তুমি মারা যাচ্ছো, আমি সতর্ক করে দিতাম সবাইকেই যারাই তোমাকে দেখতে আসতো। কিন্তু কে শোনে কার কথা! আমাকে নিতান্তই অবুঝ একটা মেয়েমানুষ বলে ভাবে। যে মেয়েমানুষ মত্যুর আগে আগে কী করতে হয় জানে না। জানে না, মত্যুপথযাত্রীর কাছে নিজেরা যত অপকর্ম এ যাবৎকরেছে, সব কিছুর জন্য মাফ সাফ চেয়ে সাফসুফ হয়ে থাকতে হয়। এখন তুমি ওপরে যাচ্ছো, ওপরে তুমি আল্লাহর কাছে তাদের বেহেসতের জন্য তদবির করবে, তাদের সালাম পৌঁছে দেবে পয়গম্বরকে! স্বজনপ্রীতিটা ভালো চলে পরকালে, তাই তোমার কাছে ধর্না দেওয়া। আমি অবুঝ মেয়েমানুষ, আমি চাই না তুমি একটুও টের পাও যে তোমার দিন ফুরোচ্ছে।
একদিন আমানুদ্দৌলার বউ এসেছিলো ছেলেমেয়ে নিয়ে। আমাণুদ্দৌলার বউএর নজর আমার দিকে। তুমি কেমন আছো, কেমন বোধ করছো, এ নিয়ে তার কোনও উৎসাহ নেই। ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে শুরু করলো তার সংসারের নানা সমস্যার কথা। তার মেয়ে জুয়েল কলেজ পাশ করেছে, এখন ওর জন্য একটা চাকরির ব্যবস্থা আমার না করে দিলেই নয়। আমাণুদ্দৌলার বউ ক্রমাগত বলেই চললো এক কথা। আমি তাকে আমি কী করে চাকরির ব্যবস্থা করবো, আমার তো এই ক্ষমতা নেই’ বলার পরও সে থামলো না। ‘ঠিক আছে চেষ্টা করবো’ বলেও থামাতে পারি না তাকে। তুমি তখন বউএর দিকে তাকিয়ে বললে, ‘এত চাই চাই কেন তোমাদের! একটু মানবিক হও, একটু নিঃস্বার্থ হও।‘ না, মা। তোমার এই উপদেশের মর্মার্থ বোঝা তার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি খসরুকে চিঠি লিখে দিয়েছিলাম জুয়েলকে একটা চাকরি দেওয়ার জন্য। খসরু তাকে চাকরি দিয়েছে। জুয়েল ঢাকা শহরে বহাল তবিয়তে আছে। নিঃস্বার্থ ওরা কেউ হয়নি মা। চাকরি পাওয়ার পর আমাকে ওরা খবরটাও দেয়নি যে চাকরি পেয়েছে। বছর কয়েক পর দাদা কথায় কথায় বলেছিলো যে জুয়েল খসরুর বিশাল অফিসে বেশ ভালো মাইনের চাকরি করছে।
একদিন আমাণুদ্দৌলা এলো। তোমাকে আগে জিজ্ঞেস করে নিলাম, তুমি ওর সঙ্গে দেখা করতে চাও কিনা। কাছের আত্মীয় ছাড়া অন্য কেউ এলে জিজ্ঞেস করে নিই তোমাকে। আমাণুদ্দৌলার সঙ্গে আদৌ দেখা করতে না চাইলে তাকে দেখা করতে দেব না, সে যত বড় প্রেমিকই হোক না কেন। তুমি মাথা নেড়ে বললে, হ্যাঁ। আমাণুদ্দৌলাকে ঘরে ঢুকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। খুব বেশিক্ষণ সে থাকেনি তোমার ঘরে। আমি চেয়েছিলাম আরও কিছুক্ষণ থাকুক, আরও কিছুক্ষণ তোমার হাত ধরে সে বসে থাকুক, আরও কিছুক্ষণ সে দীর্ঘশ্বাস ফেলুক, আরও কিছুক্ষণ সে, যদি ভালোবাসে, বলুক ভালোবাসে।
.
তুমি যেহেতু এক ফোঁটা জলও আর খেতে পারছিলে না, তোমার নাকে নল ঢোকালাম তরল খাদ্য খাওয়ানোর জন্য। তোমার অসহ্য লাগতো ওই নাকের নল। কিন্তু তোমাকে আদর করে পেটে কিছুনাপড়লে তুমি যে শরীরে শক্তি পাবে না বলে বলে রাজি করালাম। রাজি তুমি তোমার জন্য নয়, আমার জন্যই হলে। একসময় শরীরে জল শুকিয়ে এলো এত যে স্যালাইন দিতে হল। তোমার চোখ লক্ষ করছি হলুদ হয়ে উঠছে। শরীরের ভেতর কী যে হচ্ছে তোমার, ভাবলে আমার মাথা বনবন করে ঘুরতে থাকে। সারারাত জেগে থাকি, তোমার অসহ্য ব্যথা হলে পেথিডিন দেবো। সারাদিন জেগে থাকি, তাকিয়ে থাকি তোমার দিকে। তুমি পাশ ফিরতে চাইতে। কিন্তু ফিরতে গেলেই বলতে তুমি পড়ে যাচ্ছো, যেন একটু ধরি। পেট এত ফুলে উঠেছিল যে, ধীরে ধীরে এপাশ ওপাশ ফেরার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছিলে। তোমার গা মুছে গায়ে যে জামা পরিয়ে দিতাম, প্রয়োজনে তা আর পাল্টে দেওয়াও সম্ভব হচ্ছিল না। একদিন কেটে বের করে নিলাম জামা, তুমি জামা ছাড়াই রয়ে গেলে। শুধু লেপ বা কাঁথায় ঢেকে রাখলাম পেট ফুলে ওঠা তোমার কংকালসার শরীর।
এর মধ্যেই যেদিন সকালে তোমার শ্বাসকষ্ট শুরু হলো, সুহৃদকেপাঠিয়ে দিলাম নানিবাড়িতে, মামাদের সবাইকে ডেকে আনতে। সুহৃদ রিক্সা করে গিয়ে খবর দিয়ে এলো। এক এক করে মামারা সবাই এলো। তোমাকে অক্সিজেন দিলাম মা। অক্সিজেন আনিয়েছিলাম, প্রয়োজন হলে ব্যবহার করবো বলে। সেদিন প্রয়োজন হল মা। তোমার শ্বাসকষ্ট ওই অক্সিজেনে কিছুই কমলো না। ডাক্তার ডেকে আনালাম। কাছাকাছি আমার যে ডাক্তার বন্ধুরা থাকে, সবাইকেই ডেকে পাঠালাম। আমার ওপরের ক্লাসে পড়তো সেলিম, খুব ভালো ছাত্র ছিল, তাকে ডাকিয়ে আনলাম ছটকুকে দিয়ে। সবাই দেখলো, কেউ কোনও আশার কথা শোনালোনা। সবাই দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তারপরও আরও বড় ডাক্তার এলো। বললো, বাড়ির সবাই উনার কাছে বসে থাকো। সারাদিন তুমি শ্বাসকষ্টে ভুগলে। ধীরে ধীরে তুমি চেতন হারালে। ওই অচেতন অবস্থাতেও তুমি শুধু প্রাণপণে শ্বাস নিতে চাইছো। স্যালাইনে দিতে লাগলাম জীবন বাঁচানোর স্টেরোয়েড। স্টেরোয়েডেরপর স্টেরোয়েড। রাতের দিকে স্টেরোয়েড শেষ হয়ে গেল। সুহৃদকে পাঠালাম চড়পাড়ার ওষুধের দোকান থেকে আরও কিছু নিয়ে আসতে। কেন আনতে পাঠালাম মা, আমি কি বুঝতে পারছিলাম না কী হতে যাচ্ছে? পারছিলাম মা।
সকালেই যখন তোমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে দেখলাম, চিৎকার করে বাড়ির সবাইকে জানিয়েছিলাম সে কথা। শুনে দাদা ছুটে এসেছিলো, বিছানায় তোমার পাশে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর নেমে গিয়ে অযু করে পাজামা পাঞ্জাবি আর মাথায় একটা টুপি পরে এলো, হঠাৎ করে তার পোশাক পাল্টাবার কী হল, বুঝলাম না। তাহলে কি দাদা ধরেই নিয়েছে যে তুমি মারা যাচ্ছো? খানিকপর দাদা আবার নেমে গেল বিছানা থেকে। সম্ভবত যে কারণে বিছানায় তোমার মাথার কাছে বসে ছিলো দাদা, যে শেষ নিশ্বাস একেবারে নিজের চোখের সামনে দেখবে বলে, সেই শেষ নিশ্বাসটিই তুমি তাকে দেখতে দিলে না সারা সকাল। নানি সেই আগের মতোই তোমার শিয়রের কাছে বসেপড়ে যাচ্ছে কোরান। নানির চোখ থেকে জলপড়েপড়ে কোরানের লেখাগুলো ঝাঁপসা হয়ে যাচ্ছে। মামারা জোরে জোরে আসোলামু আলায়কুম ইয়া রহমতুল্লাহ না কী কী সব বলে যাচ্ছে। আমার ভয় করছিল মা, খুব ভয় করছিল আমার। যারাই দেখতে আসছিল তোমাকে, বলে যাচ্ছিল তুমি যেন তাদের সালাম পৌঁছে দাও নবীজিকে। এর চেয়ে বীভৎস কোনও দৃশ্য আমি দেখিনি কোনওদিন মা। আমি চেষ্টা করছিলাম তোমাকে আরও জীবন বাঁচানো ওষুধ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে। আমি কোনও ভগবান আল্লাহ বা কোনও রকম ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না। বিজ্ঞানে বিশ্বাস করা আমি একটি অলৌকিক কিছু চাইছিলাম, অনেকে তো মৃত্যুর দুয়ার থেকেও বেঁচে ওঠে মা। কত কেউ তো বেঁচেছে। তুমিও এরকম হঠাৎ কোমা থেকে ফিরে আসতে পারো না জগতে? সবাইকে অবাক করে দিয়ে চোখ মেলে তাকাও যদি আবার! আমি প্রকৃতির কাছে ভিক্ষে চাইছিলাম তোমাকে ফিরিয়ে দিতে, তোমার অচেতনতাকে ভেঙে দিতে। তোমার মাথা থেকে আগুন বেরোচ্ছিল, ছোট একটা ফ্যান চালিয়ে মাথা ঠাণ্ডা করতে চাইছিলাম। তোমার পায়ের পাতা দুটো বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছিল। তোমার পায়ের কাছে বসে আমি ইস্ত্রিতে কাপড় গরম করে করে সে কাপড় চেপে ধরে তোমার পা দুটো থেকে ঠান্ডা সরাচ্ছিলাম। লাভ নেই, তারপরও। তুমি কী আর বুঝতে পারছিলে তোমার শরীরের কোথাও তাপমাত্রা কমে যাচ্ছে! বাইরের তাপ দিয়ে আমি আর কতটুকু কী উষ্ণ করতে পারবো! আমার ভয় হচ্ছিল। খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছিল তোমার সঙ্গে আমার। শেফালিকে পা গরম করতে দিয়ে আমি তোমার হাত দুটো ধরে শুধু বসে রইলাম। সেই হাতে তাপ ছিল, সেই হাতে তুমি ছিলে না মা। তুমি কিছু টের পাচ্ছিলে না। হাতে তোমার কোনও জোর ছিল না। আমার খুব ভয় হচ্ছিল। খুব ভয়। সবাই ভাবছিল এই বুঝি তুমি আর নিঃশ্বাস নেবে না। কিন্তু তুমি নিচ্ছিলে। প্রাণপণে তুমি বাঁচতে চাইছিলে। শ্বাসে কোনও ছন্দ ছিল না, কিন্তু নিচ্ছিলে। তোমার শরীর কোনও আর অক্সিজেন চাইছিল না নিতে, তোমার ফুসফুস বাধা দিচ্ছিলো, কিন্তু নিচ্ছিলে তুমি। তোমার হৃৎপিণ্ড বাধা দিচ্ছিল, কিন্তু তুমি শুনছিলে না। যে করেই হোক নিচ্ছিলে। তোমার ভেতরের সব ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল, সবপচে গিয়েছিল, তোমার অন্ত্র, তোমার পাকস্থলী, তোমার যকৃত, তোমার কিডনি, কিন্তু শ্বাস নিচ্ছিলে। মানুষ তোমাকে বিদায় দিচ্ছে, তোমারই স্বামী, পুত্র, নাতি, তোমারই ভাই বোন তোমাকে বিদায় দিচ্ছে, তুমি বিদায় নিতে চাইছে না। তুমি এই পৃথিবী ছেড়ে তোমার সংসার তোমার স্বজন ছেড়ে কোথাও যেতে চাইছিলে না, মা। কার জন্য থাকতে চাইছিলে মা? এই জগৎ সংসারে তোমার কে ছিলো যে তুমি ছেড়ে যেতে চাইছিলে না? তোমার জায়গায় আমি হলে সম্ভবত মরে শান্তি পেতাম, মরে বাঁচতাম। ভালোবাসা বুঝি তোমার দেবার কিছু বাকি ছিল আমাদের যে থেকে যেতে চাইছিলে?
