জানিনা কেন সবাইকে আবারও কাছে আসতে বললাম। তখন শ্বাস নেওয়ায় ছন্দপতন হচ্ছিল, যখন বিরতি বেড়ে উঠছিলো, প্রথম নিঃশ্বাস থেকে দ্বিতীয় নিঃশ্বাসের মধ্যে। যখন ভেঙে ভেঙে যাচ্ছিল শ্বাস, আবার দীর্ঘ হয়ে উঠছিলো, যখন খুব সময় নিয়ে শ্বাস নিচ্ছিলে; এভাবে নিতে নিতে আর নেবেনা শ্বাস, জানি। সবাই এলো, দাদা তোমার শিয়রের কাছে গিয়ে বসলো। না, আমি বিছানায় উঠিনি। বাবা দূরে দাঁড়িয়ে রইলো ঘরে। ঘরে একটু একটু করে ভিড় বাড়তে শুরু হল। এবার নিশ্চয়ই তুমি মরতে সময় নেবে না। না সময় নাওনি, মা। সারাদিন নিয়েছে, রাতে আর নাওনি। রাতে তো সবাই রাতের খাবার শেষে যার যার শুভ্র বিছানায় শুতে যাবে, সেসবে আর ব্যাঘাত ঘটাওনি। দাদা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো, নাসরিন, কী হইব। মা নাই! দাদার চিৎকারে সামান্যও চমকে উঠি না। তোমার হাতের আঙুলগুলো খুব মন দিয়ে নাড়ছিলাম আমি। নেড়ে যাচ্ছিলাম। তোমার নখগুলো অনেকদিন কাটা হয়নি দেখছিলাম, আঙুলগুলোয় কয়েকদিন লোশন পড়েনি, দেখছিলাম। সুহৃদ ওষুধ নিয়ে ঢুকলো তখন। এসেই সে তোমাকে দুহাতে জড়িয়ে জোরে কেঁদে উঠলো। কান্নার সুহৃদকে সঙ্গে সঙ্গে ফকরুল মামা তুলে নিয়ে থামাতে চেষ্টা করলো। আমি বুঝতেপারিনা সুহৃদের কান্না থামানোর তার কী প্রয়োজন! তোমার দেবশিশু যদি আজ না কাঁদে কবে কাঁদবে? সুহৃদের জীবনের সবচেয়ে বেশি ঋণ তত তোমার কাছেই। সেই তুমি মারা যাবে, আর সুহৃদ কাঁদতে পারবে না! কারও কাঁদা উচিত নয়, কে এই নিয়ম তৈরি করেছে? সমাজ, নাকি ধর্ম। মনে আছে ফজলি খালা কারও মৃত্যুতে কাঁদতে বারণ করতো। বলতো, আল্লাহর জিনিস আল্লাহর কাছে যাচ্ছে, এতে দুঃখ করার কিছু নেই। কাঁদলে নীরবে চোখেরপানি ফেল, কিন্তু শব্দ করো না। শব্দ করে কাঁদলে, বুক থাপড়ালে, কপাল চাপড়ালে আল্লাহ খুব অখুশি হবেন। কিন্তু ফকরুল মামা তো ধর্ম মানে না। সুহৃদের সশব্দ ক্রন্দন তাকে পীড়া দিল কেন! নাকি সে ভাবছিলো, কেঁদে আবার সুহৃদনিজের কোনও ক্ষতি না করে ফেলে। কত আর ক্ষতি হয় কাঁদলে! বাকিজীবন যে ভেতরে বাইরে আমি কেঁদে চলেছি, কী ক্ষতি আমার হচ্ছে! মানুষকে কাঁদতে হয়, অন্যের প্রতি নিজের এবং অন্যান্যের নীচতা, নিষ্ঠুরতা, তঞ্চকতা দেখে কাঁদতে হয়। না কাঁদলে মানুষ মানুষ হবে কী করে!
.
তুমি আর শ্বাস নিলে না মা। রাত তখন দশটা অথবা সাড়ে দশটা কিছু বাজে। ঘরের ভিড় কমলে আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকি। তুমি তখন ঠাণ্ডা হয়ে গেছ। আর কোনও কষ্ট নেই। শ্বাস নেবার দায় নেই। তোমাকে ক্লান্ত কিন্তু ভারমুক্ত বলে মনে হচ্ছিল। বিশ্বাস হচ্ছিল না তুমি আর জেগে উঠবে না, তুমি আর কথা বলবে না বা হাসবে না। তোমার নরম শরীরটা আর নরম নেই। শুয়ে হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মা। প্রায় চার মাসের একটানা অবসাদশরীরে। হঠাৎ কিছুর শব্দ পেয়ে চমকে উঠি। কী! ফজলি খালা ঘরে এসেছে, চেয়ারে বসে বিছানায় নিথর নিস্তব্ধ তোমার দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আমি চিৎকার করি, চিৎকার আমি করবো এই পরিকল্পনা করে চিৎকার করিনি, ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে চিৎকার, ওই চিৎকার, বাড়ি কাঁপানো চিৎকার, জানালার কাঁচে ঝিনঝিন শব্দ হতে থাকা চিৎকার, আকাশ বাতাস কাঁপানো চিৎকার। যে গালি আমি দিই না, সেই গালি, যে ঘৃণা আমি ছুড়ি না, সেই ঘৃণা আমার ভেতর থেকে বোমার মতো বেরিয়েছে। যে বোনকেতুমি ভালোবাসতে, যে বোনেরপায়ের শব্দ শোনার জন্য তুমি কান পেতে ছিলে, সেই প্রিয় তোমার বোনকে উদ্দেশ্য করে কেন এসেছে শুয়োরের বাচ্চা এখানে, কী দেখতে এসেছে। বেরিয়ে যা, এক্ষুনি। এক্ষুনি বেরিয়ে যা। এক্ষুণি বেরো এই বাড়ি থেকে। হারামজাদি আজকে এসেছে, মড়া দেখতে এসেছে। শুয়োরের বাচ্চা মজা করতে এসেছে। বেরো এক্ষুনি এই মুহূর্তে। আমি আমি ছিলাম না মা। আমার সহ্য হয়নি ফজলি খালার এই উপস্থিত। কত যে তাকে তোমাকে দেখতে আসার জন্য ডেকেছি। ফজলি খালা ছিল তোমার সবচেয়ে আদরের বোন। অসুস্থ জেনেও, মরে যাবে জেনেও একদিনও সে দেখতে আসেনি নিজের বোনকে। কারণ হচ্ছি আমি। আমি নাস্তিক, তাই যে বাড়িতে নাস্তিক আছে, সে বাড়িতে তার মতো পবিত্র আস্তিক পা রাখতে পারে না। ছটকুকে দিয়ে, শরাফ মামাকে দিয়ে, টুটু মামাকে দিয়ে, ফেলু মামাকে দিয়ে, রুনু খালাকে দিয়ে দিনের পর দিন অনুরোধ করেছি। বলেছিনাস্তিক তোমার চোখের সামনে থাকবেনা, তুমি শুধু তোমার বড়বুকে দেখতে এসো, শেষ দেখা দেখতে এসো, তোমাকে দেখে শান্তি পাবে তোমার বড়বু। না, ফজলি খালা আসেনি। এলো ঠিকই, তুমি জানলে না যে এসেছে। এই আসার কী দরকার। তার এই আসা, তোমার স্থবিরশরীর, তোমার বরফের মতো ঠাণ্ডা কঠিন শরীর দেখতে আসা আমার সইবে কেন! আমার সমস্ত ক্রোধ, রাগ, সমস্ত অভিমান, দুঃখ, আমার শত শোক সে রাতে আগুন হয়ে ঝরলো। তুমি শুয়ে আছে। কিছুই তোমাকে আর স্পর্শ করছে না। জগতের নিষ্ঠুরতা অনেক দেখেছো। বেঁচে থাকতে আমার নিষ্ঠুরতাও দেখেছো অনেক। তুমি দিব্যি মরে রইলে, আর আমি অবাধে নিষ্ঠুরতা করলাম। তবে এই প্রথম তোমাকে ভালোবেসে একটি কুৎসিত নিষ্ঠুরতা করলাম, মা। ফজলি খালাকে আমি ক্ষমা করতে পারিনি। তুমি পারো ক্ষমা করতে অনেক কিছু। আমিও কি কম করেছি ক্ষমা এ জীবনে! সে রাতে পারিনি। ফজলি খালা আমার চিৎকারে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হল। এরপর তোমার শরীর নিয়ে কত যে কাণ্ড শুরু হল। সেই রাতেই তোমাকে কলের পাড়ে নিয়ে গিয়ে গোসল করিয়ে গায়ে সাদা কাপড় পেঁচিয়ে দেওয়া হল। কাপড়ে রক্ত লেগে রইলো। তা লাগুক। আমি গোসলেরপূতপবিত্রতায় বিশ্বাস করিনা। যারা মনে করে তুমি এখন আল্লাহ বাপয়গম্বরের কাছে যাচ্ছে তারা হয়তো এসব গোসল, সাদা কাপড়, সুরমা বা আতরে বিশ্বাস করে। গোসল করাবার জন্য কোত্থেকে সব মেয়ে ভাড়া করে আনা হয়েছে। হাসিনা মহা উৎসাহে ছুটোছুটি করছে, একবারদাদা বা বাবার কাছেআরেকবার কলপাড়ের লোকদের কাছে। মনে আছে তুমি একবার বলেছিলে, তুমি মারা যাওয়ারপরফজলি খালারননদ জোহরা, তুমি চাও, যেন তোমাকে গোসল করায়। জোহরার মধ্যে সততা আর সারল্যের সন্ধান পেয়েছিলে হয়তো। আমি ও নাম নিইনি। বেচে থাকতে তোমার কোনও ইচ্ছেপূরণ হয়নি। মরে গেলে তোমার ধর্মবিশ্বাস থেকে প্রসূত ইচ্ছেগুলোর কী হল, তা আমার জানতে ইচ্ছে করে না। তোমার ওই প্রাণহীন শরীরটি তুমিনও হাসিনা, দাদা, বাবা এরা তো তোমার জীবন নিয়ে কিছুভাবেনি, মৃত্যু নিয়ে ভেবেছে। মধ্য রাত্তিরে কী করে এত কিছুঘটে যাচ্ছে জানিনা। ব্যবস্থাপনায় কেছিল, কারা ছিল জানি না। যা কিছু হয়েছে, আমার আড়ালেই হয়েছে। সবকিছুর ব্যবস্থাপক যে বাবা, অনুমান করতে পারি। কী সুন্দর আগরবাতির গন্ধ চারদিকে। আগরবাতি আগে থেকে ঠিক করা ছিল তবে! কাফনের কাপড়টিও আগে থেকেই কেনা ছিল! আমার শুধু সারারাত মনেপড়েছে, সারাদিন মনেপড়েছে তোমার দুঃসহ জীবনের কথা। বাড়িতে এখন উৎসব লেগেছে। উঠোনে আলো। কোত্থেকে একটি কাঠের সস্তা খাঁটিয়া না কী নিয়ে এসেছে কে জানে, সাদা কাপড়ে মোড়ানো তোমাকে ওতে শুইয়ে বৈঠকঘরে এনে রাখা হল। এখন তুমি বাবার আর দাদার সম্পত্তি। আমার কিছু নও। তোমার শরীর নিয়ে এখন কী করা হবে, কী করা উচিত, তা আমার কাছে কেউ আর জানতে চাইছেনা। যখন শ্বাস নিয়েছে, আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমি করতে চেয়েছি, তোমাকে ভালোবেসেছি, পাশে থেকেছি, তোমারশরীর ভালো করার কোনও উপায় আমারছিল না, তোমার মন ভালো করার জন্য, তোমার মনে সামান্য সুখ দেওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছি। শ্বাস আর নিচ্ছেনা, আমার ছুটি, হ্যাঁ মা, ছুটিই। তোমাকে বৈঠকঘরের মেঝেয় শুইয়ে দেবার পর কি ওরা টেলিভিশন চালিয়েছিল! মনে নেই। চালালেও অবাক হওয়ার আমার কিছুছিলনা। আমার সব অবাক হওয়া, সব দুঃখ পাওয়া, কষ্ট পাওয়া তোমার মতোই স্থবির পড়ে আছে, প্রাণহীন। সকালে অদ্ভুত সব কাণ্ড হতে লাগলো। সবই বাবার মস্তিষ্ক প্রসূত। রিক্সা করে কে যেন বাইরে মাইকে ঘোষণা করছে, ডাক্তার রজব আলীর স্ত্রী গতকাল রাত সাড়ে দশ ঘটিকায় ইন্তেকাল করেছেন, ইন্নালিল্লাহে কিছুএকটা রাজেউন। দুনিয়ার লোককে তোমার মৃত্যু সংবাদ জানিয়ে দেওয়ার কী প্রয়োজন আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমার খুব অস্বস্তি হয় ওই ঘোষণা শুনতে। তোমার নিঃশব্দেচলে যাওয়া সশব্দে প্রচারিত হচ্ছে। মানুষ যার যার জীবন নিয়ে সবাই ব্যস্ত। তারা তোমার মৃত্যুর খবর জেনে কী করবে, উৎসব করবে, নাকি কাঁদতে বসবে? কজন আর চিনতো তোমাকে! তুমি বোরখা পরেই চিরকাল বাইরে বেরিয়েছে। কেউ তোমারমুখটাও কোনওদিন দেখেনি। পাড়ার কারও সঙ্গে তোমার তো খুব সখ্য ছিল না। কিন্তু বাবার এসব কার্যকলাপে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। তুমি যেই না চোখ বুজলে, এ বাড়িতে আমি মুহূর্তে অস্পৃশ্য হয়ে উঠলাম। মূল্যহীন হয়ে উঠলাম। আমার কোনও পরামর্শ বা চাওয়া না চাওয়ার কোনও দাম নেই তখন।
