আমি তখন না জানলেও এখন তো জানি যেতুমি সবচেয়ে বেশি আপন ছিলে। তুমি নেই। বাবাকে আপন যত ভাবি, বাবা হয়তো তত ভাবে না। তারপরও, বাবার অমঙ্গল আমি কিছুতেই কামনা করতে পারিনি। চেয়েছি বাবা সুস্থ থাকুক, ভালো থাকুক, আনন্দে থাকুক। যেভাবেই থাকুক, খুশি থাকুক।
.
আবার সেই আগের মতো। ঢাকা থেকে স্টকহোম। চুরানব্বই সালের আগস্ট মাসে এভাবেই দেশ থেকে বেরোতে হয়েছিল। যেসুইডেনে তুমি ছিলে, আমারপক্ষে সেই সুইডেনে, সুয়েনসনের যে বাড়িতে তুমি ছিলে, আমার পক্ষে সেই বাড়িতে বাসা করা অসম্ভব হয়ে উঠলো। তোমার স্মৃতি, তোমার অসুখ, তোমার চিকিৎসা না হওয়া, তোমাকে বড় চিকিৎসকের কাছে না দেখিয়ে বাড়িতে বসিয়ে রাখা, গ্রামেরপথেপথে অনর্থক ঘোরাঘুরি করা, তোমাকে কষ্ট দেওয়া সব মাকড়শার জালের মতো আমাকে আঁকড়ে ধরে আমাকে খেয়ে ফেলতে লাগলো। ওই জালে তড়পাচ্ছি, আর তখন আমন্ত্রণ এলো ফ্রান্স থেকে। ক্লদ ভাইজ নামের এক ফরাসি চলচ্চিত্র পরিচালক তাঁর সিনেমা-পরিচালক সংস্থার পক্ষ থেকে আমাকে আমার শোধ বইয়ের চিত্রনাট্য লেখার জন্য ফ্রান্সের নরমাণ্ডির মুলাঁ দন্দেতে আমন্ত্রণ জানালেন তিন মাসের জন্য। ওখানে বসে আমাকে চিত্রনাট্য লিখতে হবে সিনেমার জন্য। জীবনে কোনওদিন চিত্রনাট্য লিখিনি, কিন্তু রাজি হয়ে গেলাম, রাজি হলাম সুইডেন নামের নিষ্ঠুর দেশটাকেআর সইতে পারছিলাম না বলে। সুইডেনের ওই বাড়িতে তোমার স্পর্শ লেগে থাকা তোমার বিছানা বালিশ, তোমার গুছিয়ে রাখা কাপড়চোপড় দেখে আমার দম বন্ধ দম বন্ধ লাগছিলো। মনে হচ্ছিল ওই বাড়িটাকে আগুনে পুড়িয়ে দিই। নিজের বাড়ি হলে হয়তো তাই করতাম। একবার তোমার স্মৃতির জন্য ইচ্ছে করে থেকে যাই ওই বাড়িতে। আবার ওই একই স্মৃতির জন্য ইচ্ছে করে পালাই। আনন্দ বেদনা দুইই দেয় স্মৃতি। কাছে আসতে চাই, আবার দূরেও সরতে চাই। যেটুকু সুখ পেয়েছিলে সেটুকুই নিয়ে, ইচ্ছে করে, থেকে যাই। আবার বেদনার স্মৃতিগুলো আমাকে দূরে, অনেক দূরে সরে যেতে বলে। মনে হয় পৃথিবীর অন্য পারে গেলে হয়তো স্বস্তি মিলবে। ইচ্ছে করে সুয়েনসনকে কুড়োল দিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলি, আবার মনে হয় কী লাভ মেরে ফেলে! দোষ তো আমারই। আমি কেন তার সাহায্যের আশায় বসে ছিলাম। দোষ আমার নির্বুদ্ধিতার। আমি না হয় নির্বোধ, লোকটা যদি ওই সময় সামান্য সহযোগিতা করতো, তুমি আজ বেঁচে থাকতে পারতে। সুয়েনসনের চেহারা দেখতে শুধু রাগ নয়, আমার ঘেন্না হচ্ছিল। আমি ফ্রান্সে চলে গেলাম।
.
ফ্রান্সের নরমান্ডিতে জীবন শুরু হল আমার। সে অন্যরকম জীবন। আমি মুলাঁ দন্দেতে এলাম বটে, কিন্তু আর যা কিছুই লিখি, চিত্রনাট্য লেখা আমার আর হয়ে ওঠে না। বিশাল এলাকা জুড়ে সুজান লিপনস্কি নামের এক সুন্দরী ফরাসি মহিলা মুলাঁ বা মিল বা কারখানার মালিক। আমাদের দেশে না হলেও ইওরোপের সভ্য দেশগুলোয়পুরোনো বাড়িঘর বা ইতিহাসের মূল্য হীরের চেয়েও বেশি। পুরোনো আমলে জলের ওপর বড় কাঠের চাকা বসানো হত, সেই চাকা জলের স্রোতে ঘুরলে, চাকার সঙ্গে লাগানো কাঠের গুঁড়িতে স্রোতেরশক্তিটা এসে বসতো, সেই শক্তি কাজে লাগিয়ে গম ভাঙিয়ে আটা করতে লোকে। আরও অনেক কাজে ওই শক্তি ব্যবহার করা হত। মেশিন আবিষ্কার হওয়ার পর ওই মিলগুলোপুরোনো দিনের ইতিহাস হয়ে রয়ে গেছে। জলের ওপর সেই চাকাগুলো ছবির মতো স্থির হয়ে আছে। এক একটি মিলই এখন এক একটি জাদুঘর। প্যারিস শহরে মুলাঁ রুজ বলে একটি বিখ্যাত ক্যাবারে আছে। সেই ক্যাবারে বাড়ির মাথার ওপর মাথা উঁচিয়ে আছে লাল চাকা। নরমাণ্ডির মিলটি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন সুজান। কিন্তু এলাকা জুড়ে প্রচুর ঘরবাড়ি উনি নিজের কাজে ব্যবহার না করে, বিক্রি না করে শিল্পীদের বাড়ি বানিয়েছেন। ঘরবাড়িগুলো এখন শিল্পী সাহিত্যিকদের বাসভবন। তিন মাস থেকে শুরু করে এক বা দু বছর এখানে সঙ্গীতশিল্পী, চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, লেখক বাস করবেন। থাকা খাওয়ার জন্য খরচ দিতে হয়, দিতে পারলেই যে তোমাকে নির্বাচন করা হবে তা নয়। অনেকে আবেদন জানায়, কেউ কেউ নির্বাচিত হয়। আমার খরচ পোষাবেদ ভাইজের সিনেমা পরিচালক সংস্থা। আমাকে মুলাঁ দন্দেতে চমৎকার একটা ঘর দেওয়া হয়। ঘরে যা কিছু দরকার লেখালেখির জন্য, সবই দেওয়া হয়। কমপিউটার, প্রিন্টার। টেবিল চেয়ার তো আছেই, বিছানা বালিশ সব। কাজের লোক আছে, অনেকটা হোটেলের মতো। ঘর দোর সাফ করে দিয়ে যায়, বিছানার চাঁদর পাল্টেদিয়ে যায়, স্নানঘরে তোয়ালে দিয়ে যায়। সেইন নদীর পাড়ে বাড়িগুলো। বাড়িগুলোর মাঝখানে বিশাল খাবার ঘর, ওখানে দিনে তিনবেলা সবাই বসে এক সঙ্গে খায়। কড়িকাঠ বসানোপুরোনো বাড়িগুলো দেখতে পর্যটকের ভিড় জমে যায়। লোকে দেখতে আসে মিল। বিখ্যাত ফরাসিপরিচালক ফ্রাসোয়া তুফোর বিখ্যাত ছবি জুলি এণ্ড জিমের সুটিংও এখানে হয়েছিল। ছবিটি মিলে বসেই দেখেছি। মিলে সিনেমা দেখার ঘরও আছে। প্রচুর ভিডিও ক্যাসেট আছে সিনেমার। সিনেমার সঙ্গে জড়িত লোকদের মধ্যে অনেকেই সত্যজিৎ রায়ের কথা জানে। উচ্চারণ করে শেতাজিত রায়। জেনেছি সত্যজিতের জলসাঘর ছবিটা ওদের সবচেয়ে পছন্দের ছবি। আধুনিক একটি অডিটোরিয়াম আছে, ওখানে ধ্রুপদী সঙ্গীতের আসর বসে। নানা দেশ থেকে সঙ্গীত বিশারদরা আসেন। সেইন নদীর পাড়ে গাছগাছালিতে ছাওয়া এইপুরোনো মিলের বাড়িগুলোয় নিশ্চিন্তে নিরাপদে নির্ভাবনায় নিরিবিলিতে শিল্পীরা কাজ করে যাচ্ছেন, আর দেখ এমন সুন্দর জায়গায় বসে আমার লেখা হয় না। আমার শুধু তোমার কথা মনে পড়ে। রাশিয়ার শিল্পী ম্লাদিমির এর সঙ্গে আলাপহল, ও ওখানেইঅনেক বছর ধরেআছে। কেউ কেউ সারাজীবনের জন্য থেকে যায়। মরিস নামের ফরাসি এক লেখক আমি যে দোতলার ঘরে থাকি, তাঁর নিচের তলাতেই থাকেন। ওঁর এটাই বাড়িঘর, এখানেই বাকি জীবন কাটাবেন। যারা এখানে জীবনভর থাকবেন বলেপণ করেছেন, এই শিল্পী-বাড়ির পরিচালনার দায়িত্বও তাদের কিছুনা কিছু দেওয়া হয়েছে। ব্লাদিমিরকে দিয়ে তোমার একটি বড় পোট্রট করিয়েছি মা। তেল রঙের ছবি। পাঁচ হাজার ফ্রাঁ নিয়েছে। তুমি তো আর নেই। তোমাকে সামনে বসিয়ে ছবি আঁকার সৌভাগ্য ম্লাদিমিরের হয়নি। তোমার একটা ছবি দিয়েছিলাম ওকে, সেই ছবিটাই ছিলো শিল্পীর সম্বল। তোমার ছবির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবি, কী সুন্দর ছিলে তুমি। মা, তুমি কি এখন শুধুই ছবি!
