.
লিলি আর লিলির মার কাছেও ক্ষমা চাওয়ার ইচ্ছে ছিল তোমার। পাওনা টাকাগুলো দিতে চেয়েছে ওদের। পারোনি। তোমার এই একটি চাওয়া আমি মেটাতে পারিনি। দুলুর মাকেও পারিনি, আনুর মাকেও পারিনি আনতে। অবশ্য ওদের দেখা পাওয়া গেছে, তখন খুব দেরি হয়ে গেছে। আহা, মা, যদি একবার ওদেরও নিজের হাতে কিছু টাকা দিতে পারতে। তোমার যে দেওয়ার হাত ছিল, কিন্তু হাতে কিছু ছিল না, সেই তোমার হাতে জীবনে প্রথম টাকা এলো। প্রচুর টাকা। তুমি গুনেও দেখতে পারোনি। এত টাকা তুমি বোধহয় গুনতেও জানতে না। জীবনে একটি টাকা, একটি মাত্র টাকার জন্য হাত পেতেছো স্বামী সন্তানদের কাছে। বেশির ভাগ সময়ই পাওনি। এখন তুমি ভুলে যাও তোমার নিজের হাতব্যাগে অগুনতি টাকা। তুমি মুঠোর মধ্যে সে টাকা তোলো। কিন্তু লক্ষ করেছি তুমি ওই টাকার কিছুআর অনুভব করো না। টাকা আর আবর্জনার বাক্সের কোনও বাতিল কাগজের মধ্যে কোনও পার্থক্য করতে পারো না। ওই টাকা তোমাকে সুখ দেয় না। নিজের জন্য কিছু তো চাওনি কোনওদিন। অন্যের জন্য চেয়েছিলে। প্রতিরাতে ঘুমিয়ে পড়ছো মাথার কাছে কয়েক লক্ষ টাকার ব্যাগ রেখে। টাকা তোমাকে আর আকর্ষণ করে না। ও টাকা দুর্বল দুটো হাতে ঠেলে সরিয়ে দাও। ডিম, দুধ, কলা এই তিনটি জিনিস খেতে চাইতে তুমি স্বাস্থ্যের জন্য। পেতে না। আর এই তিনটি তোমার সামনে অঢেল এখন, খেতে পারো না তুমি মা। কিছুই তুমি মুখে নিতে পারো না। দুর্গন্ধ সবকিছুতে। তোমার প্রিয় ডিম, প্রিয় দুধ মুখের কাছে ধরছি। তুমি মুখ সরিয়ে নাও। লিভারে যার ক্যান্সার ছড়িয়েছে, তার তো খাওয়া ফুরোলো মা, সে কি আমি বুঝি না! কিন্তু তারপরও প্রথম দিকে খেতে চাইতে তুমি। ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাইতে। বাঁচতে চাইতে। এত মনোবল তোমার কোথায় ছিল! ছিল সব সময়, কিন্তু ওই মনোবল নিয়ে কোথাও পোঁছোতে পারোনি। যে মানুষগুলো তোমাকে তোমার নিজের পায়ে দাঁড়াতে দেয়নি, তারা তোমার চেয়েও অনেক শক্তিমান। তুমি নিরীহ নিরুপদ্রব নারী। তুমি পারোনি শক্তিমানদের সঙ্গে একা যুদ্ধ করে জিততে। তোমার এই হাঁমুখো অসুখের বিরুদ্ধে তুমি একাই দাঁড়িয়েছে।
একদিন, হঠাৎই একদিন, ঝিমিয়ে থাকা তুমি হঠাৎ জেগে উঠলে। তোমার ক্ষিধে পেলো প্রচণ্ড। তুমি ভাত খেতে চাইলে। মাছ মাংস যা আছে সব দিয়ে ভাত। যে তুমি সামান্য তরল পদার্থও মুখে নিতে পারছে না, সে তুমি ভাত খাবে। প্রায় প্রতিদিনই লোক পাঠিয়ে বাজার করছি আমি। একদিন শুভ আর সৌখিনের জন্য বাবা কিনে আনলো এক ডজন বাচ্চা মুরগি। বাবার কাছ থেকে নিয়ে মুরগিগুলো দেখালাম তোমাকে, বললাম বাবা তোমার জন্য কিনেছে। দেখালাম এই জন্য যে যেন তুমি ভাবো কেবল আমি নই, বাবাও তোমার জন্য ভাবছে, তোমাকে ভালোবেসে তোমাকে ভালো স্যুপ খাওয়ানোর জন্য বাজার করছে বাবা। একটু যেন তুমি খুশি হও। কোনওদিন তো বাবা তোমার জন্য কিছু কেনেনি। কোনওদিন চায়নি তুমি ভালো কিছু খাও। কখনও কি মুরগির কোনও ভালো টুকরো নিজে তুমি নিজের পাতে নিতে পেরেছো! বাবার ভয়েই পারোনি কোনওদিন। তুমি নিজে খাবে না, অন্যকে খাওয়াবে, তাইতো সবাই চাইতো। মিথ্যে করে হলেও তুমি জানলে যে বাবা চাইছে তুমি ভালো খেয়ে নেতিয়ে পড়া শরীরে শক্তি অর্জন করো, সুস্থ হয়ে ওঠো। বাবার ভালোবাসা তুমি সারাজীবন প্রার্থনা করেছো, পাওনি। অন্তত একবার জেনে স্বস্তি পাও, শুধু আমি নই, বাড়ির সবাই তোমাকে ভালোবাসে। মিথ্যে করে হলেও জানো, মা। বৈঠক ঘরে বসে বাবা আর দাদা দুজন পা নাড়িয়ে নাড়িয়ে কানা কানি করছে, আমার আদিখ্যেতার নিন্দে করছে। তারপরও আমি বাবাকে আর দাদাকে অনুরোধ করেছি টেলিভিশনের সামনে না বসে তোমার সামনে বসতে। টেলিভিশন তারা অনেকপাবে, তোমাকে পাবে না। বলি তোমাকে পুরোনো দিনের কথা বলতে, কোনও সুখের স্মৃতি যদি তোমাকে নিয়ে তাদের থাকে, বলতে। বলতে, যে, তুমি সুস্থ হয়ে উঠবে, বলতে যে, তোমাকেতারা ভালোবাসে। হোক না মিথ্যে, তারপরও। অন্তত হাতে গোনা যে কটা দিন তোমার আছে, তুমি সুখ পাও। কিন্তু অত কি সহজ এই সহজ কাজটি। কারও সময় নেই। বাবা চেম্বারে যাবে, রোগী দেখার নেশা। তোমার অসুখের কথা বলে বাবাকে থামানো যায়নি। বাবার নিজের শরীর ভালো নয় বলেও বাধা দিয়েছি। কিন্তু কোনও বাধাই কাজে লাগেনি। যে গাড়িটি বাবার জন্য কিনেছিলাম, সেই গাড়ি বাবা কোনওদিন চড়েও দেখেনি। শত বলেও বাবাকে ও গাড়ি দিয়ে চেম্বারে নেওয়াতে পারিনি। বাবাকে কিনে দেওয়া গাড়িটি এখন দাদার। সবাই বলে, দাদার গাড়ি। দাবি করতে ওদের কারও লজ্জা হয় না, বরং প্রতিবাদ করতে লজ্জা হয় আমার। যেদিন তোমার ক্ষিধে পেলো প্রচণ্ড, রান্নাঘরে গিয়ে কাজের লোকদের বারবারই তাগাদা দিলাম যেন রুই মাছের একটি টুকরো হলেও তোমার জন্য তাড়াতাড়ি রান্না করে দেওয়া হয়। কোথায় পাবো মাছ! মাছ রান্না হতে দেরি হবে হাসিনা জানিয়ে দিল। এখন শুভ আর সৌখিনের জন্য মুরগি রান্না হচ্ছে। মুরগি তো চিরকালই রান্না হবে, তোমার জন্য মাছটা আগে করে দিক। ভাত রান্না হয়েছে? হয়নি। ডাল? না, তখনও না। শুভ আর সৌখিনের জন্য আলাদা যে খাবার, সেগুলো আগে রান্না হচ্ছে। তারপর অন্য সবার রান্না শুরু হবে। রান্নার লোককে বললাম, সব বন্ধ করে মার জন্য ভাত, ডাল, আর রুইমাছের তরকারি তাড়াতাড়ি যেন রান্না করে দেয়। কিন্তু আমার নির্দেশ মানার কোনও লক্ষণ আমি কারও মধ্যে দেখি না। রান্নার লোকের কথায় এবং আচরণে বুঝি যে হাসিনা যা আদেশ করবে, তাই পালন করবে ওরা। আমার বা তোমার, অবকাশ নামের বাড়িতে কোনও অধিকার নেই। একসময় দেখি, হাসিনা তোমাকে মুখে তুলে খাওয়াচ্ছে, বাসি কাঁচকি মাছ, বাসি ডাল আর বাসি ভাত। আমি হতবাক দাঁড়িয়ে রইলাম, যদি আমি তখন বলি যে হাসিনা তোমাকে বাসি জিনিস খাওয়াচ্ছে, তুমি মনে কষ্ট পাবে বাসি জিনিস তোমাকে খাওয়ানো হচ্ছে বলে, তাই চুপ করে জানালার দিকে তাকিয়ে আমি বসে রইলাম। ক্ষুধার্ত তোমার দিকে, একটু ভাত খাওয়ার জন্য তোমার ব্যগ্রতার দিকে আমি তাকাতে পারছিলাম না। আমি তোমাকে বলিনি যে হাসিনা ইচ্ছে করলেই আজকের রুই মাছটা রান্না করার জন্য বলতে পারতো, বলেনি। মা, ওই খাওয়াই তোমার শেষ খাওয়া ছিল। তোমার জীবনের শেষ ভাত, শেষ মাছ, শেষ ডাল। খাবার সময় যখন রুইমাছ আমার থালায় এলো, গরম ভাত এলো, নতুন রান্না করা ডাল এলো, আমি খেতে পারিনি। কেউ লক্ষ করেনি আমার ওই ভাত, ডাল আর মাছের টুকরোর ওপর আমার চোখের জল টুপটুপ করে পড়েছে। কে লক্ষ করবে, সবাই তো পা নাচিয়ে গল্প করছে নয়তো টেলিভিশন দেখছে। টেলিভিশনের শব্দ শুনলে আমার খুব রাগ হতো। আমার রাগ দেখে শুভ, হাসিনা, দাদা-সবাই রাগে ফুঁসতো। আমি তোমার ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখতাম, যেন শব্দ কম আসে। দেখ তোমরা নাচ নাটক যা কিছু, শব্দটা কমিয়ে রাখো, মা যেন না বোঝে যে পাশের ঘরে উৎসব চলছে। মা যেন বোঝে বাড়ির সবাই মার জন্য কাঁদছে। অবশ্য আমার রাগ হওয়ায় বা দুঃখপাওয়ায় কারও কিছু যায় আসেনি। তুমি এক ঘরে দিন দিন একটু একটু করে মরে যাচ্ছো, পাশের ঘরে টেলিভিশন চলেছে, যে কোনও দিনের মতোই চলেছে। ভাবলে এখনও আমার বুকের ভেতরটা কাঁপে। আমার বেলায় যদি এরকম হত মা! আমি চাইনা এরকম কোনও কদর্য দৃশ্য দেখতে। তার চেয়ে পাশের ঘরে টেলিভিশনের শব্দ, আর হৈ হুল্লোড় আনন্দের শব্দ শুনতে শুনতে আমি একা একা নিঃশব্দে মরেও শান্তি পাবো, যদি জানি যারা আনন্দ করছে তাদের কাউকে আমি চিনি না, তারা কেউ আমার আত্মীয় নয়, তারা কেউ স্বজন নয়, কাউকে আমি কোনওদিন ভালোবাসিনি। আপন নয় তারা, যদি আপন হতো, দৃশ্য অন্যরকম হতো।
০৬. কাকারা এলো একদিন
কাকারা এলো একদিন। গ্রাম থেকে আরও কয়েকজন এসেছিলো তোমাকে দেখতে। তোমার চেয়ে বয়সে বড়রা দিব্যি সুস্থ বেঁচে আছে। অতিথিদের বসার জন্য যে চেয়ার রেখেছিলাম তোমার সামনে, সেখানে বসে রিয়াজউদ্দিন কাকা বললো, ভাবী, মাফ সাফ করে দিয়েন। শুনে আমার কী যে রাগ হল। তোমাকে বুঝিয়ে দিতে চাইছে যে তুমি মারা যাচ্ছে। তাই মাফ চাইতে এসেছে। সারাজীবন তুমি এদের মাটির চুলোয় কুঁকনি ফুকে, গায়ে কাপড়ে কালি ঝুলি লেগেছে খেয়াল করোনি, রান্না করে খাইয়েছে। বিনিময়ে কারও কাছ থেকে কোনওদিন কিছু পাওনি। রিয়াজউদ্দিন কাকা যাওয়ার সময় তার শুকনো চোখদুটো অযথাই ডলতে শুরু করলো, আর একটা দীর্ঘশ্বাসও ফেললে আমাকে দেখিয়ে, দীর্ঘশ্বাসটা নকল, বুঝি। তোমাকে যেন কেউ বুঝতে না দেয় যে
