই তো তুমি বলেছো। তুমি যেরকম লুকোওনি, আমিও লুকোইনি। বই লিখছি জেনেও তো তুমি তোমার মেয়েবেলার সব দুঃখ সুখের কথা বলেছো, তোমার যৌবনের, তোমার সংসার জীবনের সব। তুমি না বললে আমি লিখতে পারতাম না আমার মেয়েবেলা, তুমিই শুরু করে দিয়ে গেলে আমার আত্মজীবনী লেখা। নির্বাসনের কারণে আমার লেখালেখি যেমন বন্ধ ছিল, তেমন বন্ধই থাকত। তুমি এলে, তোমার উপস্থিতিতে আমার আমিকে আমি নতুন করে যেন আবিষ্কার করলাম। তুমি আমাকে দেখতে না এলে আমার অতীতের দিকে আমি তাকাতাম না, বই লেখার কথা আমার ভাবনার মধ্যে আসতো না। তুমি যখন এসেছিলে, তুমি তোমার আঁচলে করে শিউলি ফুলের মতো আমার শৈশব কৈশোর নিয়ে এসেছিলে। তোমার গা থেকে শিউলির সেই ঘ্রাণই ভেসে আসতো। এখনও চোখ বুজে তোমাকে ভাবলে সেই ঘ্রাণ পাই আমি। বড় চেনা ঘ্রাণ। বড় হারিয়ে যাওয়া, আবার না যাওয়াও।
আমার মেয়েবেলা বইটা বাবাকে উৎসর্গ করেছিলাম, তোমার সম্পর্কে কম কুকথা ছিল ও বইটায়! তখনও তো তুমি ছিলে, বেঁচে ছিলে। দ্বিতীয় আর তৃতীয় খণ্ড উতল হাওয়া আর দ্বিখণ্ডিত বইদুটোতে তোমার দিকে অন্য চোখে তাকালাম। সত্যি বলতে কী, তাকালাম তোমার দিকে। এতকাল তো তাকাইনি। তোমাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করেছি, মজা করেছি। তাকাইনি। আমার মেয়েবেলা যখন বাংলায় বের হলো, অনুতাপ আমাকে এমনই কাঁদাচ্ছিলো যে তোমাকেই বইটা উৎসর্গ করলাম। বইয়ের ফরাসি সংস্করণটি কিন্তু বাবাকে উৎসর্গ করা। কী নামে ডাকবে তুমি এই অস্থিরতাকে? আচমকা যেন আমার চেতনার কবাট খুলে গেছে। আচমকা যেন আমি নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে প্রথম নিজের আসল চেহারাটি দেখছি। নিজের ওপর কি কম ঘেন্না আমার হয়েছে! কিছুতেই নিজের গ্লানিকে একবিন্দুআমি মুছতে পারি না। আমার ভেঙে যাওয়া, সব ছেড়ে ছুঁড়ে আমার সন্ন্যাস বরণ দেখে বন্ধুরা বলেছিলো, গ্লানি থেকে মুক্ত হও, গ্লানি মানুষকে ধ্বংস করে ফেলে। ফেলুক, তাই তো চাইছিলাম। আমি তখন মরে গেলেও আমার কিছু যেতো আসতো না।
.
কলকাতা থেকে ভিসা ফুরোলে চলে যেতে হল প্যারিসে। প্যারিসে আমার কাজ কী বলো। শুধু বসে থাকাই তো। এইপ্যারিসেই আমাকেরানির মতো রেখেছিলো, আমার গাড়ির সামনে পেছনে প্যাঁপু বাজিয়ে গাড়ি যেতো। প্যারিসের অর্ধেক রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হত আমি রাস্তায় চলবো বলে। আর সেই একই আমিপ্যারিসের রাস্তায় হেঁটে বেড়াই, যে কোনও মানুষের মতো, বাদামি রঙের মেয়ে, এশিয়ার, ভারতীয় উপমহাদেশের, গরিব দেশের বাদামি মেয়ে, কেউ ফিরে তাকায় না। অথচ এই আমাকে দেখার জন্য এই শহরেই একসময় মানুষ উপচে পড়তো, বইয়ে সই নেওয়ার জন্য ভিড় বাড়তো। নিরাপত্তা পুলিশের বাধায় কত কত মানুষ আমাকে এক পলক। দেখারও সুযোগ পায়নি। যখন মনে পড়ে ওসব কথা, মা, হাসি পায়। ওই উত্থানটা সত্যি ছিল, না এই পতনটা সত্যি! আমার এসবকে উত্থান বা পতন বলে মনে হয় না। যেখানে ছিলাম আমি, সেখানেই আছি। আমি খুব সাধারণ মানুষ, তোমার মতোই সাধারণ, নিরীহ। মাঝে মাঝে আমাকে অসাধারণ বলে প্রদর্শন করা হয়, আমার জীবনের এই সংগ্রামের জন্য, আমার লেখার কারণে, আমার আদর্শের কারণে। যে মানুষটি আমি রাস্তায় একা হাঁটি, বাসে বা মেট্রোয় চড়ি, বা ট্যাক্সিতে, তাকে মানুষ চেনে না বলে ঘিরে ধরে না। যদি জানতো আমি কে, ছুটে আসতো। এই যে দেখলে চেনে না, তা আমার জন্য একরকম ভালো। আমি নিজের মতো করে জীবন যাপন করতে পারি। ওই অসাধারণ জীবন, ওই খ্যাতি আমাকে অস্বস্তি দেয়। ভীষণ চাপ ওই জীবনে। দেবীর ভূমিকায় বেশিক্ষণ তিষ্ঠোনো যায় না। ওই জীবনটা ক্ষণস্থায়ী, এই জীবনটাই আসল। প্যারিসে আমি একটা ভীষণ ভুল করি। ক্রিশ্চান বেস আমাকে ভালোবাসছেন, বলেছেন তিনি আমার মায়ের মতো। অমনি আমি তোমার গলার হারটি দিয়ে দিই ওকে। মা, মা কি সবাই হতে পারে, নাকি হয়? যেই না আদর দেখায়, খুব, আমার পা ভেঙেছে বলে আমার অ্যাপার্টমেন্টে এসে ঘর দোর পরিষ্কার করতে শুরু করে, তখনই খুব আপন ভাবতে শুরু করেছিলাম। কত মানুষকে যে আমি আপন ভাবি। পরে অবশ্য বোধোদয় হয়। তবে আমার বোধোদয় হতে সবসময়ই খুব দেরি হয়।
প্যারিস শহরে থাকতে থাকতেই আমি বুঝতে পারি, বেশির ভাগ মানুষ যাদের আমি বন্ধু বলছি, তারা আসলে আমার বন্ধু নয়। খুব সহজে কয়েকদিনের পরিচয়ের পর আমরা স্বচ্ছন্দে সবাইকে বন্ধু বলে ডাকি। আমার খ্যাতি, অর্থ আর উদারতা–এ তিনটেকে ভাঙিয়ে তাদের নিজেদের সুবিধে স্বার্থের জন্য যা কিছু পারে, দুহাত ভরে নেবে। এ ছাড়া আর কোনও উদ্দেশ্য নেই। মানুষের কৃত্রিমতাকে, বেশ কয়েক বছর, ধরে নাও, যে, আমি বুঝবো না। যে যত বড় অভিনেতা হবে, কৃত্রিমতা দিয়েই বছর পার করবে। অভিনয়ে কাঁচা হলে হয়তো কয়েক মাসেই ধরতেপারবো। মুলাঁ দন্দের মিরিয়াম অভিনয়ে খুব পাকা ছিল। যেই না দেখলো, আমাকে সে ভালোবাসছে আর আমি তার ভালোবাসায় সাড়া দিচ্ছি না, প্রতিশোধ নিল। কানাডার সেই লেখক পিয়ের লরুর সঙ্গে মুলাঁ দন্দে ছেড়ে চলে আসার পরও আমার যোগাযোগ আছে, এমিরিয়ামের সহ্য হয়নি। একদিন পিয়েরকে আমি নিয়ে গিয়েছিলাম রেস্তোরাঁয়। পিয়ের আমার কাছে দুহাজার ফ্রাঁ ধার চেয়েছে, এসব আমি নিজেই মিরিয়ামকে জানিয়েছিলাম। শুনে সে সোজা ক্রিশ্চান বেসের শরণাপন্ন হল, পিয়ের ভালো লোক নয়, পিয়ের আমাকে বোকা পেয়ে ধোঁকা দিচ্ছে। ক্রিশ্চান বেস মনে করেন আমি কোনও অঘটন ঘটিয়ে ফেলবো, বুদ্ধিমান কিছু লোকের সাহায্য ছাড়া আমি চলতে পারবো না। তিনি হামলে পড়লেন, না এসব চলবে না। কিছুতেই পিয়েরকে টাকা ধার দেবে না, ওর সঙ্গে আজই এখনই সম্পর্ক ছেদ করো। ওকে তোমার ধারে কাছে আসতে দেবে না। ঠিকমিরিয়াম যা চেয়েছিল, যেভাবে, ঠিক সেভাবেই সে ঘটনাটা ঘটালো। ক্রিশ্চানের অনুমতি নিয়ে পিয়েরকে সে আমার হয়ে গুডবাই জানিয়ে দিল। তখন পিয়ের আর আমি দুজনের কেউইমুলাঁ দন্দে নেই, দুজনইপ্যারিসে। পিয়েরের টাকার অভাব ছিল, চাইতেই পারে সে টাকা, আমি দিতেই পারি তাকে। মিরিয়ামের কেন এত জ্বালা। আমাকে সে খুব ভালোবাসে? আমার টাকা পয়সা সে খুব বাঁচাতে চায়? আসলে ওসব কাণ্ড করার মূল উদ্দেশ্য পিয়ের নামের হবু প্রেমিককে আমার ত্রিসীমানা থেকে বিদেয় করা। আমার ভাঙা পা দেখতে পিযের আসতো মাঝে মাঝে। দাবা নিয়ে আসতো, খেলতো আমার সঙ্গে। ক্রাচ নিয়ে এসেছিলো। প্যারিসের একলা ঘরে শুয়ে থাকা আমাকে সে সঙ্গ দিত। একদিন ওয়াইন নিয়ে এলো। ফ্রান্সের ক্লোদ লোলুর মতো চিত্রপরিচালক পিয়েরের গল্প নিয়ে ছবি করেছে। আমরা দুজনে সিনেমার গল্প লেখার পরিকল্পনা করি। খেতে খেতে গল্প। অমন আশ্চর্য সুন্দরের দিকে তাকিয়ে আমার মন জুড়োত। সেই পিয়েরকে কায়দা করে মিরিয়াম তাড়ালো। কারণ মিরিয়াম আমাকে চায়। আমি অবাক হয়ে দেখেছি এরা ভালোবাসতে যেমন পারে, প্রতিশোধ নিতেও পারে। ভালোবাসা এদের উদার করে না, হিংস্র করে তোলে। পিয়েরের সঙ্গে যখন মুলাঁ দন্দে থেকে যে রাতে চাঁদের আলোয় হাঁটতে গিয়েছিলাম, মিরিয়াম সারারাত কেঁদেছে আর মদ খেয়েছে। তার সহ্য হয়নি পিয়েরের প্রতি আমার আকর্ষণ। সে রাতেই চুরি হয়ে যায় আমার ঘরে রাখা কয়েক হাজার ডলার। আমার ঘরের একটা চাবি মিরিয়ামের কাছে থাকতো। মিরিয়াম ওই বিশাল মুলাঁ দন্দের পরিচালনার দায়িত্বে ছিল বলে অবাধ অধিকার ছিল সব কিছুতে। কে নিয়েছের প্রশ্ন উঠলে মিরিয়াম বলে হয়তো ঘর পরিষ্কার করতে আসা মেয়েরা। ওই মেয়েরা তিন মাসে কোনওদিন আমার ওই বাক্সে হাত দেয়নি, যে বাক্সে ডলার আর তোমার সোনার গয়নাগুলো ছিলো। মিরিয়ামকে আমার –কখনও সন্দেহ হয়নি। কিন্তু পরে একটি ঘটনা ঘটায় আমি বুঝি কে আসলে ছোটলোকি ওই প্রতিশোধটা নিয়েছে। মিরিয়ামের ঈর্ষা যেমন ভয়ংকর, প্রেমও ভয়ংকর। ব্রাজিলের সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হল বক্তৃতা দিতে। আমি রাজি হয়েছিলাম যেতে। ওরা টিকিটও পাঠিয়ে দিয়েছিল। মিরিয়াম বললো, সেও যাবে আমার সঙ্গে। মুলাঁ দন্দের কাজ ফেলে সে নিজের টিকিট করে ফেললো। তারপরআমারপামচকালো, আমি শুয়ে আছি। ব্রাজিলকে জানিয়ে দিলাম, যেতে পারছি না। মিরিয়াম একাই চলে গেল ব্রাজিল। একাই সে হোটেলে বসে বসে আমার কথা ভাবলো আর কাঁদলো। ফিরেই সে সোজা আমার কাছে। আমার সেবা করবে, আমাকে ভালোবাসবে। মুলায় তার মন বসে না। ওখানে গেলেও সে প্রতিরাতে চলে আসে প্যারিসে আমার বাড়িতে, ভোরে ঘুম থেকে উঠে চলে যায়। মুলাঁ থেকে গাড়ি চালিয়ে প্যারিস আসতে তিন ঘণ্টা সময় নেয়। এতার কাছে কিছুই নয়। আমার জন্য যত তার আবেগ, আমার তার জন্য কিছুই নেই। মাঝে মাঝে আমার নির্লিপ্তি দেখে সে ফুঁসে ওঠে। চেঁচায়। কাঁদে। আমার কী করার আছে বলো। মিরিয়ামের শরীরের প্রতি, সে শরীর যতই সুন্দর হোক, আমার কোনও আকর্ষণ জন্মায় না। আমার প্রেম পেতে মিরিয়াম মরিয়া হয়ে ওঠে। নিজেকে সে সমকামী বলে না। এর আগে যাদের সঙ্গে সে প্রেম করেছে, সকলেই পুরুষ ছিল। এই প্রথম সে নাকি এক মেয়ের প্রেমে পড়লো। হয়তো তাই। কিন্তু ও একা প্রেমে পড়লে তো হবেনা, আমাকেও পড়তে হবে। এক গভীর রাতে মুলাঁ দন্দের ঘরে আমার বিছানায় আচমকা এসে আমার শরীরের প্রতিটি রোমকূপে উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলছিলো। সেনা হয় অন্যরকম এক রাত দিয়েছিল আমাকে। কিন্তু প্রতি রাতে তার দাবি করলে চলবে কেন! আমার শরীর বা হৃদয় কোনওটাই আমি তাকে দিতে পারি না। বন্ধুত্বই শুধু পারি দিতে, কিন্তু শুধু বন্ধুত্বে তার চলে না। দিন দিন উন্মাদ হয়ে ওঠে মিরিয়াম। আমি তখন ঘর সাজাচ্ছি প্যারিসে, সে চলে আসতো নিজের কাজ ফেলে। আমাকে নিয়ে গাড়ি করে সেই ইকিয়ায় যাওয়া, আমার খাট চাই, সোফা চাই, বইয়ের আলমারি চাই, টেবিল চাই, চেয়ার চাই, খাবার টেবিল চাই, চেস্ট অব ড্রয়ার চাই, থালা বাসন চাই। আমি যে মিরিয়ামকে ডাকিতানয়। নিজেই সে গাড়ি করে আমাকে দোকানে নিয়ে যায়। নিজেই আসবাব পত্র টেনে ঘরে ওঠায়, জোড়া লাগিয়ে দেয়। এত সব তার করার কথা নয়, কিন্তু করে। মুলার কাজ ফাঁকি দিয়ে সে করে এসব। ঘরে জায়গা হয় না বলে, তার ওপর এত বিদেশ ভ্রমণ করতে হয় আমার, ঘরে দামি জিনিসপত্তর রাখা নিরাপদ নয় বলে লাল সুটকেসে সব ভরে মিরিয়াম নিজেই বলে সুটকেসটা তার বাড়িতেই রেখে দেবে সে। নিয়েও যায়। এই মিরিয়ামকে একদিন আমার দূরে সরাতে হল, তাকে বলে দিলাম আমার পক্ষে সম্ভব নয় তার সঙ্গে প্রেম করা, বা শরীর মেলানো। বহুঁকাল অভুক্ত থাকলে মেয়েদের স্পর্শে হয়ত জেগে উঠতে পারি। তার মানে এই নয় যে আমি সমকামী। মিরিয়াম ক্ষুব্ধ হতে লাগলো। আমার জন্য তার ক্রন্দন সীমা ছাড়াতে লাগলো। বিদেয় তাকে শেষপর্যন্ত হতেইহল। ফরাসি প্রেমিকের সঙ্গে প্রথম রাত কাটানোর দিন মিরিয়াম এসেছিলো আমার কাছে। তাকে আমি ঘরে ঢুকতে দিইনি। অনেকক্ষণ দরজায় বেল বাজিয়ে সেচলে যায়। চলে সেসম্পূর্ণ যায়নি। সারারাত সে রাস্তায় তার গাড়িতে বসেছিলো। এমনভাবে বসেছিলো, যেন গাড়ির জানালা দিয়ে সে ঘরের জানালা দেখতেপায়। আর বারবারই আমাকে ফোন করে অভিযোগ করছিল, চিৎকার করছিল, কাঁদছিলো। আমি বারবারই তাকে চলে যেতে বলি। বলি যে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে সময় কাটাচ্ছি আমি, আজ তার সঙ্গে দেখা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আসলে আমি চাইনি যে সুদর্শন যুবকের সঙ্গে আমার আশ্চর্য সুন্দর একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তাকেও মিরিয়াম তাড়াক, যেভাবে পিয়েরকে তাড়িয়েছিল। এরপর কয়েক মাস গেলে, একদিন সুটকেসে রাখা কোনও জিনিস খুঁজতে গিয়ে পাতিপাতি করে খুঁজে
