দেশ থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর ছ বছর ভারতীয় দূতাবাসের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও ভারত যাওয়ার অনুমতি পাইনি। বাংলাদেশ তো আমাকে ঢুকতেই দেয় না দেশে, ভারতে যেতে চাইছি কতকাল, সেইভারতও আমাকে ভারতে ঢোকার অনুমতি দিচ্ছেনা। শেষঅবধি নিরানব্বইএর শেষ দিকে আমাকে ভারতের ভিসা দেওয়া হয়। কী যে আনন্দ হয়েছিলো তখন। অন্তত দেশে না হোক, দেশের কাছাকাছি কোনও দেশে তো পৌঁছোতে পারবো। কলকাতা তো শুধুই আর পাশের দেশের কোনওশহরনয়! কলকাতার কত মানুষই তো আমার বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী। অনেকে বলে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে বলেই ভিসা পেয়েছি। কোন দল সরকারে এলো, সে নিয়ে আমার ভাবনা নেই, আমার ভারত যাওয়া নিয়ে কথা। বিজেপি যদিছ বছরের নিষেধাজ্ঞা ঘোচায়, তবে বিজেপিকে ধন্যবাদ জানানোর কোনও কারণ নেই। আমার ভারত যাওয়া মানে, কলকাতায় যাওয়া। কলকাতায় যাবো, খুশিতে নাচছি আমি। ফরাসি প্রেমিক, লরোঁ নাম, বললো, সেও যেতে চায় সঙ্গে। আমার আপত্তি নেই। খুশিতে সেও নাচলো। কিন্তু নিজের টিকিট করার সময় ছেলে বললো তার টাকা নেই টিকিটের পেছনে খরচ করার! বলে কী! ফরাসি যুবক, বিমান বাহিনীতে পাইলটের কাজ করেছে, ওদিকে আবার তুলুজ নামের শহরের নামকরা কলেজে বৈমানিক প্রকৌশল বিদ্যা শিখছে, তার টাকা নেই? অবাক হলাম বটে, কিন্তু আমিই টিকিট করলাম দুজনের। এয়ার ফ্রান্সে বোম্বে হয়ে কলকাতা। আমি ছাড়া কে করবে এসব! আমার মতো আবেগ সর্বস্ব বুদ্ধিহীন মেয়েমানুষ ছাড়া! ওই তোমার মতোই। আমি ঠিক জানি, তুমি আমার জায়গায় হলে তাই করতে। ইয়াসমিনও করতো। আমরা এই তিনজন হয়তো আঘাত পাওয়ার জন্যই জন্মেছি। ছেলেকে বিশাল সম্মান জানিয়ে সবখানে আমার সঙ্গে রাখলাম। এমনকী জ্যোতি বসুর সঙ্গে যখন দেখা করলাম, যে ঘরে অন্য কারও ঢোকা নিষেধ ছিল, ফরাসিকে ঢোকালাম। ফরাসি মনের আনন্দে সব নেমন্তন্ন, সব সংবর্ধনা, সব আনন্দ, সব সুখ উপভোগ করলো। প্রচুর উপঢৌকনও পেয়েছিল শুধু আমার প্রেমিক হওয়ার কারণে।
শুধু ফরাসি যুবক নয়, ফরাসি ওয়াইন নিয়েও গিয়েছিলাম। তাজ বেঙ্গলে একটা সুইট ভাড়া নিয়েছিলাম। দিনে বারো হাজার টাকাই যার ভাড়া। আসলে কী জানো, প্রাণের টানে যে জায়গায় এসেছি, সেখানে আর যা কিছুরই হিসেব করি, টাকার করি না। আমি সবসময় বলি, আমাকে বলো লক্ষ টাকা দান করতে, করবো। কোনও আপত্তি নেই আমার। কিন্তু আমাকে ঠকিয়ে যদি দুপয়সা নিতে চাও, আমি মানবো না। বলি বটে, কিন্তু তাও মেনে নিতে বাধ্য হতে হয়। প্রথম রাতেই আমার হোটেলের ঘরে কলকাতার পুরোনো চার বন্ধু এসেছিল ওয়াইন খেতে। অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা হল, খাওয়া হল। ফ্রান্স থেকে আনা ওয়াইন শেষ হয়ে গেলে হোটেলের রিসিপশানে ফোন করে ফরাসি ওয়াইন থাকলে দিতে বলি। লোক এসে দুবোতল ওয়াইন খুলে দিয়ে যায়। পরদিন সকালে ওই ওয়াইনের বিল দেখালো এক লক্ষ টাকারও বেশি। অত দামি ওয়াইন দিতে গেলে তার দামটা তো আগে বলে নেবে! আমার প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই। বলেছিলাম, যেন দাম কমিয়ে রাখে। রাখেনি। ওই টাকা আমাকে একাই দিতে হয়েছে। ওয়াইন খেয়ে অনেক রাতে যখন বন্ধুরা চলে যাচ্ছে, আমার দ্বিগুণ বয়সী একজন বিদায় আলিঙ্গন করার নামে অযথাই আমার স্তন টিপে গেল। কী সুখ পেলো কে জানে। আমি হতবাক দাঁড়িয়ে রইলাম। এসবেপুরুষের কোনও লজ্জা হয় না, লজ্জা আমার হয়। আমার শুধু লজ্জা হয় না, রাগও হয়। কিন্তু আমি জানি, সব মানুষ এক রকম নয়। ভালো লোক মন্দ লোক সব দেশেই আছে। তবে জানো তো, মন্দ লোক আমি সহজে চিনতেপারি না। স্বভাব-গুণে অথবা দোষে সবাইকে ভালো লোক বলেই ভাবি। যখন মুখোশ খুলে পড়ে ওদের, বিস্মিত হই, দুঃখ পাই। ছোট একটা কবিতা লিখেছিলাম সেদিনের সেই বিস্মিত বিষাদনিয়ে।
রাস্তার ছেলে আর কবি।
এ গল্প আগেই করেছি, ওই যে ছোটবেলায় একদিন নদীর ধারে হাঁটছিলাম
আর ধাঁ করে উড়ে এসে এক রাস্তার ছেলে আমার স্তন টিপে
দৌড়ে পালিয়ে গেল, অপমানে নীল হয়ে বাড়ি ফিরে সারারাত কেঁদেছিলাম।
এ গল্প এখনও করিনি যে বড় হয়ে, কবিতা লিখতে শুরু করে
কবিদের আড্ডায় যেই না বসি,
হাতির মতো কবিরা স্তন টিপে দিয়ে চলে যায়।
পরদিন দেখা হলে বলে, কাল খুব মদ পড়েছিল পেটে।
মদের দোহাই দিয়ে কবিরা বাঁচে,
কবিতার দোহাই দিয়েও পার পায় বটে।
মন খারাপ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে তা ঠিক, কিন্তু মন ভালো হওয়ারও অনেক কিছু ঘটেছে। শান্তিনিকেতনেকণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে, যার গান শুনে আমার কৈশোর আর আমার যৌবন কেটেছে, যার গান আমাকে বিদেশ বিভুইয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে, দেখা হল। মুগ্ধতা আমাকে নির্বাক করে রেখেছিলো। উনি গান শোনালেন। গান শুনে কী জানি কী কারণে আমার চোখ ভরে ওঠে জলে। আড়াল করি চোখের জল। আসলে কী জানো মা, তোমার বয়সি কেউ যদি আমাকে নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবাসে, আমাকে স্নেহ করে, আদর করে কথা বলে, চোখের জল রোধ করতে পারি না। সাংবাদিকদের ভয়াবহ ভিড়। কী বলবোমা, লেখক তো নই, যেন বোম্বে থেকে সিনেমার স্টার এসেছি। আমার এত আলো, এত সাংবাদিক, এত প্রশ্ন ভালো লাগে না। বার বার ওদের বলেছি, ক্যামেরা দূরে সরাতে। বারবার বলেছি সাক্ষাৎকার দেব না। কে শোনে আমার কথা। বুঝি ওরা ভালোবাসে। ভালোবাসার মূল্য আমি না দিয়ে পারি না। এই একটি ব্যাপারে আমি খুব বোকা হয়ে পড়ি। শুধু তোমার ভালোবাসারই মূল্য দিইনি, জানি।
