নরমাণ্ডিতে জিভারনি নামের গ্রামে ফ্রান্সের বিখ্যাত শিল্পী ক্লদমনের বাড়ি দেখতেও ভালো লাগতো, ওটি এখন জাদুঘর, সেসব দৃশ্য এখনও আছে, শুধু ক্লদ মনে নেই, সেই বাগান, সেই লেক, সেই পদ্মপাতা, সেই মাঠ, সেই নদী দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, মানুষ থাকে না, কিন্তু মানুষের কাজ থেকে যায়। আমার লেখা, আমি মরে যাওয়ার পর টিকে থাকবেকী থাকবে না, অনেকে এ নিয়ে জল্পনা কল্পনা করে। এসবে আমার আগ্রহ একেবারেই নেই। বেঁচে থাকলে থাকবে, না থাকলে থাকবেনা। আমি অমরত্বে বিশ্বাস করি না। জীবনে যা দেখবো, জীবনে যা পাবো, তার মূল্যই আমার কাছে বেশি। মৃত্যুর পর কী হবে না হবে, তা নিয়ে আমার ভাবতেও ইচ্ছে করে না। বরং এই পৃথিবীর, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোথায় কী ঘটবে, বিবর্তন মানুষকেই বা কতদূর নেবে, এসব জানতেইচ্ছে করে। অনেকেতৃপ্তি পায় ভেবে তার শিল্প বেঁচে থাকবে হাজার বছর। এইপৃথিবীটাইকদিন বেঁচে থাকে দেখ। পৃথিবীর সবুজ যেহারে বিনাশ করা হচ্ছে, যেভাবে দূষণ ছড়াচ্ছে সবখানে, পাঁচ বিলিয়ন বছর আর অপেক্ষা করতে হবে না সূর্যের আলো ফুরিয়ে যাওয়ার জন্য। তার আগেই পৃথিবী ধ্বংস হবে। পৃথিবীতে এপর্যন্ত যত প্রজাতি জন্মেছে, তার নিরানব্বই ভাগই নিমূল হয়ে গেছে। নিয়ানডারথাল নামে একধরনের মানুষও ছিলোপৃথিবীতেও। আড়াইলক্ষ বছর বেঁচে থেকেওরাও জাতসুদ্ধ নেই হয়ে গেছে। মানুষ বলতে হোমোসাপিয়ানই আছে। এই মানুষই সভ্যতা গড়ে তুলেছে, অন্য সব প্রাণীর চেয়ে বুদ্ধি ধারণ করে বেশি, এই মানুষই মানুষ ভালোবাসে, আবার এই মানুষই মানুষ ধ্বংস করে। তুমি তো আফগানিস্তান বা ইরাকের যুদ্ধ দেখে যাওনি মা। যদি দেখতে, মানুষগুলোর জন্য কাঁদতে, যারা মরেছে, বা যুদ্ধে যারা সব হারিয়েছে। তুমি খুব অবাক হতে যারা দেশে দেশে বোমা ফেলে তাদের নিষ্ঠুরতা দেখে। তুমি তো মাটির মানুষ ছিলে। মানুষের এত নির্মমতা দেখেছো, তবু মানুষের নির্মমতা তোমাকে কাঁদায়। তুমি যেমন শক্ত হতে পারোনি, পাথর হতে পারোনি, আমিও পারিনি।
০৭. তিন মাস পর
তিন মাস পর নরমাণ্ডির মুলাঁ দন্দের পাট চুকলো আমার। এবার কোথায় ফিরবো? ভাবতে আমার খারাপ লাগে যেসুইডেনে ফিরতে হবে, আবার দেখতে হবে সুয়েনসনের মুখ। সুইডেনে কোনও বাড়ি ভাড়া নিতেপারি। কিন্তু ওই দেশটার ওপরই ভীষণ একঅভিমান আমার। আসলে সুইডেন নামের দেশটাও আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছে। যে দেশে আমার একটিও বন্ধু নেই, শুভাকাঙ্ক্ষী নেই, যে দেশে অসহায় আমাকে সাহায্য করার একটিও প্রাণী নেই, যে দেশের ডাক্তারেরা তোমাকে হত্যা করেছে, সে দেশে কেন থাকবো আমি! ইওরোপে এক ফ্রান্সেই আমার সবচেয়ে বেশি বই ছাপা হয়েছে। ওখানেই মানুষ আমাকে সবচেয়ে বেশি চেনে, শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে। ফ্রান্স সুইডেনেরমতো দেশনয়, যেখানে আমাকে ব্যবহার করে বিশ্বে বাহবা জুটিয়ে ব্যস দিব্যি ভুলে গেছে, আমি মরে আছি না বেঁচে আছি, কোনও রাজনীতিকই আর জানতে চায়নি। লেখকগোষ্ঠীর ভেতরে দলাদলি, মারামারি এসব তো আছেই, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যই সকলে ব্যস্ত। কেউ যদি লিখে নাম করে, ব্যস আলাদা হয়ে গিয়ে নিজের লেখালেখিতে মন দেয়, আর লিখে নাম না করতে পারলে তো যাতে নাম হবে, বিভিন্ন সমিতি সংগঠনে আঠার মতো লেগে থেকে, তার চেষ্টাই অহর্নিশি করে যায়। এখন আমার কোনও কিছুতে নাম লিখিয়ে নাম করার কিছু নেই। ওসবের রুচি কোনওদিন ছিল না আমার, এখনও নেই। নামের কাঙাল আমি কোনওদিনই ছিলাম না, না চাইতেই নাম বলো, দুর্নাম বলোসর পেয়েছি।
সুয়েনসন একটা কাঠের বা লোহার তৈরি মানুষের মতো। নিজের স্বার্থ ছাড়া একবিন্দু কিছু বোঝে না। কোনও সহমর্মিতা বা সহানুভূতি বলে কিছু নেই কারও জন্য। হীনম্মন্যতা তার সর্বক্ষণিক সঙ্গী। তার সারাক্ষণই সংশয়, তাকে না আবার কেউ কোনওদিক দিয়ে মন্দ বলছে। এধরনের লোকের সঙ্গে এক ছাদের নিচে বাস করা মানে নিজের সর্বনাশ করা, আর কিছুনয়। তাছাড়া সুইডেনের ওই বাড়িতে বাস করা, যেখানে তোমার কষ্টের স্মৃতি আমাকে তাড়া করে, সম্ভব নয়। নরমাণ্ডিতে থাকাকালীনই সিদ্ধান্ত নিই, সুইডেনে থাকার যেহেতু কোনও ইচ্ছে নেই আমার, প্যারিসে থাকবো।
.
ক্রিশ্চান বেসকে বললামপ্যারিসে থাকবো। সুজানকেও বললাম। সুজান বললো প্যারিসে তার বাড়িতে অ্যাপার্টমেন্ট আছে। সেই অ্যাপার্টমেন্ট দেখেও এলাম। মিরিয়ামের প্রচণ্ড উৎসাহ যেন সুজানের বাড়ির ওই অ্যাপার্টমেন্টটি ভাড়া নিই। কিন্তু বাধ সাধলো ক্রিশ্চান। তার ঠিক করা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিতে হবে, তার আবদার। সুজানের অ্যাপার্টমেন্টটি সুন্দর হলেও, কম ভাড়ার হলেও, ভালো এলাকায় হলেও ক্রিশ্চানের অনুরোধে তার কোনও একডাক্তার বান্ধবীর ফেলে রাখা অ্যাপার্টমেন্টটিই ভাড়া নিতে হল। ভাবতে পারো মা, নিজের অত বড় বাড়ি ফেলে ছোট একটা ঘরে বাস করা! সুইডেনে গিয়ে আমার বই পত্র, কাপড় চোপড় সব প্যারিসে নিয়ে চলে আসি। এক দেশ থেকে আরেক দেশে এক বাড়ি জিনিসপত্র আনা খুব সহজ ব্যাপার নয়। খরচ যেমন, খাটনিও তেমন। সব একাই করি। সুয়েনসন তার স্বভাবের বদগুণে আমাকে কোনও সাহায্য করে না। তোমার জন্য টেলিফোন ডাইরেক্টরি খুঁজে ডাক্তার বের করতে না পারলেও মালামাল সরবরাহের আন্তর্জাতিক কোম্পানি খুঁজে বের করি। আসবাবপত্র কিছুআনিনি, আরও অনেক কিছুআনিনি। ওগুলো সুয়েনসনকে দান করে দিই। আসবাব এবং সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নিয়েছিপ্যারিস থেকে। আমার নতুন সংসার শুরু হয় প্যারিসের পনেরো রুদ্য ভুইয়ে ঠিকানায়।
