আমি তো দেশে ফিরেছিলাম মা। তুমি আমাকে ফিরিয়েছিলে। দেশেই থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমি জানো না কী ভীষণ কাণ্ড ঘটেছে হঠাৎ একদিন। ভালো যে, ঘটনাটা তুমি দেখোনি। দ্বিতীয়বারের দেশ ছাড়াটা তোমাকে যে দেখতে হয়নি, তা একদিক থেকে ভালো। কবি শামসুর রাহমানের বাড়িতে কে বা কারা রাতের অন্ধকারে ঢুকে অতর্কিতে কুড়োল টুড়োল নিয়ে আক্রমণ করেছিল, মেরে ফেলা উদ্দেশ্য ছিল, উনি অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছেন। কিন্তু পুলিশ ওই আততায়ীদের ধরে হাজতে নিয়েছে, এবং যা আবিষ্কার করেছে, তা শুনে তুমি চমকে উঠবে। আততায়ীরা হরকাতুল জেহাদ নামের একটি ধর্মীয় সংগঠনের লোক। নতুন এইইসলাম-বাঁচাও দল গড়ে উঠেছিল সেইনব্বই দশকের প্রথম দিকে। এই হুজির সন্ত্রাসীদের পেটের খবর পুলিশ নিয়েছে, এবং পকেটে যে ওদের সেই কাগজটা পাওয়া গেছে, যাদের হত্যা করার আদেশ ওদের নেতারা দিয়েছে। যাদের হত্যা করতে হবে, তারা হল, ১. তসলিমা নাসরিন, ২. শামসুর রাহমান, ৩. কবীর চৌধুরী আর ৪. ইসলামিক ফাউণ্ডেশনের একজন, মাওলানা আবদুল আওয়াল। তুমি বলতে পারো আমাদের মধ্যে আবার মাওলানা কেন। হতেই পারে। এই মাওলানার সঙ্গে হুজির ইসলামপন্থীদের মতপার্থক্য আছে, তাই। আমার নাম একনম্বরে। পত্রিকাগুলোর সবচেয়ে বড় সংবাদ এটি। আমি সত্যি বলতে কী মা, ভয় পেলাম। যদি হুজির সন্ত্রাসীরা আমার বাড়িতে এসে আমাকে মেরে ফেলে! কে আটকাবে? কোনও পুলিশ নেই বাড়ির সামনে বা দরজার সামনে। আর থাকলেই বা কী! যে কেউ ঢুকতেপারে বাড়িতে পুলিশ কাউকে কোনও বাধা দেয় না। তারা ঠিক জানেও না কী কারণে তাদের বসানো হয়। আগে যখন পুলিশ ছিলো, ওদের বলেছিলাম, দিব্যি ঘুমোচ্ছিল, ঘুম থেকে ডেকে তুলে, কী কারণে আপনারা এখানে বসেছেন? ওরা সরল মুখে বললো, থানা থেকেপাঠিয়েছে। কী কারণে পাঠিয়েছে, জিজ্ঞেস করায় বললো, তারা জানে না। যারা এ বাড়িতে ঢুকতে চায় তাদের তল্লাশি করার কোনও কথা কি বলেছে? ভালো মানুষ পুলিশেরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বললো, না। আমার নাম বললাম, এই নামের কারও কথা কি তারা শুনেছে? তাও বললো, না। এমনই আতংক এসে নাছোড়বান্দার মতো বসেছিলো যে কবীর চৌধুরীকে ফোনে জিজ্ঞেস করলাম, তাঁর বাড়িতে আমি চলে যাব কী না। আমার বাড়িতে মোটেও স্বস্তি বোধ করছি না। কবীর চৌধুরীর বাড়িতে পুলিশ পাহারা বসেছে। এদিকে দূতাবাস থেকে আমাকে ক্রমাগতই জানোনো হচ্ছে যে এক্ষুনি আমাকে দেশের বাইরে চলে যেতে হবে, কারণ তাদের কাছেও খবর এসেছে যে আমাকে মেরে ফেলারসবরকমপরিকল্পনা করা হয়ে গেছে।
.
ফরাসি রাষ্ট্রদূত বাড়িতে এসে বলে গেলেন দেশ ছাড়তে। কী একটা আমন্ত্রণপত্রও দিয়ে গেলেন। ফ্রান্সের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি থেকে আসা আমন্ত্রণপত্র, যার কথা আগেই বলে তাগাদা দিয়েছিলেন আমাকে। এর মধ্যেই হঠাৎ নতুন একটি মামলা উঠলো আমার বিরুদ্ধে। নির্বাচিত কলাম বইটা লেখার অপরাধে, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হল। ওই একই মামলা, ২৯৫ এ। লোকের ধর্মীয় অনুভূতিতে আমি আঘাত দিয়েছি। মত প্রকাশের বিরুদ্ধে একটি গণতান্ত্রিক দেশে এই আইন কী বিচারে থাকে, জানি না। আমাকে আবারও কোর্টে যেতে হল জামিন নিতে। আবারও সেই হুড়োহুড়ি করে জীবনের প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে কোর্ট থেকে দৌড়ে পেছনের দরজা দিয়ে গাড়িতে ওঠা। মিডিয়া আর মৌলবাদীর হাত থেকে বাঁচা। বই লেখার অপরাধে আমার বিরুদ্ধে অনেক মামলাই অনেক মৌলবাদী করেছে। কিন্তু হুলিয়া জারি হয়নি খালেদা সরকারের করা মামলা ছাড়া। এই আইন খাঁটিয়ে যখন মামলা করা হয়, অদ্ভুত জিনিস হল, সরকারি অনুমতি ছাড়া এই মামলা করার অধিকার কারও নেই। শেখ হাসিনার অনুমতি নিয়ে মামলা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এ দেশে আমাকে বাস করতে দেবেন না। বুঝি না, ক্ষমতায় এলেই কেন এঁরা দেশটাকে নিজের সম্পত্তি বলে মনে করেন। দেখমা, মানুষ খালেদা জিয়ারশাসনে এবং শোষণে অতিষ্ঠ হয়ে শেখ হাসিনাকে চাইছিলো। কী পার্থক্য হাসিনা আর খালেদায়! তাঁদের নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ থাকতে পারে, একজন আরেকজনের দুচোক্ষের বিষ হতে পারেন, নিরবধি চুলোচুলি করতে পারেন, একজনের পান থেকে চুন খসলে আরেকজন লাফিয়ে উঠে আরেকজনের গলা টিপে ধরতে পারেন, কিন্তু আমার ব্যাপারে তাঁরা একশভাগ একমত। আমাকে মেরে কেটে আমার সর্বনাশ করে তবে তাঁদের শান্তি। রাজনীতির লোক না হয়েও কী করে আমাকে রাজনৈতিক সন্ত্রাসের শিকার হতে হলে আমি ভাবি। ভেবেছিলাম এভাবেই থেকে যাবো দেশে। কিন্তু হুজির গোপন খুনের তালিকায় আমার নাম প্রথমে থাকা আর দূতাবাসগুলোর একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের চাপ সবই আমাকে আবার ঘরছাড়া করলো। ভালো যে তুমি এই ভয়ংকর ঘটনাটি দেখার আগেই চোখ বুজেছো। দেখলে তুমি যে কী ভয়ংকর কষ্ট পেতে, ভেবে আমি শিউরে উঠি।
দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্তটি নিতে আমি শেষপর্যন্ত বাধ্য হই। যাবার দিন সন্ধেয় শরাফ মামা আর টুটু মামাকে কুড়ি হাজার টাকা দিই। আর বাকি কজনের জন্য সামান্য পাঁচ হাজার টাকা করে উপহার। আমি জানি, এই টাকাটা তাদের অনেক কাজে লাগবে। বিদেশের ভালো কোনও রেস্তোরাঁয় একবেলা খেলেই তো আমার দশ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। বাবা আর দাদারা অসন্তুষ্ট মামাদের আমি টাকা দিয়েছি বলে। যত টাকা বাড়তি ছিলো হাতে, তা বাবার পকেটে ঢুকিয়ে দিয়েছি। মামাদের সব মিলিয়ে যা দিয়েছি, তার চেয়েও বেশি বাবাকে। বাবা তো টাকা পয়সা খরচ করে না। বাবাকে যা দিই, সবই হয় দাদা নয়তো ছোটদার পকেটে চলে যায়।
