মিলে যে শিল্পীরা থাকেন, তাঁরাই যে খাবার খান তা নয়। প্যারিস থেকেও অনেক শিল্পীরা আসেন দুপুর বা রাতের খাবার মিলের শিল্পীদের সবার সঙ্গে বসে খাওয়ার জন্য। এই মিলেই প্রতি খাবারের সময় ফরাসিদের মতো ওয়াইন আর পনির খাওয়া আমার শেখা হয়। ফরাসি খাবারের প্রতি ভালোবাসা এই মিলেই জন্ম নেয়। ফরাসি অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। আমি ফরাসি দেশে এক জনপ্রিয় লেখক। জনপ্রিয়তাটা টের পাই। আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য ফরাসিরা উন্মুখ হয়ে থাকে। কিন্তু ওদের যেমন ভাষা সমস্যা, আমারও। ওরা শুধু ফরাসি জানে, এদিকে আমি ফরাসির কিছুই জানি না। আমাকে ফরাসি ভাষা শেখানোর গুরু দায়িত্ব মিরিয়াম মর্তু, শিল্পী-বাড়ির পরিচালক, সুজানের সহকর্মী নিজেই নিয়েছে। আমার বেশ সখ্যও গড়ে ওঠে মিরিয়ামের সঙ্গে। এই গড়ে ওঠার পেছনে পরিশ্রম একা মিরিয়ামের। সারাক্ষণ, দিন রাত, সে আমাকে নিয়ে ব্যস্ত। পরিচালকের কাজ, সে কী কম কাজ! কিন্তু কিছুই সে করবে না। আমার অনেকগুলো বই কিনে এনেছে, সেগুলোপড়ছে। বাকিটা সময় আমাকে নিয়ে বেড়াতে বেরোচ্ছে, ফ্রান্সের উত্তরে যে শহর বা গ্রাম আছে, সব দেখাচ্ছে। আর আমার সঙ্গেই তার দিন রাত। আমার মতো সিগারেট ফোঁকে সে। তবে আমার চেয়ে দ্বিগুণ ফোঁকে। এর মধ্যে এই মেয়ে আবার আমার গভীর প্রেমে পড়ে বসে আছে। এদিকে কানাডার এক লেখক পিয়ের লরু, অসাধারণ সুন্দর দেখতে যুবক, তার দিকে চোখ পড়ে আমার। সে যুবকেরও চোখ পড়ে আমার দিকে। দুজন আমরা এক সঙ্গে হাঁটতে বেরোই। ফাঁক পেলেই গল্প করি। মিরিয়ামের কিছুতে সহ্য হয় না এসব। পিয়ের আমার ঘরে একদিন শ্যাম্পেন নিয়ে এলো, আমার জন্মদিন নাকি ওর জন্মদিন পালন করবে, মিরিয়াম এসে পিয়েরকে তাড়ালো। সে কিছুতেই আমার আশে পাশে নিজেকে ছাড়া অন্য কাউকে সহ্য করে না। দিন দিন অবাক হতে থাকি মিরিয়ামের অতিপ্রেমের নির্লজ্জ প্রকাশ দেখে। কিন্তু পিয়ের ছাড়া আর কারও জন্য আমার প্রেমের উদ্রেক হয় না। ইমানুয়েল নামের এক ফরাসি সঙ্গীতরসিক ভদ্রমহিলা আমাকে তার বাড়িতে নেমন্তন্ন করতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। ইমানুয়েলের সঙ্গেও আমার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। মিরিয়ামের তাও পছন্দ হয় না। কারও সঙ্গে মিশলেই তার সম্পর্কে মিরিয়াম আমাকে মন্দ কথা বলবেই বলবে। এরকম চরিত্র বাংলাদেশে মেলে জানতাম, এমন চরিত্র যে সুসভ্য দেশের ততোধিক সুসভ্য শিক্ষিত শিল্পী-বাড়িতেও মেলে, তা জানতাম না!
শিল্পী-বাড়িতে আমার খেয়ে দেয়ে গল্প করে গান শুনে সিনেমা দেখে আর ঘুরে বেড়িয়েই কাটে। যেখানেই যাই, যে কোনও সুন্দর জায়গায়, মনে হয়, আহ তুমি যদি দেখতে। যা-ই দেখি, মনে মনে তোমার চোখ দিয়ে দেখি। সমুদ্রের পাড়ে গেলাম একদিন। মন হু হু করে উঠলো। তোমাকে চেয়েছিলাম সমুদ্র দেখাতে, নিউইয়র্কে যখন ছিলে, ওয়ারেন অ্যালেন স্মিথকে বলেছিলাম আমার মাকে সমুদ্র দেখাতে চাই। শুনেই একটা গাড়ি যোগাড় করে নিয়ে এলো, প্রায় আশি বছর বয়স, ওই বয়সে নিজেই গাড়ি চালালো। কিন্তু মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে সমুদ্র নামের যে জায়গাটায় নিয়ে এলো, দেখেই আমার মন খারাপ হয়ে গেল। ঘিঞ্জি কনি আইল্যান্ড, বাচ্চারা চেঁচিয়ে খেলছে, রোলার কোস্টার চড়ছে, সমুদ্র অনেক দূরে। ওই সমুদ্রের কিনারে হেঁটে যাওয়াও তোমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। দূর থেকে এক চিলতে সমুদ্র দেখার কী মানে! আসলে ওয়ারেন সমুদ্র বলতে ওই জায়গাটা কেন বেছে নিয়েছিলো কে জানে, তুমি তো আর রোলার কোস্টার চড়বে না। ওয়ারেনের বুদ্ধিতে যা কুলিয়েছে, তাই করেছে সে। খুব বুদ্ধি করে সে আবার একখানা হুইল চেয়ার নিয়ে এসেছিলো, যেন তোমাকে ওই চেয়ারে বসিয়ে আমরা সমুদ্রের পাড়ে নিয়ে যেতে পারি। বালির ওপর দিয়ে ওই চেয়ার চালানো সম্ভব হবে না, তাছাড়া তুমিও চাওনি যেতে। হয়তো বিরক্ত হয়েছিলে হই চইএর বাজার দেখে। আমি ওয়ারেনকেও যে ধমকে বলবো ভুল জায়গায় এনেছো কেন। বলিনি। ওর আন্তরিকতা ছিল, এতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু যেরকম চেয়েছিলাম, একটা উদার একটা উতল, অথৈ জলে যেন জগৎ ডুবে আছে, যেখানে স্নান করতে নেমে সূর্য তার আগুন নিবিয়ে ফেলে সন্ধেবেলা, এমন কিছু দেখাতে। আমার সেই সাধ অতলান্তিকের পাড়ের আমেরিকায় বসেও পূরণ হয়নি। ফ্রান্সের উত্তরে এত্ৰেতেত এর সমুদ্র দেখে তোমার কথা বড় মনে পড়ে। জল দেখতে দেখতে চোখ ভরে ওঠে জলে। চোখের জলের এক একটি কণায় তোমাকে হারানোর কষ্ট। নরমাণ্ডির অনেক জায়গায় চরকির মতো ঘুরি মিরিয়মের সঙ্গে। রুয়োঁয় গিয়ে জোয়ান অব আর্কের সেই গির্জা, যে গির্জার আঙিনায় ওকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, দেখে অবাক দাঁড়িয়ে থাকি। ধর্মের লোকেরা শতাব্দীরপর শতাব্দী এভাবেই মেয়েদের অত্যাচার করেছে, পুড়িয়ে মেরেছে। আজ না হয় এসব দেশে ধর্মের অত্যাচারের অবসান হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে, শুধু আমাদের দেশে নয়, যে দেশগুলোয় মুসলমানের বাস, এখনও ভয়ংকর নিষ্ঠুরতা বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে। জোয়ান অব আর্ক ছেলেদের পোশাক পরেছিলো বলে ওকে জেলে ভরেছে লোকে। সেদিনও সুদানে এই একবিংশ শতাব্দীতে লুবনা আহমেদ নামের এক মেয়ে ট্রাউজার পরেছিলো বলে ওকে জেল খাটতে হয়েছে। ওকে জোয়ানের মতো পোড়ানো হয়নি, তবে ওকে চাবুক মারার আদেশ দেওয়া হয়েছে।
