আমি তোমার কাছে বসছি, একবার বারান্দায় যাচ্ছি, একবার ঘরে ঢুকছি। মামারাও এক এক করে যাচ্ছে, আবার আসছে। কে ঠিক কী করবে বুঝতে পারছে না। ওই সকালেই নাকি দুপুরের দিকটায় হাসু খালু বলতে শুরু করলো আমরা তো তৈরি হয়েই এসেছি, লাশ নিয়ে যাবার জন্য যারা যারা আসার কথা, সবাই এসে গেছে জাতীয় কথা। আমার কানে যেন গরম লাভা পড়লো মা। বাবাকে বলি তোমার কাছে বসার জন্য। বাবাকে খুব ধীর স্থির লাগছিলো, বাবা কি সত্যিই নিস্পৃহ ছিল, নাকি বাবারও আমার মতো ভীষণ ভয় হচ্ছিল, বাবাও ভীষণ একা হয়ে যাচ্ছিল, যে কথা আমার মতো বাবাও কাউকে বুঝতে দিতে চাইছিলো না! দাদাকেও বলেছি যেন কাছে এসে বসে, যেন ধরে থাকে তোমার শরীর! কী যে কষ্ট করছো তুমি প্রতিটি নিঃশ্বাস নিতে। জীবন বেরিয়ে যাচ্ছে তোমার জীবন বাঁচাতে। ওদিকে দুপুর থেকেই আবার বৈঠক ঘরে দাদা আর বাবার চিরাচরিত বৈঠক। বাবা দাদাকে, অথবা দাদা বাবাকে ক্রমাগত বলে যাচ্ছে কবর, কোদাল, জানাজা, কাফন এসব কুৎসিত আর অশ্লীল শব্দযুক্ত বাক্য। তার চেয়ে বধির হয়ে যেতাম, তার চেয়ে অন্ধ হয়ে যেতাম। আমাকে দেখতে হত না এই ভয়ংকর দৃশ্য, শুনতে হত না নোংরা শব্দগুলো। তুমি এখনও শ্বাস নিচ্ছ মা, তুমি এখনও মরে যাওনি। কারও চোখে এক ফোঁটা জল নেই। হাসিনা তার ছেলেদের নাওয়া খাওয়া বিশ্রাম ইত্যাদির তদারকি করছে, যেমন করে প্রতিদিন। বাড়িতে একটি মানুষ যে কোনও মুহূর্তে আর নিশ্বাস নিতে পারবে না, কে বিশ্বাস করবে! ঠিক কী করবো বুঝতে পারছি না। কোথায় যাবো, কার সঙ্গে কথা বলবো কিছুই জানি না। মা, মা, মা বলে তোমাকে ডাকছি, যেন তুমি অন্তত কথা শোনো আমার। তুমি ছাড়া আর কেউ নেই আমার তখন। আমার সেদিন অনেকবার মনে হয়েছে, তার চেয়ে এই যন্ত্রণাটা তুমি না পাও, তার চেয়ে নিশ্বাস তুমি আর না নাও। কার জন্য নিতে চাইছো, এই সংসারে কে আছে তোমার! আমিই বা কী করেছি তোমার জন্য সারাজীবন! জীবনে যা করা উচিত ছিল করিনি, এখন উজাড় করে দিচ্ছি মত্যুর সঙ্গে রোজ যখন তোমার পাঁচবেলা দেখা হচ্ছে। যখন জীবন বলে সত্যিকার কিছু নেই, তখন। তুমি বিছানায় মিশে যাচ্ছো। বসার, হাঁটার, চলার, খাওয়ার কিছুরই উপায় তোমার নেই যখন, তখন। মা, তখন তুমি সবই মেনে নিচ্ছো। তোমার জীবন তুমি ছেড়ে দিয়েছো আমার হাতে। যেন আমার এই হাতই, এই অভিজ্ঞ এবং আন্তরিক হাতই মৃত্যুর মুখ থেকে ছিনিয়ে আনবে তোমাকে। এরকম তো কত গল্প শুনেছো কত বাঁচার। ডাক্তার আসছে, কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে চলে যাচ্ছে। অন্য ঘরে কবরের গল্প হচ্ছে। তুমি একা পড়ে আছো, চোখ বোজা, নাকে অক্সিজেন, হাতে স্যালাইন। নিশ্বাস নেওয়ার জন্য যুদ্ধ করেই যাচ্ছে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হচ্ছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। সকালের দিকে একটা ভিড় হয়েছিল তোমার পাশে, সেই ভিড় হালকা হয়ে গেল। কার সময় আছে মৃত্যু দেখার জন্য অত সময় অপেক্ষা করার। তুমি মরে গিয়ে ওদের সময় যদি বাঁচাতে, খুশি হত ওরা। আমি স্তব্ধ বসে আছিমা। তোমাকে খাওয়াবার, পেচ্ছাব পায়খানা করাবার, গা মুছিয়ে দেবার, কাপড় পাল্টে দেবার কোনও কাজ আমার নেই। কাউকে ডেকে এনে তোমার সঙ্গে দেখা করাবার নেই। তোমার মন ভালো করার জন্য নানারকম আয়োজন করারও কিছু নেই। আমি শুধু স্তব্ধ বসে আছি। স্তব্ধ বসে আছি শুধু। মা, তুমি একা একা কষ্ট পেয়ে যাচ্ছো। তুমি হারিয়ে যাচ্ছো। সন্ধে হলে টেলিভিশন ছাড়া হল। শুভ আর সৌখিন দেখবে। বাবাও বোধহয়। নাকি বাবা তোমার দাফন কাফন নিয়ে দাদার সঙ্গে ক্রমাগতপরামর্শ করে যাচ্ছে কে জানে। টেলিভিশনের নাচ গান বিজ্ঞাপনের শব্দের নিচে হারিয়ে যাচ্ছে তোমার শ্বাস কষ্টের শব্দ। জানি না কেন বারান্দায় গিয়ে স্তব্ধ রাত্তিরের দিকে তাকিয়ে আমি মা মা মা বলে চিৎকার করলাম। ওই বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই শৈশব থেকে মা মা বলে ডেকেছি, আর যেখানেই ছিলে তুমি, রান্নাঘরে, শোবার ঘরে, ছাদে বা উঠোনে, ডাক শুনে ছুটে এসেছে। আর যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি চিৎকার করে তোমাকে ডাকছি, বাড়ির সবাই শুনছে, পাড়াপড়শি শুনছে, পথচারি শুনছে, একেবারে কাছের ঘরটায় শুয়ে আছো তুমি, শুধু তুমিই শুনছে না।
বাবা তখনও বৈঠক ঘরে ব্যস্ত দাদার সঙ্গে প্রতিদিনের মতো খুঁটিনাটি আলোচনায়। কাকে কাকে খবর দিতে হবে, কী করতে হবে। বাড়ির কারও চোখে জল নেই মা, না, আমার চোখেও নেই। সত্যি বলছি মা, আমি চাইছিলামও তুমি ওই শ্বাস আর না নাও। কারণ ওই শ্বাস তোমাকে শ্বাস ফিরিয়ে দেবে না। অক্সিজেন কি খুলে দেব? স্যালাইনের নলে আর কি ধীরে ধীরে ঢালবো না ওষুধগুলো! ভাবি ঢালবো না, কিন্তু না ঢেলেপারি না। যতক্ষণ বেঁচে থাকতেপারো, যেভাবেই পারো, বাঁচো। জীবন তো একটাই মা, পরকাল বলে কিছু আছে বলে যদিবিশ্বাস করতাম, তোমাকে বিদায় দিতে কোনও কষ্ট হত না।
বাবা তোমার দশ বছর বয়স থেকে তোমার সঙ্গে। এত বছর মানুষটার সঙ্গে এক বাড়িতে কাটিয়েছে বাবা, কোনওদিন ভালোবাসেনি বরং সারাজীবন কষ্ট দিয়েছে। যে অসুখটা সারাতে চাইতে, সেই অসুখের কথায় বাবা মুখ ভেংচে টিটকিরি দিয়েছে তোমাকে, সেই অসুখে চিকিৎসাহীন অবস্থায় আজকে তুমি মারা যাচ্ছ, আর একটু পরেই সব কষ্ট সব যন্ত্রণার অবসান হবে। বাবা আজ কী করে স্থির থাকছে, তোমাকে মাটিতে পুঁতে দেওয়ার পরিকল্পনা করে যাচ্ছে, আমি ভাবতে পারি না। মানুষের দীর্ঘ বছরের সম্পর্ক কি এমনই ঠুনকো হয় নাকি হতে পারে! সম্পর্ক নামের জিনিসটা তবে কী! দাদার চোখেও তো একফোঁটা জল নেই। এই দাদাকে শিশু ছিলে যখন, বা অল্প বয়সি কিশোরী ছিলে, জন্ম দিয়েছিলে, এই দাদার কারণে তুমি তোমার শৈশব কৈশোর কিছুই উপভোগ করতেপারোনি। দাদাকে আনাড়ি হাতে একা একা মানুষ করেছো। সেই তুমি চলে যাচ্ছ, অভাগা তুমি। দাদার চোখে জল নেই, দাদা ব্যস্ত তোমাকে মাটিতে পুঁতে ফেলার আয়োজনে, কাকে কাকে জানাজায় খবর দেবে তার তালিকা তৈরি করছে। ফকরুল মামা ঢাকা থেকো এলো রাতে, এসেই শ্বাসকষ্ট হতে থাকা অচেতন তোমাকে দেখলো। দাদার ঘরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কেঁদেছে কেন সে দেরি করলো, কেন আগে সে এলো না, বলে বলে। এ বাড়িতে প্রথম একজন কেউ কাঁদলো। অন্তত একজন মানুষের কান্নার শব্দ আমাকে স্বস্তি দেয় মা। আসার তো ফকরুল মামার কথাই ছিল, তাকে পাঁচশ টাকা তোমার হাত দিয়েই গাড়িভাড়ার কথা বলে দিয়েছিলাম, যেন আসে তোমাকে দেখতে। এলো, সে যে এলো তুমি দেখতে পেলে না। ফকরুল মামার টাকার অভাব নেই, তারপরও আমি ভেবেছিলাম যদি কখনও আবার ভেবে বসে যে আসবে না, গাড়িভাড়াটা হাতে থাকলে অন্তত একটা তাগাদা থাকবে আসার জন্য, তাই দেওয়া। ঝুনু খালা আসেনি। বড় মামাও না। তোমাকে এখন দেখতে এসেই বা কী লাভ! তোমার মৃত্যু দেখতে কি মানুষকে আসতে বলেছিলাম! তখনই তোমার প্রয়োজন মানুষের উপস্থিতর, যখন কথা বলতে পারতে, কাছের মানুষদের কাছে পেয়ে ভালো লাগা পেতে পারতে। এখন কী দরকার! সারাজীবন তো মানুষ তোমার অনেকটা বেঁচে-না-থাকার মতো বেঁচে থাকা দেখেছে। মৃত্যুময় জীবন দেখেছে। এখন তাকিয়ে তাকিয়ে তোমার মৃত্যু উপভোগ করার প্রয়োজন কেন তাদের! মারা যখন যাচ্ছোই, একা একাই যাও। সবাইকে এত দুঃসহ দুর্ভোগ দেখাবে কেন! সারা জীবন ধরে তারা তো দেখেইছে যা দেখার। একটা সময়, মা, আমি কিছু আর উপলব্ধি করি না। আমি তাকিয়ে থাকি তোমার দিকে। মানুষগুলোর দিকে। বাইরের কালো উঠোনের দিকে। বাবা আর দাদার আলোচনার দিকে। হাসিনার হাসি হাসি মুখের দিকে। শুভ আর সৌখিনের প্রতিদিনের রুটিনের দিকে।
