.
দুদিন পর নানি বাড়ি গিয়েছিলাম। নানির সঙ্গে বিছানায় শুয়ে শুয়ে বলেছি তোমার কথা। নানি ক্রমাগত কেঁদেই চলেছে। কেঁদে কেঁদেনানি একটাই কথা বলে, ঈদুন তো নাই, আমারে দেখার কেউনাই। নানিবাড়িতে সবাই আমাকে খুব আদর করলো। আদর করলোকারণআমি নিরন্তর তোমাকে সঙ্গ দিয়েছি, সবার কাছে অভাবনীয় যে সেবা, সে সেবা করেছি। কেউ কেউ বললো, তুমি নাকি খুব ভাগ্যবতী, আমার সেবা পেয়েছে। এসব শুনলে আরও অপরাধ বোধ জাগে, আর কেউ না জানলেও আমি তো জানি, এই সেবা অর্থহীন। নানিবাড়ি থেকে তোমার লেখা আরবি গ্রামারের বড় বড় খাতা নিয়ে এলাম। অবকাশে তোমার নতুন রং করা আলমারিতে তোমার সব জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখলাম, তোমার বই খাতা, তোমার কাপড়চোপড়, তোমার ব্যবহারের জিনিসপত্র। তোমার লেখা চিঠিপত্র। চিরকুট। মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে লেখা পত্রিকায় পাঠানো চিঠির খসড়া। তুমি চিঠি লিখতে, আমার মা হিসেবে নয়, পাঠক হিসেবে, একজন সচেতন মানুষ হিসেবে লিখতে, তসলিমার ফাঁসি যারা চেয়েছে, তারা ইসলামের কিছুই জানে না। তারা মুসলমান নামের কলংক। একজন সংবেদনশীল সৎ লেখককে আজ বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়তে হয়েছে। আর দেশের ভেতর ইসলামের নামে যে অসহিষ্ণু মোল্লাতন্ত্র মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে, তারাই ইসলামের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি করছে। ইসলামকে তসলিমা বিপন্ন করেনি, মোল্লাতন্ত্র করছে। সরকারের কাছে আমরা দাবি জানাচ্ছিতসলিমাকে দেশেফিরিয়ে আনুন। তসলিমাকে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিন। …এসব পড়ে চোখ আমার বারবার জলে ভিজেছে। কেউ কি ভালোবেসেছে আমাকে অমন করে, সংসারের কেউ? তুমি ছাড়া আমার কেউ ছিলো না। এ কথা আমি কোনওদিন জানিনি, যে, তুমি ছাড়া আমাকে ভালোবাসার কেউ ছিল না। কী যে খালি খালি লাগছিল আমার। কী যে শূন্য লাগছিল জগৎ। কী যে অন্ধকার লাগছিলো চারদিক, কী করে বোঝাবো তোমাকে। এখনও লাগে মা, এখনও। আমি আমার শূন্যতার কথা ভেবে কাঁদি না। যখন কাঁদি, জীবনে যে কষ্ট তুমি করেছে, সে কথা ভেবেই কাঁদি। তোমার কষ্ট লাঘব করার কত সুযোগ আমার ছিল, লাঘব করিনি। সেই বেদনায় কাঁদি আমি।
মা, অবকাশ থেকে তুমি চলে যাওয়ার পর দুলুর মা এসেছিল। এই দুলুর মাকে সারা শহর লোক দিয়ে খুঁজিয়েছি। কোথাও তাকে পাওয়া যায়নি। আশেপাশের যত বস্তি আছে, সব বস্তিতে শুধু দুলুর মাকে কেন, আনুরমাকেও খুঁজিয়েছি। আনুর মা, তুমি বলেছিলে, নদীর পাড়ের কোনও এক বস্তিতে থাকে। কত জনকে বস্তি খোঁজ করতে পাঠিয়েছিলাম। খোঁজ করে ওদের পাওয়া যায়নি। ওরা এমনিতেই তোমার সঙ্গে দেখা করতে অবকাশে এসে শোনে যেতুমি নেই। দুলুর মা, আনুর মা দুজনই আকুল হয়ে কেঁদেছে তোমার জন্য। লোক দেখানো কান্না নয়, সত্যিকারের কান্না। মা, তোমার অনেক আত্মীয়র চোখে ওই জল দেখিনি, দেখেছি ওই দীন দরিদ্রর চোখে। ওরাই তোমার সত্যিকারের আপন ছিল, মা। ওরাই হয়তো তোমাকে বুঝতো। হয়তো তুমি দরিদ্র ছিলে, তাই।
.
মা, তুমি ফিরিয়ে নিয়েছিলে আমাকে দেশে। আর কারও পক্ষে সম্ভব হয়নি। এক তুমিই পেরেছিলে। কিন্তু তুমি জানোনা, যে, দেশ থেকে আমাকে দ্রুত বেরিয়ে যেতে হয়েছে। তুমি জানো, এখনও আমি দেশেই আছি। এটুকুই তো জেনে ছিলে। জীবন দিয়ে আমাকে আগলে রেখেছিলে। যেন কারও স্বার্থপরতা আমাকে স্পর্শ না করতে পারে। না, মা। দেশে থাকা আমার সম্ভব হয়নি। আমার নিরাপত্তার জন্য যেসব রক্ষী সরকার থেকে দেওয়া হয়েছিল, তাদের ঠেলে সরিয়ে যে কেউ আমাকে হত্যা করতেপারত। ময়মনসিংহের বারান্দার ঘরটার সোফায় বসেওরা ঘুমোতো। পায়ের কাছে পড়ে থাকতো ওদের লম্বা লম্বা পুরোনো রাইফেল। যে কেউ এসে রাইফেল তুলে নিয়ে দৌড় দিলে বোঝার ওদের কোনও উপায় ছিলো না। আমার মনে হয় না ওরা ঠিক জানত, ওরা ঠিক কী করতে এ বাড়িতে এসেছে। বাবা ওদের যত্ন করতো খুব, চা নাস্তা দিত। যখন ঢাকা যাবো, পুলিশের কারও সঙ্গে যাবার নিয়ম নেই। আমার তো কাজ নেই আর ময়মনসিংহে। তুমি নেই। অবকাশেআমার ঘরটি এখন শুভরঘর। ইয়াসমিনের ঘরটি সৌখিনের ঘর। বাবারঘরটিতেই হয়তো থাকা যেত। কিন্তু কদিন! অবকাশের সর্বময় কী এখন হাসিনা। বাবা হাসিনার হাতে সংসার ছেড়ে দিয়েছে, এ সংসারে আমি নিতান্তই ক্ষণিকের এক অতিথি। কিছুই আমার নয়। আমি এ বাড়িতে তোমার মতোই বাড়তি লোক। বড় একটি গাড়ি ভাড়া করে ওতে মামাদের নিয়ে, দাদা আর বাবাকে তুলে ঢাকা চলে গেলাম একদিন। টুটু মামা নিজ দায়িত্বে এনেছে লোহার ডাণ্ডা টাণ্ডা, তার ভাষায় অস্ত্র, সস্ত্র, মেঝেয় ঢাকা দেওয়া কালো কাপড়ে। আমার নিরাপত্তা রক্ষীর কাজ তারাই করছে। এতে নিরাপদ বোধ করেছি কিছুটা, বাকিটা স্বস্তি। স্বজনদের সতেজ সমর্থন আমাকে সবটাই স্বস্তি দেয়। মামারা আমাকে কাছের মানুষ বলে বেশি মনে করছে। যেশরাফ মামাকে মালোয়েশিয়া থেকে আমার বাড়িতে একদিন আশ্রয় দিয়েছিলে বলে হেন কটু কথা নেই তোমাকে বলিনি, সেই শরাফ মামাকে তোমার সামনে আমি যত্ন করে খাইয়েছি। ওই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেছি, মা। তোমার মনে কষ্ট দেওয়ার প্রায়শ্চিত্ত। তুমি যে তোমার আদরের বাবা মা ভাই বোনের চেয়েও আমাকে বেশি ভালোবাসতে, তা আমার বোঝা হয়েছে তুমি যখন কাউকেই আর কাছে ভিড়তে দিতে চাওনি। এমন কি নানিকে, ঝুনু খালাকেও। ওরা তো তোমার আপন ছিল খুব। তুমি ভেবেছিলে, ওরা বোধহয় ওদের স্বার্থের কারণে, ।আমার কাছ থেকে টাকা পয়সা নেবার কারণে তোমাকে দেখতে আসছে। আর আমি যেহেতু খুব দরদী, আমার যা আছে সব উজাড় করে দেব ওদের জন্য। না, মা। ওই আশংকাতুমি না করলেও পারতে মা। তোমার মা বা বোন কেউ অত স্বার্থান্ধ নয়, যত তোমার নাড়িছেঁড়াপুত্রধন কামাল, আমার ছোটদা। তোমার মা, বোন কেউ আমার কাছে কিছু চায়নি।
