.
তুমি আর জাগলে না, চোখ খুললে না, কথা বললে না সম্ভবত জানুয়ারির এগারো তারিখে। জানি না এই তারিখটা কেন আমার মনে আছে। আমি মনে রাখতে চাই না, তারপরও মন থেকে তারিখটা কেন উবে যায় না! কত কিছুই তো মনে রাখতে পারি না, এই তারিখটা কেন মনে রাখি, জানি না। না, বছর বছর এগারো জানুয়ারি এলে আমি কিছুই করি না, হয়তো তারিখটি এসে চলে গেলে মনে পড়ে তারিখটি এসেছিলো। তিনশ পঁয়ষট্টি দিনের মধ্যে একটি দিন ওই দিনটি। ওই দিনটিতে আলাদা করে তোমাকে মনে করার, দুঃখ পাওয়ার আমি কোনও কারণ দেখি না। তিনশ পঁয়ষট্টি দিনই আমি তোমাকে মনে রাখতে চাই। বছরে তিনশ পঁয়ষট্টি দিনই আমি তোমাকে ভালোবাসতে চাই, তোমার মতো হাজারো মাকে চাই, মানুষকে চাই। তিনশ পঁয়ষট্টি দিনই নির্যাতিত সব মেয়েদের জন্য দু ফোঁটা চোখের জল ফেলতে চাই। তাদের জন্য মুষ্টিবদ্ধ করতে চাই হাত অথবা তাদের দিকে বাড়িয়ে দিতে চাই নিজের দুহাত। যদি আলাদা করে কোনও দিন তারিখের কথা আমাকে মনে রাখতেই হয়, আমি শুধুমনে রাখতে চাই তোমার জন্মের তারিখ। কোনও সাল তারিখ জানা ছিল না জন্মের। শুধু জানতে কোনও এক ঈদে তুমি জন্মেছিলে। তাই তোমার নাম রাখা হয়েছিল ঈদুল। নানা, নানি বড়মামা আর বাবা তোমাকে ঈদুন বলে ডাকতো। ল কেন যেন হয়ে গিয়েছিল ডাকার বেলায়!
তোমাকে হারিয়ে আমি নিজেকে হারালাম, মা। আমার কাছে পৃথিবীটাকে আর মূল্যবান কিছু মনে হল না। জগৎ তার সৌন্দর্য, তার হৃদয় সব নিমেষে হারিয়ে ফেললো। পড়ে রইলো নোংরা নর্দমার মত, পুঁজ আর পচা রক্তের মতো প্রাণহীন, দুর্গন্ধ, কুৎসিত। এই জগতে আমি একা বসে করবোটা কী, বলো তো! অপরাধবোধ আমাকে দিনে সাত টুকরো করে, রাতে সাত টুকরো করে। আমিটুকরোহই, রক্তাক্ত হই, তারপরও দেখি বেঁচে আছি। এই বেঁচে থাকা আমিটার জন্য আমার কোনও ভালোবাসা জন্ম নেয় না। ঘৃণা জন্ম নেয়। নিজের জন্য এই ঘৃণাটা আমি পুষে রাখি নিজের ভেতর। ঘৃণাটা আগুনের মতো, একবার হাওয়া লাগলে নিজেকে পুড়িয়ে ফেলে। আমি পুড়তে থাকি। প্রতিদিন। প্রতিরাত। এরকম ভাবেই আমি বেঁচে থাকি, যেখানেই থাকি।
.
বইমেলায় ঝড় বৃষ্টির রাতেও রীতিমত লাইনে দাঁড়িয়ে ‘আমার মেয়েবেলা’ বইটা কিনেছে পাঠক। তুমি সুইডেনে আসার পর যে বইটা দিনভর, রাতভর আমি লিখতে শুরু করেছিলাম, সেই বই। যে বইটা লিখছি বলে তোমাকে সময় দেওয়ার সময় হয়নি আমার, সেই বই। তোমার সাহায্য না পেলে যে বইটা আমার লেখা হতো না, সেই বইয়ের জন্য আমি পেলাম আনন্দপুরস্কার। এই বইএর কিছু তথ্যপড়েও খুব দুঃখ করেছিলে। কিন্তু তোমার দুঃখ তো তোমার দুঃখ। ও আমার দুঃখ নয়। তাই কোনও তথ্য আমি বদলে দিইনি। তুমিও সুইডেন ছাড়লে, আমার লেখাও শেষ হলো। পাণ্ডুলিপি পড়ে ফ্রান্সের প্রকাশক ক্রিশ্চান বেস এত বেশি আপ্লুত যে অনুবাদ হয়ে যাওয়ার পর, অল্প কিছু জিনিস সংশোধন করার জন্য নিউইয়র্কে আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন অনুবাদক ফিলিপ বেনোয়াকে। কিছু শব্দ, আর বাক্য বিশেষ করে আরবি ফারসি যে শব্দগুলো ব্যবহার করেছি, তাদের অর্থ জেনে নিয়ে সে শহর বেড়াতে বেরিয়ে পড়তো। সেই ফিলিপ বেনোয়া প্যারিসে ফিরে যাওয়ার পরপরই বই বেরোলো এডিশনস স্টক থেকে। ‘আমার মেয়েবেলা’ প্রথম বেরিয়েছে ফরাসি ভাষায়। বাংলায় বেরোলো অনেক পরে। মূল ভাষার পাণ্ডুলিপি যথারীতি আনন্দ পাবলিশার্সকে দেওয়া হয়েছিলো। যেহেতু আনন্দই আমার বই ছাপায়। কিন্তু পাণ্ডুলিপি পড়ে আনন্দ সিদ্ধান্ত নিল যে এ বই তাদের পক্ষে ছাপানো অসম্ভব। শুনেছি, দেশ, সানন্দাইত্যাদি পত্রিকা বাংলাদেশে যাচ্ছে, এখন আমার বই প্রকাশ করে বাংলাদেশ সরকারকে ক্ষেপিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে আনন্দ পাবলিশার্সের নেই। কেউ চাইছেনা, দেশ আর সানন্দা বাংলাদেশে আমার কারণে নিষিদ্ধ হয়ে যাক। আর, ইসলাম নিয়ে যেসব কথা বইতে আছে, তাতে বাংলাদেশ সরকার আপত্তি করতেই পারে। যদি আনন্দ বই ছাপায়, তবে কিছুকিছু অংশ বিশেষ করে ধর্ম নিয়ে মন্তব্য বাদ দিতে হবে। আনন্দ এর আগে এমন আবদার করেনি, অবাক হই, কিন্তু কোনও কিছু বাদ দিতে আমি রাজি হই না। না রাজি হলে আনন্দ ছাপাবে না বই। ওরা এর আগে আমার কোনও বই ছাপাতে আপত্তি করেনি। এবার করেছে, এর পেছনে আরও এক কারণ আমি শুনেছি, ওরা ঢাকায় আনন্দ পাবলিশার্সের একটা শাখা খুলবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এ নিয়ে কথাও হয়ে গেছে। ইসলাম সম্পর্কে সমালোচনা আছে আমার এমন কোনও বই যদি এখন ছাপায়, তাহলে ঢাকায় ওদের নতুন শাখার ওপর মৌলবাদী আক্রমণ হওয়ার আশংকা আছে।
নিখিল সরকার তখন চেষ্টা করলেন অন্য প্রকাশককে বই দিতে। স্ত্রী নামের একটি প্রকাশনী সংস্থা এগিয়ে এলো। লেখক অমিতাভ ঘোষের সঙ্গেও নিখিল সরকারের এ নিয়ে কথা হয়। তিনিই চেয়েছিলেন স্ত্রীকে দেওয়া হোকপাণ্ডুলিপি। কিন্তু নিখিল সরকার শেষ পর্যন্ত দিলেন না, বললেন স্ত্রীও পারবেনা বাদ না দিয়ে বই প্রকাশ করতে। তাঁর বন্ধুদের মাধ্যমেই পিবিএস নামের ছোটখাটো একটি প্রকাশনীর খোঁজপাওয়া গেল। ওই প্রকাশনীকেই নিখিল সরকার দিয়ে দিলেন বই। পিবিএস নিজেদের আদর্শের বাইরের কোনও বই ছাপায় না। আমার বই পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তবে পিবিএস এর কর্তারা এক মত হয়েছেন যে এই বই তাঁদের আদর্শের পরিপন্থী নয়। পিবিএস ছোট প্রকাশক। আনন্দের মতো বড় প্রকাশকবই ছাপাতে নারাজ শুনে অন্য বড় প্রকাশকও ভয়ে পিছিয়ে গেছে। পিবিএসএর ভয় ডর কমই। ছোট বলে নয়। আদর্শের কারণে। সমাজতন্ত্র, সমতা, সততা, সমানাধিকার, এসআমারও যেমন বিষয়, তাদেরও। আজকাল তো আর সব থাক, এই আদর্শটাই নেই মানুষের। মানুষ ক্রমে ক্রমে বিচাত হচ্ছে মানবতাবোধ থেকে। নিখিল সরকার বই থেকে বেশ কিছু শব্দ বাক্য কেটে বাদ দিয়েছেন। তাঁর আশংকা, ওগুলো পড়ে মুসলমানরা আমাকে মেরে ফেলবে। আমি মৃত্যুর ভয় করি না। সেই বাদ দেওয়া শব্দ বাক্যগুলো যখন চোখেপড়ে, রীতিমত যুদ্ধ করেওগুলোআবার আমি ঢুকিয়ে দিয়েছিবইয়েরপরের সংস্করণে। পিবিএস এর কর্তারা নিজেরা ধর্মমুক্ত হওয়ায় কোনও ঝামেলা করেনি। নিখিল সরকার নিজে ধর্মমুক্ত হলেও আমার কোনও ক্ষতি হতে পারে আশংকায় আমার অতি-সাহসে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে শ্রদ্ধা করলেও আমি কাটাছেঁড়ার ব্যাপারটি মেনে নিতে পারিনি। বিশাল এক প্রকাশনা উৎসব হয়েছিলো বইয়ের, সম্ভবত ওটাই আমার লেখা কোনও বইয়ের প্রথম প্রকাশনা উৎসব।
