.
কত কিছু যে ঘটে কলকাতায়। অন্নদাশংকর রায়, শিবনারায়ণ রায়, অম্লান দত্তের মতো বড় মনীষীরা আমাকে স্নেহ করছেন, ভালোবাসছেন, তাঁরা আমার লেখাকে, লেখার জন্য আমার নির্বাসনকে ঐতিহাসিক বলে মত দিচ্ছেন। নিজের সম্পর্কে এত বড় ধারণা আমার নিজেরই কোনওদিন ছিল না, বা নেই। কিন্তু বড় মানুষদের ঔদার্য দেখে ভালোও লাগে, কুণ্ঠিতও হই। নিজে আমি সাধারণ এক মানুষ। সাধারণের মধ্যে থেকেই আমি স্বস্তি বোধ করি। অসাধারণ মানুষের ভিড়ে আমি বুঝি যে আমি নিতান্তই ক্ষুদ্র তুচ্ছতৃণ। তারপরও বড় বড় মানুষেরা আমাকে ভালোবাসা বা প্রশ্রয় দিতে মোটেও কার্পণ্য করেন না। নিখিল সরকার বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁর মহানুভবতার তুলনা হয় না। তিনি আমাকে পরমাত্মীয়র মতো কাছে টেনে নিজের দেশ, নিজের বাড়িঘর, নিজের আত্মীয় স্বজন সব হারিয়েছি বটে, কলকাতা আমাকে সব ফিরিয়ে দেয় কদিনেই।
আমি অবাক হয়ে লক্ষ করি, আমাকে এক পলক দেখার জন্য, আমার অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য, আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য কলকাতায় শুভাকাঙ্ক্ষীর ভিড়। সেই যে চুরানব্বই সালের মে মাসে প্যারিস হয়ে ঢাকা ফেরার পথে কলকাতায় গিয়েছিলাম, তার পর এই প্রথম আমি কলকাতায়। কলকাতা আমাকে বুকে টেনে নিল ভালোবেসে। অথচ পাশেই নিজের দেশ। যে দেশে আমাকে মানুষ ঘৃণা করে, অথচ বাঙালি ওরাও, বাঙালি এরাও। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ভালোবাসা পেয়ে আমার দীর্ঘ নির্বাসনের কষ্ট অনেকটাই মোচন হয়। যারা ভালোবাসে, তাদেরই আমার স্বজন, আমার আত্মীয় বলে মনে হয়। এদিকে ফরাসিটা চারদিকে আমার জনপ্রিয়তা দেখে কই খুশি হবে না তো কালকেউটের মতো ফণা তুলছে। এক রাতে, সারাদিনের হৈ চৈ এর পর পরদিন আমার অনুষ্ঠান, অনেকদিন বাংলা না বলে না পড়ে অনেকটা ভুলে যাওয়ার মতো অবস্থা, তারপর কী পড়বো, কোন কবিতা, কী বলবো নতুন বই নিয়ে, কিছুই ঠিক নেই, একবার দেখে নিতে চাইছি, মনোযোগ লেখায়, পড়ায়। না, লরে আমাকে কিছুইপড়তে দেবে না, লিখতে দেবে না, ভাবতে দেবে না। তাকে সময় দিতে হবে, তার দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে, তার সঙ্গে গল্প করতে হবে, তার সঙ্গে প্রেম করতে হবে, তার শরীরে সাঁতার কাটতে হবে। আমি সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই আপদকে জীবন থেকে সরাতে হবে। যে প্রেমে শ্রদ্ধা থাকে না, সে প্রেমকে আমি প্রেম বলি না। এত স্বার্থপর, হিংসুক, হীনম্মন্য লোককে নিয়ে চলাফেরা করার কী প্রয়োজন আমার! শরীরে সুখ হয় তা ঠিক। কিন্তু অন্যের ইচ্ছের খাঁচায় বন্দি হয়ে সে সুখ নেওয়ার কোনও শখ নেই আমার। ফরাসির জায়গায় কোনও বাঙালি পুরুষহলেও সম্ভবত একইভাবেঈর্ষা করতো। পুরুষের ঈর্ষা যে কী ভয়ংকর, তা আমি হাড়ে মজ্জায় টের পেয়েছি। জীবনে যে কজন পুরুষের সঙ্গে আমি সম্পর্ক গড়েছি, ওই একটি কারণেই মূলত সে সম্পর্ক ভেঙেছে, ঈর্ষা। লোকে বলে, মেয়েরা নাকি ঈর্ষাকাতর। পুরুষের তুলনায় মেয়েরা সামান্যও তা নয়। দেশে দেশে যত অপরাধ ঘটছে, তার সিংহ ভাগপুরুষের ঈর্ষার কারণে। মেয়েদের শরীরে অ্যাসিড ছুঁড়ছে, মেয়েদের গুলি করে, কুপিয়ে, পিটিয়ে, গলা টিপে হত্যা করছে পুরুষেরা। ঈর্ষায়। কটা পুরুষকে মেয়েদের ঈর্ষার কারণে জীবন দিতে হয়, কটা পুরুষের সর্বনাশ মেয়েরা করেছে, বলো?
.
এতদিন পর কলকাতায় এলাম, যেন দেশে ফিরলাম, যেন বাড়ি ফিরলাম। মা তুমি কখনও দেখনি মানুষ আমাকে ভালোবাসে। জীবনভর তুমি দেখেছো মানুষ আমাকে ঘৃণা করে, কাগজে কাগজে আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটায়, আমাকে অতর্কিতে আক্রমণ করে মেলায়, আমার বিরুদ্ধে মিছিল করে শহরে, আমাকে মেরে ফেলতে চায়, মাথার দাম ঘোষণা করে। কলকাতায় মানুষের ভালোবাসা দেখে আমার খুব তোমার কথা মনে পড়ছিল। আরও অনেক দেশে যখনই মানুষের ভালোবাসা, মানুষের উচ্ছ্বাস, আর আবেগ দেখেছি, শুধু তোমার কথা মনে পড়েছে, মনে মনে বলেছি, দেখ মা, তোমার মেয়েকে কত মানুষ ভালোবাসে। দেখতে কি পেতে কিছু! আমার কেন যেন বিশ্বাস করতে ভালো লাগতো, হয়তো দেখছো, যে কোনও কোথাও থেকে হয়তো দেখছো, দেখে হয়তো তোমার মনে আনন্দ হচ্ছে, হয়তো তোমার চোখে জল চলে আসছে। শিশির মঞ্চে আবৃত্তিলোক আমাকে সংবর্ধনা দিয়েছিলো। একা আমারই কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান ছিল। আমার এক পাশে বসেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আরেক পাশে শঙ্খ ঘোষ। একসময় যখন আমার ‘মায়ের গল্প’ নামের কবিতাটা পড়তে শুরু করলাম, কণ্ঠ বুজে এল, কিছুতেই পারছিলাম না পড়ে যেতে। সুনীল সান্ত্বনার একটি হাত রাখলেন পিঠে। কোনও সান্ত্বনা আমার দুঃখ দূর করতে পারেনা, মা। কোনও সান্ত্বনা আমার গ্লানি থেকে আমাকে মুক্ত করতে পারে না। তুমি যদি জীবনে সুখে থাকতে একটুখানি, আনন্দে থাকতে, তুমি যদি সামান্য ভালোবাসা পেতে আমাদের, তবে এই কষ্ট আমার হত না মা। মরে তো কত মানুষ যায়। তোমার মতো এত কষ্ট পেয়েকজন যায় বলো! সেই জন্মেরপর থেকে কষ্ট করছে। ভেবেছিলে কষ্ট বুঝি দূর হবে কোনও একদিন। তোমার চেয়ে ওই দুলুর মা বা আনুর মাও অনেক ভালো ছিল। তুমিও বুঝতে যে ওরা ভালো আছে, কেউ না কেউ আছে ওদের ভালোবাসার। তোমার তো কেউ ছিল না। এই যে কেউ ছিল না তোমার, সেটি আমি সইতে পারি না। নিজেকে ক্ষমা করতে পারি না আমি। কোনওদিনই পারবো না।
