.
অবকাশ দেখে কেউ বুঝবে না আজ এ বাড়ি থেকে মা নামের একজন চলে গেল, এই চলে যাওয়া মানে কখনও আর ফিরে আসা নয়। সন্ধেবেলায় যথারীতি টেলিভিশন চালালো কেউ। নাচের গানের অনুষ্ঠান হচ্ছে। নাটক হচ্ছে। বড় মামা তার মেয়েকে নিয়ে এসেছিল, থেকে যেতে বললাম। ফকরুল মামাও থাকলো। নানিও সেদিনটা রইলো। আমার জন্যই বোধহয় রইলো। আমি না থাকলে তোমার যে কী করুণ অবস্থা হত, তাই বললো সবাই। আমি ছিলাম বলে জীবনের শেষ কটা দিন তুমি আমার সেবা পেয়েছ। আমি তো জানি, এসব সেবার কোনও মূল্য নেই। সত্যিকার সেবা করা হত, যদি আমি সময় মতো তোমার চিকিৎসা করতে পারতাম। যখন দুরারোগ্য ব্যাধি বাসা বেঁধেই ফেলেছে তোমার শরীরে, তখন যে সেবাআমি করেছি, সেই সেবার কী মানে, বলো? চেয়ে চেয়ে তোমার মরে যাওয়া দেখা ছাড়া আর কিছু নয়। না, মা, আমি ক্ষমা চাইনি তোমার কাছে। ক্ষমা আমি চাইবো না কোনওদিন। আমাকে তুমি ক্ষমা কোরো না। বাবা তোমার চিকিৎসা করেনি, বাবা তোমাকে কোনওদিন ভালো বাসেনি। আমি তো তোমার কন্যা ছিলাম মা, আমাকে তুমি প্রচণ্ড ভালোবাসতে। কত শত মানুষের চিকিৎসা করেছি। রাত জেগে জেগে হাসপাতালের কঠিন কঠিন রোগের চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলেছি কত অসুস্থ মানুষকে। তোমাকে কেন করিনি মা। তুমি যে অভিযোগগুলো করতে, ওই রক্তপাতের অভিযোগ, তা অন্য কেউ করলে আমি তো অবহেলা করিনি। নানারকম পরীক্ষা করিয়েছি। কেবল তোমার বেলায় গা করিনি। আর সবাইকেই ক্ষমা করে দিলেও আমাকে কোরো না মা।
.
পরদিন মুন্নি এসেছিল অবকাশে। আমার সঙ্গে অনেকক্ষণ গল্প করে গেল। বললো, মার কথা সারাজীবনই মনে পড়বে। মাকে কখনও ভোলা হয় না। মুন্নি ঠিক কথা বলেছিলো মা, এই দেখ, আজ দশ বছর তুমি নেই। তোমাকে তো একটি দিনের জন্যও ভুলে থাকিনি। এখনও দেখ, চিঠি লিখতে গিয়ে চোখের জল রোধ করতে পারছি না। মানুষের কষ্টে কষ্ট পাওয়া, উজাড় করে কেবল দেওয়া আর দেওয়া, নিজে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া–তোমার এই জীবনবোধ, বাকিটা জীবন, অবচেতনেই আমি চর্চা করবো জানি। তোমার বোধের এই উত্তরাধিকার, আমি অহংকার করে বলি, আমার।
শুনেছি তোমাকেআকুয়ারকবরখানায় কবর দেওয়া হয়েছে। শুনেছি তোমার জানাজা হয়েছে, জানাজা শেষ পর্যন্ত পড়িয়েছে ফজলিখালার ছেলে মোহাম্মদ, যে মোহাম্মদ তোমাকে দেখতে এসে পীরের মতো তোমাকে তোমার মেয়ের বিরুদ্ধে, মেয়ে কী করে দোযখের আগুনে পুড়বে, আর তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে তুমিও যেপুড়বে দোযখের আগুনে, সেসব ভয়াবহ কথা সুর করে করে বলে গিয়েছিলো। শুনে তোমার খুব মন খারাপ হয়েছিল। ধর্মের নিষ্ঠুরতা দেখতে দেখতে আমার বিশ্বাস, ধর্মে তোমার বিশ্বাস হারিয়েছিল। তোমার মতো ভালোবাসা আর দয়া আর করুণা আর স্নেহ শ্রদ্ধায় যার হৃদয়পূর্ণ সে কী করে পারে নিষ্ঠুরতা মেনে নিতে! মোহাম্মদ চলে যাওয়ার পর আমি ছুটে এসেছিলাম তোমার কাছে, ভেবেছিলাম তোমার মুখে দেখবো তৃপ্তির হাসি। পীর আমিরুল্লাহর মৃত্যু হওয়ার পর, আমিরুল্লাহরসবেধনপুত্ররও মৃত্যু হবারপর, তারপুত্র মোহাম্মদ এখনপীর বাড়িরনতুনপীর। এই নতুনপীরের নছিহত পেয়ে তোমার তো খুশি হওয়ার কথা, কিন্তু বিষঃ তুমি বললে, এই এখনকার ছেলেরা আসলে কিছু জানে না।
আমি না হয় সারাজীবন তোমার সঙ্গে অন্যায় করেও জীবনের শেষ কটা দিন তোমাকে একটু শান্তি দিতে চেয়েছিলাম। বাবা করলো তুমি অবকাশ থেকে জন্মের মতো চলে যাওয়ার পর। বাইরের মাঠে বড় সামিয়ানা টাঙিয়ে কী সব মিলাদটিলাদপড়া হল। প্রচুর খাওয়া দাওয়ার আয়োজন হল। ভিখিরিদের খাওয়ানো হল। খরচ বাবাই করলো। তাঁর মতো পাঁড় নাস্তিকের হঠাৎ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করার কারণ কী আমি জানিনা। বাবা যেভাবে বলছে, দাদা সব করছে। আমিও দাদাকে যা আদেশ করেছিলাম, পালন করেছিলো। তোমার সামনে বসে একদিন অনেক হাসির গল্প শোনাতে বলেছি। দাদা শুনিয়েছে, প্রচুর হেসেছো তুমি। আমিও হেসেছি। হাসতে হাসতে, তোমার নির্মল হাসি দেখতে দেখতে চোখে জল এসেছে আমার। যেন নিজেরহাসিরকারণে চোখেজল এসেছে, এমনকরে চোখের জল মুছেছি। আমার ফুটফরমাশ দাদা বাধ্য ছেলের মতো শুধু ঢাকায় নয়, ময়মনসিংহেও খেটেছে। দাদাকে দিয়ে শীতলপাটি, এটাসেটা, গুলকিবাড়িরপীর আর তার মুরিদদের জন্য প্রেসক্লাবের বিরিয়ানি, অক্সিজেন সিলিণ্ডার, স্যালাইন, ওষুধপত্র সব আনিয়েছি। ছোটদাকে দিয়ে এসব কাজ সম্ভব হত না। সে উড়ে এসেছে। তোমাকে মাটি দেওয়ার জন্য, জানাজা পড়ার জন্য। তখন তার ছুটি, এমনকী অবকাশেও দুটো দিন বেশ কাটিয়ে দিল। তুমি বেঁচে থাকতে দেয়নি। আর আমি যখন তোমার কবরে একটি শ্বেত পাথরের এপিটাফ আর তোমার শিয়রের কাছে একটি শিউলি ফুলের গাছ পুঁতে দেওয়ার আয়োজন করছি, এত আদিখ্যেতা ছোটদা মোটেও পছন্দ করেনি। বিশেষ করে পছন্দ করেনি আমি যখন শরাফ মামাকে দিয়ে স্বদেশী বাজারে পাঠিয়ে সত্যি সত্যি তোমার এপিটাফ লিখিয়ে আনলাম, যেখানে লেখা ছিল–অনাহারে, অবহেলায়, অপমানে, অনাদরে যার সারা জীবন কেটেছে সেই দুঃখবতী নারী শুয়ে আছে এখানে। বেগম ঈদুল ওয়ারা। বয়স ষাট। শরাফ মামা লিখিয়ে আনলো, তবে ওপরে আরবিতে কিছু একটা জুড়ে দিয়ে। কী? না, কবরের ফেরেসতাকে সালাম জানানো, ওটা নাকি দিতেই হয়, সব এপিটাফেই দেওয়া থাকে। শরাফ মামার এ কাজটা সংগত কারণেই আমার ভালো লাগেনি। বড় মামারও লাগেনি। শরাফ মামাকে বললোও বড় মামা ‘তোকে তো আরবিতে সালাম জানানোর কথা লিখতে বলা হয়নি। এটা তো বিশ্বাস ভঙ্গ করা।’ শরাফ মামার নিজের বিশ্বাস শ্বেতপাথরে চাপিয়ে দেওয়া হল। ছোটদার বক্তব্য আমি পরিবারের মাথা নিচু করে দিতে চাইছি, মা অনাহারে ছিলো না, মাকে অবহেলা কেউ করেনি, মা সারাজীবন খুব সুখে কাটিয়েছে। এত বড় মিথ্যে আমি লিখেছি কেন, এই এপিটাফ কোথাও যাবে না। আমি বললাম, যাবে। ছোটদার প্রচণ্ড বিরোধিতা সত্বেও টুটু মামা, শরাফ মামা আর ছটকুর সহযোগিতায় কাজটা করি আমি। ওই এপিটাফই একটি স্তম্ভ বানিয়ে লাগানোহল। একটু হলেও স্বস্তি পাই। বড় মামা এপিটাফে তোমার ষাট বছর বয়স দেখে চমকে উঠেছে। বয়সতিন বছর বাড়িয়ে দিয়েছি আমি। বয়স তখনও বড়মামারইষাট হয়নি। বড় মামার আর তোমার জন্ম সাল লেখাপুরোনো নথি বের করে দেখালেন, বয়স তোমার সবে সাতান্ন হয়েছিলো। মামাদের বলেছিলাম, শ্বেতপাথরে লেখার লোক এনে ষাটকে সাতান্ন করে দিতে। জানিনা দিয়েছে কী না। জানি না তোমার শিয়রেপুঁতে দেওয়া গাছটিতে ফুল ফুটেছে কিনা। কবরে আমার আকর্ষণ নেই। তুমি ওখানে নেই মা। ওই মাটির নিচে কবেই তোমার ঠান্ডা শরীরটাপচে গেছে। তোমার হাতপামুখ, তোমার পা, পায়ের আঙুল, জন্ম থেকে চেনা তোমার ওই শরীর আমিশত চাইলেও দেখতে পাবো না। তুমি কোথাও নেই মা। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোথাও নেই মা। এপিটাফ, শিউলি ফুলের গাছ সবই আমার জন্য, আমার শান্তির জন্য। আমার প্রায়শ্চিত্তের জন্য।
