আমি লাশ শব্দটা উচ্চারণ করি না, কবর শব্দটাও আমি উচ্চারণ করি না। মরে গেছে শব্দটা আমি লক্ষ করি আমি উচ্চারণ করি না। আমি শুধু বাবাকে বলি, মা অবকাশে থাকবে, অবকাশ থেকে মাকে বাইরে বের যেন না করা হয়। অবকাশে মা মার হাতের লাগানো কোনও গাছের তলায় থাকুক। আমি পাগলের প্রলাপ বকছি বাবা ভেবেছে। বাবা ব্যস্ত। অবকাশে প্রথম কেউ মারা গেল। কত দায়িত্ব, কত কর্তব্য তার। তোমাকে নাকি আকুয়ার কবরখানায় রেখে আসা হবে। কী রকম যেন অদ্ভুত লাগে সমস্ত ব্যাপারটা। তোমার মরে যাওয়া, ওদের ছুটোছুটি, ওদের মাইকের ঘোষণা, ওদের কাফনের কাপড় কেনা, ওদের মাটি খোঁড়া, তোমাকে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া, তোমাকেপুঁতে দেওয়া, তোমাকে ফেলে আসা, তোমাকে একা ফেলে আসা, অন্ধকারে, গর্তে-সবকিছুকেই চরম নিষ্ঠুরতা ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। মা। আমি তাকাতে পারি না ওসবের দিকে। মানুষগুলোকে আমার মনে হয় আমি চিনি না। শুধু তোমাকে চিনি, শুয়ে থাকা তুমি, যদিও শ্বাস ফেলছো না, যদিও চোখ খুলছে না, তোমাকেই চিনি।
যে বিছানায় যে চাঁদরে শুয়েছিল, সেই বিছানায় তোমার স্পর্শ লাগা চাঁদরে আমি শুয়ে থাকি। ওদিকে তোমারশরীর নিয়ে উৎসব চলছেই। ছোটদাকে ফোন করে আগেইমৃত্যুর খবর জানিয়েছে বাবা। ছোটদা বলে গিয়েছিল, ‘কিছু হলে’ তাকে যেন ফোন করা হয়। কিছুটা এতদিনে হয়েছে। কিছুটার জন্য এখন ছোটদা আসবে অবকাশে, কিছু হলে যে জিনিসগুলো করতে হয়, সে জিনিসগুলো করবে ছোটদা। এই আড়ম্বর, এই অভিনয় আমার খুব হাস্যকর লাগে। যে ছোটদার কোনওদিন সময় হয়নি তোমার চেতন থাকা অবস্থায় তোমাকে সঙ্গ দিতে, এখন অচেতন তোমাকে, ঠাণ্ডা পাথর তোমাকে, মৃত তোমাকে হিরোর মতো দেখতে আসবে সে। সে হিরো। হিরোরা সবসময় দূর থেকে আসে, হিরোদের কাছাকাছি কোথাও থাকতে নেই। হিরোর জন্য তোমাকে শুইয়ে রাখা হল। জানাজাপড়ানোরজন্য শুনলাম মামারা আর দাদা মসজিদেমসজিদে ইমাম বা মৌলবী খুঁজেছে। শহরের কোনও মসজিদ থেকে কোনও ইমাম আসবে না জানিয়ে দিয়েছে। দাদা বললো, ‘তোর জন্য। যত ইমাম আছে সবাই একবাক্যে একটা কথাই বলেছে, নাস্তিকের মার জানাজা তারা পড়বে না।‘
.
আমার ইচ্ছে করে তোমাকে বরফে ডুবিয়ে রাখি, কোনওদিন যদিমানুষ বাঁচানোরপদ্ধতি আবিষ্কার হয়, বাঁচাবো তোমাকে। কিন্তু কে শুনবে আমার কথা! তোমার শরীর ওরা আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। বৈঠক ঘরে তুমি শুয়ে আছে, আর ওদিকে কালো ফটক খুলে দেওয়া হয়েছে, তোমাকে পাড়ার স্ত্রী পুরুষ যার ইচ্ছে হচ্ছে দেখে যাচ্ছে। যে কেউ এসে দেখে যেতে পারছে। সবার জন্য আজ বন্ধ দুয়ার খুলে গেছে। মৃত্যু যে দেখার বিষয় হয় কোনওদিন, জানা ছিল না। বেঁচে যখন ছিলে, কজন দেখতে এসেছে? প্রতিবেশীরা বেশির ভাগই হিন্দু। বাবা বড় পাঁচিল তুলে দিয়েছিলো বাড়ির সামনে, প্রতিবেশী থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার জন্য। রাস্তার অচেনা লোকেরই বা বাড়ি ঢুকে প্রাণহীন একটি মানুষকে দেখার প্রয়োজনটা কী? তুমি তো আর কোনও রাজনীতির লোক ছিলে না। তুমি ছিলে বোরখা পরা একটি মেয়ে। আজ অনাবৃত করা হয়েছে তোমার মুখ। আজ আর তোমার বোরখার প্রয়োজন নেই। জীবিত থাকলে তোমাকে ঢেকে রাখতে হবে, তোমাকে লুকোতে হবে, মরলেই তোমার সব বন্ধন মুক্ত, মরলেই তোমার মুক্তি। না মরে তোমার বোধহয় মুক্তি ছিল না, কোনও মেয়েরই কি আছে! আমার ভালো লাগে না বাড়ির আয়োজন। হাসিনাকে কেউ একজন বলে গেছে যেদিন কেউ মারা যায়, সেদিন বাড়িতে রান্না চড়াতে হয় না। রান্না না চড়ানোটাও উৎসবের ব্যাপার। পিকনিক পিকনিক আনন্দ। আমি ঠিক জানি না বাইরে থেকে কারা খাবার দিয়েছিলো, আমি খাইনি কিছু। খাওয়ার কোনও রুচি হয়নি। উঠোনের পেছন দিকটায় হেঁটেছি। তোমার হাতে লাগানো ফুল ফলের গাছগুলো দেখেছি। ফলের গাছগুলো ফল দিচ্ছে, সব ফুলগাছে ফুল। কী ভালোই না বাসতে এই অবকাশের সব কিছু। অথচ এবাড়িতেই তোমার থাকা হয়নি। তোমাকে থাকতে দেওয়া হয়নি। হাসিনার হাতে সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে তোমাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিল বাবা। তারপরও তুমি এ বাড়িতে অনাহুতের মতো আসতে। আঘাত পেতে সবার ব্যবহারে কাঁদতে। তারপরও মায়া যায়নি। এই গাছগুলোই ছিল তোমার আপন। গাছগুলোয় জল সার দিতে। গাছগুলোর সঙ্গে মনে মনে কথা। বলতে। সেই গাছগুলোর কাছে গিয়ে যেন কেউ না দেখে, কাঁদলাম। কান্না এলো মা। তোমার জন্য তো তোমার অসুখ ধরা পড়ার পর থেকে কাঁদছি। আগে কাঁদিনি। আগে একা কেঁদেছো তুমি। আর অসুখেরপর? একটুও কাঁদোনি। যেন তোমার মতো সুস্থ আর কেউ নয়। সুস্থ মানুষের অভিনয় করেছে, একই সঙ্গে একা যুদ্ধ করেছো। তুমি তো হেরে গেছো যুদ্ধে। তুমি হেরেছো, নাকি আমরা হেরেছি, মা? আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আমাকে আর বাবাকে তুমি চরম হারিয়ে দিয়েছে। আমাদের ডাক্তারি বিদ্যে দিয়ে যে আশংকাটি আমরা করতে পারিনি, কোনও ডাক্তারি বিদ্যে ছাড়াইতুমি সেই আশংকা করেছে। আমাদের কোনও সাহায্য ছাড়াইতুমি বলেছো, তোমার বড় একটা অসুখ হয়েছে। আমাদের জ্ঞানকেই শুধু তুমি হারাওনি, আমাদের মনুষ্যত্বকেও হারিয়েছে। আমাদের মতো নির্মম নিষ্ঠুর মানুষেরা তোমার মহত্বের কাছে হেরেছি। কী ভীষণ স্বার্থপর চারদিকের মানুষগুলো। বলছে তোমাকে নাকি এখন নিয়ে যাওয়া হবে বাড়ি থেকে। ওই বৈঠকঘরের ভিড়ের মধ্যে তোমাকে ঘিরে সার্কাস চলছে। সার্কাসে বড় বিরক্তি আমার। খাঁটিয়ায় শুয়ে থাকা তুমি অথচ তুমি-নওকে দেখার মোটে ইচ্ছে নেই আমার। কিন্তু কারা যেন আমাকে টেনে নিয়ে গেল ওঘরে, তোমার কাছে। তোমাকে শেষ দেখা দেখার জন্য। বড় মামাই বোধহয়। আমি শুধু হাঁটু গেড়ে বসে তোমার মুখে, তোমার গালে, বুজে থাকা চোখে, তোমার কপালে আলতো হাত বুলোলাম। ঠাণ্ডা পাথর হয়ে থাকা তোমার মুখ। জলে উপচে উঠেছে চোখ, যতটা পেরেছি আড়াল করেছি। বড় মামা পাশে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেপকেট থেকে রুমাল বের করে বললো যে ওই রুমালটা তুমি তাকে দিয়েছিলে। ওই রুমালে বড়মামা নিজের চোখের জল মুছলো মা। তোমার দেওয়া রুমালে। তুমি তো তাকে মিয়াভাই বলে আর ডাকবে না। হঠাৎ তোমাকে কারা যেন উঠিয়ে নিয়ে চলে গেল। সম্ভবত মামারা। আমি হতবাক দাঁড়িয়ে রইলাম দরজায়। এই অবকাশে, এই বাড়িতে তুমি আর ফিরবে না মা। তুমি আর কোনওদিন আবদার করবে না এক বাটি দুধ, দুটো কলা আর একটা ডিমের জন্য, তোমার ভেঙে যাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য বাবার কাছে আর কোনও আবদার করবে না। দাদার কাছে আর আবদার করবেনা কোনও একটা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার জন্য, বা গাড়িটা একটু চড়তে দেওয়ার জন্য। তোমার ছেঁড়া লেপ আর নষ্ট হয়ে যাওয়া তোশক পাল্টানোর জন্য কাউকে অনুরোধ করবে না। ভেঙে যাওয়া খাটটি সারাবার জন্যও আর কাউকে না। ডাব বিক্রি করতে এসে আর তুমি দেখবে না হাসিনা সব বিক্রি করে ফেলেছে। আর তোমাকে মশার কামড়ে বাইরের বারান্দার মেঝেতে রাত কাটাতে হবে না। এই অবকাশ থেকে আর অপমানিত হতে হতে প্রত্যাখ্যাত হতে হতে তোমাকে চোখের জলে বিদেয় নিতে হবে না। তুমি মুক্তি দিয়ে গেলে সবাইকে। সবাই এখন সুখে শান্তিতে বেঁচে থাক। সবাই এখন হাসি আনন্দে জীবনের গান গেয়ে যাক।
