.
আমার রয়্যালটি জমা ছিল ক্রিশ্চানের কাছে। ক্রিশ্চান ধনীর মেয়ে। নিজেই ক্লিনিং কোম্পানির লোক ডেকে আমার রয়্যালটি থেকে পাঁচ হাজার ফ্রাঁ দিয়ে কার্পেট পরিষ্কার করালেন। কল্পনা করতে পারো, কেউ একজন পাঁচ মিনিটে দশ বাই বারো ফুট কার্পেট ভ্যাকুয়াম করে পাঁচ হাজার ফ্রাঁ অর্থাৎ প্রায় চল্লিশ হাজার টাকা নিয়ে চলে যায়! রয়্যালটির টাকা ওভাবেইনাশ হতে থাকে। অ্যাপার্টমেন্টে নাকি নতুন লাগানো হয়েছে ওভেন, ওই ওভেনের টাকা আমাকে দিতে হবে। প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্টেই রেফ্রিজারেটর, হিটার, ওভেন, ডিশ ওয়াশার বা ওয়াশিং মেশিন এসব লাগানোই থাকে। ভাড়াটেদের কিছু কিনতে হয় না। কিন্তু এমন মন্দ কপালের ভাড়াটে সারা ফ্রান্সেপাওয়া যাবেনা। প্যারিসে থিতুহয়ে বসার পরপরই একদিন রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে পা মচকে গেল আমার। হাসপাতালে সেই পায়ে প্লাস্টার লাগানো, ফিজিওথেরাপি দেওয়া ইত্যাদি কাণ্ডতে আরও গেল টাকা। আমার হেলথ ইনসুরেন্স আছে সুইডেনে, আর তখনও আমার পাসপোর্ট রাষ্ট্রপুঞ্জের বা জাতিসংঘের, যে পাসপোর্ট ফেলে দিয়েছিলাম দেশে যাওয়ার আগে, সেটা ওরা নিজেরাই দেশ থেকে আমি ফেরার পর দিব্যি ফেরত দিয়েছে। এখানে ফ্রান্সে চিকিৎসায় যা খরচ হয়েছে, তা সুইডেনে নিয়ে দেখালে ওরা টাকা ফেরত দেবে, এরকম একটা আভাস পেয়েছিলাম। কিন্তু শেষ অবদি ওসব করাও হয়নি, টাকাও ফেরত পাওয়া হয়নি। টাকা যদি কেউ একবার নেয়, সেটা ফেরত নেওয়ার জন্য চেষ্টা করা কোনওদিন অন্তত আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। ব্যক্তিগত ধারের টাকা ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করার তো প্রশ্নই ওঠে না। দেড় দুবছরের পাওনা বেতনই তুলতে পারিনি মেডিকেল কলেজ থেকে। অফিস কাছারিতে টাকার জন্য, এমনকী পাওনা টাকার জন্য দৌড়োতে কোনওদিনই আমার ইচ্ছে করেনি। যা গেছে গেছে ভেবে অন্য কাজে মন দিই। এই টাকা জিনিসটা খুব চমৎকার, আবার খুবই বিচ্ছিরি। এটি আমার তীরে জলের মতো এসেছে, জলের মতো চলেও গেছে। আমার তো আবার খাল কাটায় জুড়ি নেই। খাল কেটে কেটে যথেষ্টই কুমীর এনেছি প্যারিসে থাকাকালীন।
.
ক্রিশ্চান বেস আমার জন্য ফরাসি সংস্কৃতি দপ্তর থেকে একটা চমৎকার স্কলারশিপ জুটিয়ে ফেললেন, দেড় লাখ ফ্রেঞ্চ ফ্রাঁ। প্যারিসের একটা ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলে সে টাকা জমা রাখা হল। টাকাটা উড়িয়ে ফেলতে বেশিদিন অবশ্য সময় যায় না। সুইডেনের বড় বাড়ি ফেলেপ্যারিসে ছোট একটা অ্যাপার্টমেন্টে থাকা, তাতে কী! ওখানেই শান্তি পেতাম। আমার যেমন ইচ্ছের জীবনে কেউ বাধা দেওয়ার নেই। এর চেয়ে আনন্দ আর কী আছে মা! যেদিন প্যারিসের অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকেছি সেদিনই আমার ইন্টারনেট চাই। ১৯৯৮ সাল। তখনও প্যারিসে লোকের ঘরে ঘরে কম্পিউটার ছিল না। ইন্টারনেটে আমি অভ্যস্ত অনেককাল আগে থেকেই। মোবাইল ফোনও তখন এত হাতে হাতে ছিল না। কিন্তু যে কোনও নতুন প্রযুক্তি শুরু হওয়ার শুরু থেকে তাআমার চাই। বিজ্ঞানের লোকশুধু নই, বিজ্ঞানে অগাধ বিশ্বাস থেকেই প্রযুক্তিরওপর কোনওদিন আস্থা হারাইনি। কমপিউটারকে এত বিশ্বাস করি, সম্ভবত মানুষের চেয়ে বেশি, তাই ব্যাক আপ রাখা বলে যে একটা কথা আছে, ওটাও রাখিনা। সারাদিন মগ্ন হয়ে থাকতাম কমপিউটারেতাস খেলায়। সারারাত আমার সময় সিগারেটের ধোঁয়ার সঙ্গে উড়ে যেতো। আমি আমি ছিলাম না মা। একসময় শরীর শরীর করে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম। হাহাকারকে আর নেবার ক্ষমতা থাকে না মনের, তখন শরীরে সুখ দিয়ে সেই হাহাকারকে আপাতত দাবিয়ে রাখা জরুরি হয়ে ওঠে। হরমোনের হইচই আচমকা বেড়ে যায়, হয়তো শরীরই এভাবে নিজগুণে সামলাতে চায় কষ্টের বানে ভাসিয়ে নিতে থাকা জীবন। তাই মনে হয় আমার। সম্ভবত ভেতরের কষ্টগুলোকে লাঘব করার জন্য, অথবা ভুলে থাকার জন্য আমি নই, আমার শরীরই শরীরের বর্ম ভেঙে বেরিয়ে আসে। হঠাৎ খুব পুরুষের জন্য শরীর কাতর হতে শুরু করলো। ব্যস্ত থাকতাম নেটের চ্যাট সাইটগুলোয়। অচেনা কারুর সঙ্গে বিছানায় যেতে চাওয়ায় আমার একটুও দ্বিধা হত না, ঘেন্না হত না। এরকম আগে কখনও দেখিনি। তোমার অসুখের পর থেকেই আমার ভেতরের সুশৃঙ্খল সুসভ্য মানুষটি যেন নীতি দুমড়ে রীতি ভেঙে বেরিয়ে গেল। আমিই, অবাক হয়ে দেখলাম, ক্রমশ নয়, আকস্মিকভাবে আমার অবাধ্য হয়ে উঠলাম আমি। আমারই অচেনা আমি। ভেতরের হাহাকার আর বিশাল এক শূন্যতাপূরণ করার জন্যই সম্ভবত এই তীব্র যৌনকাতরতা হাঁমুখ করে বসে থাকে। তোমাকে নিয়ে যে আমার প্রচণ্ড অপরাধবোধ ছিল, ব্যথা বেদনা ক্ৰোধ কান্না ছিল, তা থেকে মুক্তি পেতেই কি এই করি? নিজের বিরুদ্ধে নিজেই প্রতিশোধ নিই! কিন্তু নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্তকি ওভাবে করা যায়! আমার বোধহয় আর কোনও উপায় ছিল না। নিজের ভেতরটা ভেঙে গেলে বোধহয় নিজের বাহিরটাও ভেঙে ফেলতে ইচ্ছে হয়। অথবা আপনাতেই সব ভেঙে পড়ে। নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার কোনও শক্তি আমার মধ্যে ছিল না।
কিন্তু চিন্তাশক্তি লোপ পেয়ে যাওয়া, শরীরে উত্তপ্ত হতে থাকা, মন পাথরের মতো শীতল হয়ে ওঠা এ সবই সাময়িক। ভোগবাদী দেশে বাস করলেও ভোগে আমার রুচি হয় না অল্প কিছুদিন পরই। ভেতরের সভ্য সুন্দর মানুষটি আমাকে একটা সময়ে আমারই সামনে এসে অনড় দাঁড়ায়। খুব বেশি উজ্জ্বল হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনা। আমার যখন চূড়ান্ত ডিপ্রেশন চলছে, প্যারিসে অনেকে আসতো আমার সঙ্গে দেখা করতে, অবশ্য সেপ্যারিস বলেই আসতো। শহর দেখানোর দায়িত্ব ছিল আমার। ম্যাট চেরি এসেছিলো। ম্যাট আমার একটি ইংরেজ বন্ধু, মানববাদী, হিউম্যানিস্ট এণ্ড এথিক্যাল ইউনিয়নের কর্মকর্তা। আমাকে এই সংগঠন শ্রেষ্ঠ মানববাদী হিসেবে পুরস্কারও দিয়েছে। ম্যাট তার ম্যানচেস্টারের বাড়ি ছেড়ে আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছে, ওখানে সেন্টার ফর ইনকোয়ারিতে চাকরি করে। সেই আমেরিকার বাফেলো থেকে চলে এলো আমার সঙ্গে দেখা করতে। দুজনে মানববাদ নিয়ে, নাস্তিকতা নিয়ে সিরিয়াস সিরিয়াস কথা বলি। কিন্তু কোথায় থাকতে দিই বলল, একটি মাত্র ঘর। ভেতরের অতিথিপরায়ণ বাঙালি জেগে ওঠে। অতিথি নারায়ণতুল্য। অতিথিকে তাই বিছানা দিয়ে নিজে আমি মেঝেয় বিছানা করে শুই। কিন্তু দুরাত ওভাবে কাটাবারপর চেনা একজন ফরাসিমানববাদীর বাড়িতে ম্যাটকে রেখে এলাম, আমার পক্ষে ওভাবে কষ্ট করে ঘুমোনো সম্ভবনয়। সম্ভব হত, যদি ম্যাট কোনও সমবেদনা দেখাতো, যদি নিজেই বলত, তুমি বিছানায় শোও, আমি মাটিতে শুই বা কোনও হোটেলে চলে যাই। অথবা আমরা দুজনেই শুতে পারতাম বিছানায়। জানিনা ম্যাটের ওভাবে আমার কাছে আমেরিকা থেকে প্যারিস চলে আসার কারণ কী ছিল! একটি ঘর জেনেও তার কেন ইচ্ছে হয়েছিল, আমার সঙ্গে ওই একটি ঘরেই থাকার! ম্যাটের কি গোপনে প্রেম করার ইচ্ছে ছিল আমার সঙ্গে! ম্যাট দেখতে এমন কোনও সুদর্শন নয় যে ম্যাটের প্রেমে আমি পড়তে পিরবো। গুণে জ্ঞানে ম্যাট টইটম্বুর তাঠিক, কিন্তু দেখতে ভালো না হলে আমার পক্ষে প্রেম করা সম্ভব হয় না। যদি জনমনুষ্যিবিহীন কোনও মরুভূমিতে বাস করতে বাধ্য হতাম, তাহলেই হয়তো প্রেম করতে বাধ্য হতাম। শখের প্রেম চারদিকের সুন্দরের ভিড়ে কোনও এক অসুন্দরের সঙ্গে হয় না। ঢাকার প্রকাশক মেজবাহউদ্দিন এসেছিলেন প্যারিসে, উনি মেঝেয়বিছানা পেতে ঘুমিয়েছেন। আমি ভুলেও তাকে বলিনি বিছানায় শুতে। বাড়তি লেপ ছিল না, বড় জোর তার জন্য একটি লেপ কিনে দিয়েছি। অতিথিকে খাওয়াচ্ছি দাওয়াচ্ছি, নিজের পয়সায় প্যারিস দেখাচ্ছি, আর রাতে ঘরে ফিরে কিনা মাটিতে শোবো! এত ত্যাগ পোষায় না। তাছাড়া আরও একটা কারণে আমি ত্যাগ করিনা, কারণ মেয়েরাই পুরুষের জন্য নিজের আরাম আয়েশত্যাগ করবে, এটাই যেন জগতের নিয়ম। এই নিয়মকে আমি ভাঙি। অতিথিকে আপ্যায়ন করি, সাধ্যের বাইরেও তাদের জন্য করি, তাদের প্রাণের আরাম দিই। কিন্তু অতিথিকে নারায়ণ জ্ঞান করার ইচ্ছে আমার নেই। অতিথিকেনারায়ণের আরাম দেওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখি। কে আমার জন্য করে বলো! মেজবাহ আমার বই যে ছাপাচ্ছেন, কোনও রয়্যালটি দেওয়ার নামগন্ধ নেই। সব সমর্থন কেবল কথায়, কাজে নয়। মেজবাহ বলেন আমার বই নাকি এখন বাংলাদেশে মোটেও চলে না। আমার অবাক লাগে ভাবতে, একসময় পাগলের মতো লোকে বই কিনতো, পড়তো। আর যেই না দেশ থেকে দূর করে দিল সরকার, অমনি পাঠক মুখ ঘুরিয়ে নিল, বই পড়া বন্ধ করে দিলে! মৌলবাদীরা যখন বিরুদ্ধে ছিল, পাঠক তো আমার বইপড়া থেকে বিরত থাকেনি। সরকার আমার বিরুদ্ধে গেলে বইপড়া বন্ধ করে দেবার কারণ কী! এসবের কোনও উত্তর মেজবাহউদ্দিনের জানা নেই। শুধু পাঠক নয়, পত্রিকার সম্পাদকরাও শত্রু হয়ে যায়। যখনই সরকার আমাকে পিষে মারতে শুরু করলো বা দেশ থেকে তাড়িয়ে দিল, সব কাগজেই একযোগে আমার লেখা ছাপানো বন্ধ হয়ে গেল। কলকাতা থেকে শিবনারায়ণ রায় বেড়াতে এসেছিলেন। তাঁকে হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। যত জাদুঘর আছে, সব দেখিয়েছি। সুইডেন থেকে সুয়েনসন এসেছিল, তাকেও শহর দেখিয়েছি। এত কাল বিদেশে আমি অর্ধেক-তুমি অর্ধেক সংস্কৃতি দেখেও আমার শেখা হয়নি। আমিই একা ঢেলে দিই। ফরাসি বন্ধুরাও জানে বন্ধুদের নিয়ে রেস্তোরাঁয় বা ক্যাফেতে খেলে আমি একাই বিল মেটাই। গুনে গুনে নিজের পয়সা বের করে নিজের ভাগটুকু আলাদা করে দেওয়া আমার একেবারে পছন্দ হয় না। আমি একদিন খাওয়ালাম সবাইকে। পরের বার নিশ্চয়ই আমাকে সবাই খাওয়াবে। খাওয়ালাম বলে ধন্যবাদ বলে গালে চুমু খেয়ে খেয়ে সবাই চলে যায়। কিন্তু তারপর আবার যখন রেস্তোরাঁয় গেলাম, যাদের খাইয়েছিলাম, তারা যার যার পয়সা মেটায়, আমারটা আমাকেই মেটাতে হয়। কত হাবিজাবি লোককে যে খাইয়েছি মা, কী বলবো। এসব তোমার চরিত্র থেকে পাওয়া। টাকা ফুরিয়ে তলানিতে এসে গেলেও এই স্বভাব আমার যায় না। চেষ্টা করেছি, এবার থেকে নিজেকে আর বোকা বনতে দেব না। পণ করি বটে, কিন্তু রক্তে যদি স্বভাবটা থাকে, কী করে বদলাবো বলো। আসলে কী জানো মা, যারা আমার জন্য ত্যাগ করে, তাদের বেশির ভাগের জন্য আমার কিছু করা হয় না। দেখেছি, যাদের জন্য করি, তাদের জন্য শুধু করেই যাই ত্যাগ। তারা কোনওদিন বিন্দুমাত্র ত্যাগ তো করেইনি, বরং ফাঁক ফোকর পেলেই ঠকিয়েছে। বন্ধু ভাগ্য আমার খুব ভালো নয়। আমি লক্ষ করেছি, যারা আমার বন্ধু হয়, তারা আমাকে বন্ধু হিসেবে নির্বাচন করে। এখানেই ভুলটি আমি করি। আসলে তার সঙ্গেই আমার মেশা উচিত, যাকে আমার ভালো লাগে। প্রেমিক বলো, বন্ধু বলো কাউকেই আমি নির্বাচন করি না। এ কি কোনও কমপ্লেক্স থেকে, কে জানে? সুপিরিওরিটি অথবা ইনফিরিওরিটি। কিছু একটা হবে। আমার অনেক সময় মনে হয় আত্মবিশ্বাস কম থাকার কারণে যাকে আমার পছন্দ, তার কাছে আমার যাওয়া হয় না। আমাকে যদি তার পছন্দ না হয়, আমাকে যদি সে ভালো না বাসে এই অনিশ্চয়তা থেকেই। অপমানিত হওয়ার ঝুঁকি আমি নিতে চাই না। তার চেয়ে যারা আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করার জন্য উন্মাদ হয়ে ওঠে, দিনরাত যারা জপ করে নাম, লেগে থাকে জোঁকের মতো, তাদের সঙ্গেই ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব হয়। উন্মাদের দলে সত্যিকারের উন্মাদও বেশ কিছু জুটে যায়।
