ছোটদা পরদিনই চলে যায়। তোমার শরীর দ্রুত খারাপ হচ্ছে, ছোটদা যেন আরও পাশে থাকে, যেন চলে না যায়, আমার অনুরোধ ছোটদাকে অবকাশে রাখতে পারে না। আমার টয়োটা গাড়ি নিয়ে আসে, ওই গাড়ি নিয়েই বেরিয়ে যায় ঢাকার পথে। সবাই ভুলে গেছে, এমন কী ছোটদাও, যে, গাড়িটা আমার, ভুলে গেছে শান্তিনগরের বাড়িটাও আমার। সবাই কথাই বলে এভাবে, ‘কামাল তোর গাড়ি কোথায় পার্ক করলি? ’ বা ‘তুমি কি তোমার ঢাকার বাড়িতে সেদিন ছিলে?’ না আমার আড়ালে নয়, বাক্যগুলো আমার সামনেই উচ্চারিত হয়। আমি বুঝি, সময় অনেক কিছু পাল্টে দিয়েছে। আমি এ দেশে এ বাড়িতে, এ পরিবারে অনেকটাই অবাঞ্ছিত। কেবল তোমার কাছেই বাঞ্ছিত, কেবল তুমিই আমাকে সমস্ত জীবন দিয়ে চাইছ, সমস্ত জীবনের বিনিময়ে চাইছ। এই চাওয়ার মধ্যে এক ফোঁটা ফাঁকি নেই।
.
রোজার সময় তখন। টুটু মামা রোজা রাখতো। সারারাত সে নাকি আল্লাহনাম জপ করে। শুনে আমিই তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম তোমার পাশে রাতভর যেন তাই করে। সন্ধেবেলায় এসে টুটু মামা সারারাত জেগে থাকতো, সকালে বাড়ি চলে যেত ঘুমোতে। টুটু মামার বাড়িতে আসা দাদা পছন্দ করতো না। দাদার কাছ থেকে কবে নাকি টুটু মামা টাকা ধার করেছিলো, সে টাকা আর ফেরত দেয়নি। সে কারণেই টুটু মামার ছায়াও সহ্য হত না দাদার। টুটু মামা টাকা ফেরত দেয়নি। তাতে কী! পারেনি ফেরত দিতে, তাই ফেরত দেয়নি। বাবার কানে টুটু মামা সম্পর্কে যত রাজ্যির মন্দ কথা আছে, দাদা দেয়। বাবার মনও টুটু মামা থেকে সরিয়েছে দাদা। বাবা, আমি লক্ষ করেছি, আগে যেমন মামাদের সঙ্গে গল্প করতো, তেমন আর করে না। হাশেম মামা শুনেছি লিভারের ক্যানসার নিয়ে বাবার চেম্বারে বসে থাকতো। একটু যেন ওষুধ বাবা দেয়। জানি না বাবা কতটুকু সাহায্য হাশেম মামাকে করতো। মামাদের সম্পর্কে বাবার অভিযোগ যত থাক, নিজের কোনও দুর্যোগ এলে মামাদেরই বাবা সবসময় কাছে ডাকতো। হাশেম মামা তোমাকে বলেছিলো আমি যেন তার জন্য কিছু টাকা পাঠাই। আশ্চর্য, মা, কোনও টাকা আমি পাঠাইনি। পরে অবশ্য তার ছেলে সুমনকে পঞ্চাশ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলাম, তখন হাশেম মামা আর বেঁচে নেই। হাশেম মামাকে সুইডেনে এনে চিকিৎসা করার জন্য ভিসার ব্যবস্থাও করেছিলাম। হাশেম মামার আর আসা হয়নি। মামার কথা ভাবলে এখনও বুকের ভেতরে একটা চিনচিন কষ্ট হয় আমার। মুক্তিযোদ্ধা ছিল হাশেম মামা। কী সুন্দর দেখতে ছিল। কী রকম সুঠাম সুদর্শন যুবক। টুটু মামার সঙ্গে তার সুন্দরী বউএর কোনও একদিন প্রেম হচ্ছে ধরা পড়ার পর সেই যে হাশেম মামা দাড়ি কাড়ি রেখে উদাস হয়ে গেল, আর ফিরে এলো না হৈ চৈ এ। টুটু মামাকে তুমিও চাইতে থাকুক। সারারাত সে সুর করে করে সুরা পড়ে, সে সুর বড় মধুর লাগে। টুটু মামাকে রাতের শেহরি খাওয়ার ব্যবস্থা নিজের উদ্যোগে করি। তোমাকে যে মনে শান্তি দিতে পারছে, তাকে খুশি করতে আমি তখন সব করতে রাজি। বাবা আর দাদার ধারণা টুটু মামা কোনও বদ উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে আসে। ঝুনু খালাও একদিন কানে কানে বলে গেল, টুটু মামা নাকি অসুস্থ হাশেম মামাকে একদিনের বেশি দেখতে যায়নি। তোমার অসুখে তার মতো পাষণ্ডর দুঃখ হওয়ার তো কিছু নেই। এই দুঃখটা নাকি বানানো, এখানে ভেড়ার উদ্দেশ্য, আমার কাছ থেকে বড় অংকের একটা টাকা দাবি করা। না, মা। এসব আমার বিশ্বাসহয়নি। তোমার এগারো জন ভাইবোনদের মধ্যে একজনের সঙ্গে আরেকজনের যেমন বন্ধুত্ব ছিল, শত্রুতাও ছিল, তোমার সঙ্গে কারওরশত্রুতা ছিল না। তুমি সবাইকে ভালোবাসতে। সবাই তোমাকে ভালোবাসতো। টুটু মামার যে উদ্দেশ্যই থাকুক, তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় আমার মন ভরে থাকে। তার কাছ থেকে যা পেয়েছি, সে পাওয়া অমূল্য। কোনও টাকায় আমি তার ঋণ শোধ করতে পারবো না। কোনও লক্ষ টাকা দিয়েও না।
.
তোমার চৈতন্য ফিকে হচ্ছে খুব দ্রুত। আগের চেয়ে অনেক বেশি ঝিমোচ্ছো, অথবা ঘুমোচ্ছো। তোমাকে শারীরিক কোনও সুস্থতা দিতে আমি পারছি না। শারীরিক কোনও সুস্থতা দিতে কোনওদিনই পারিনি। তোমার অসুখের দিকে তোমার মৃত্যু হবে জানারপর শুধু ফিরে চেয়েছি। আমি মরিয়া হয়ে উঠছি, যতটুকুসুখী করতে তোমাকেপারা যায়, করতে। জিজ্ঞেস করছি তোমাকে, কাকে কাকে তোমার দেখতে ইচ্ছে করে বলল, কার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে, কে কাছে এলে তোমার ভালো লাগবো। তুমি যাদের নাম বলেছে, সবাই দরিদ্র, বস্তির লোক, গ্রামের অভাবী লোক। জ্যোৎস্নাকেতুমি দেখতে চাইলে। জ্যোত্সা একসময় কাজ করতো অবকাশে। ইয়াসমিনের মেয়ে ভালোবাসাকে যখন লালন পালন করতে তুমি, জ্যোৎস্না তোমাকে সাহায্য করতো। জ্যোৎস্নাকে ইয়াসমিনের শ্বশুর বাড়ির কেউ দিয়েছিলো। সানকিপাড়া থেকে ইয়াসমিনের শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের ডেকে এনে অনুরোধ করলাম, জ্যোৎস্নাকে নিয়ে আসতে। ওরা বললো, সম্ভব নয়। জ্যোৎস্না গ্রামে চলে গেছে, ওর ঠিকানা কেউ জানে না। কিন্তু আমার উপর্যুপরি অনুরোধ যে করেই হোক খুঁজে আনতেই হবে জ্যোৎস্নাকে। লোককে গাড়ি দিয়ে, টাকা দিয়ে একদিন নয়, দিনেরপর দিনপাঠাচ্ছি। গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে জ্যোৎস্নাকে খুঁজতে হবে। জগতের যেখান থেকে হোক, জ্যোৎস্না নামের মেয়েকে নিয়ে আসতে হবে। শেষপর্যন্ত জ্যোৎস্নার খোঁজ মেলে। কোনও এক গহন গ্রাম থেকে ওকে নিয়ে আসা হল। একই রকম কোনও ঠিকানা না জানা ঠিকানায় পাঠিয়ে দিলাম ফকরুলকে, লিলি বা লিলির মাকে খুঁজে আনতে। দুতিন গ্রাম তন্ন তন্ন করেও লিলির মার খোঁজ পাওয়া যায়নি। তুমি জ্যোৎস্নাকে দেখে ঝরঝর করে কাঁদলে। ওকে কাছে ডেকে বুকে জড়িয়ে রাখলে। কোনও একদিন কী কারণে জ্যোৎস্নাকে তুমি মেরেছিলে, তাই তার কাছে আকুল হয়ে ক্ষমা চাইলে। চোখের জলে নিজের মুখ বুক ভিজিয়ে ক্ষমা চাইলে তুমি। জ্যোৎস্নাকে শাড়ি দিলে, টাকা দিলে, যা ওর পাওনা ছিল, তার চেয়েও অনেক বেশি দিলে। জ্যোৎস্নার হাত ধরে জানতে চেয়েছো, ও তোমাকে ক্ষমা করেছে কি না। জ্যোৎস্না খুব অবাক হয়েছে কিসের ক্ষমা, কেন ক্ষমা। লোকের বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে লাথিঝাঁটা খেয়েই জীবন কাটে। কেউ তাদের কাছে কোনও অন্যায়ের জন্য ক্ষমা চায় না। ক্ষমা তো আছেই, তারপর না চাইতেই এত টাকা পেয়ে যাওয়া! সবই ছিল জ্যোৎস্নার জন্য অবিশ্বাস্য। ওকে রাতের খাবার খাইয়ে দিতে বললে। বাড়িতে আমি এমন ব্যবস্থাই করেছি। কেউ যেন না খেয়ে না যায়। তোমার আত্মীয় স্বজনের এ বাড়িতে খাওয়ার চল খুব ছিল না। আমি কাউকে না খেয়ে দুপুর বা রাতে যেতে দিচ্ছি না। তোমার ভাই বোন, তোমার যে আত্মীয়ই আসছে, সবাইকে খাওয়াচ্ছি। তোমাকে বলছি, সবাইকে খাইয়ে দিচ্ছি। একদিন শরাফ মামার গোটা পরিবারকেই তোমার বিছানার সামনে শীতল পাটিয়ে বসিয়ে তুমি যেন দেখ, যত্ন করে খাইয়েছি। আমার টাকায় মাছ মাংসের বাজারও তাই করছি, যেন অধিকার থাকে যাকে ইচ্ছে খাওয়ানোর। আসলে মা, খাওয়া তো সবার বাড়িতে আছে। তোমার ভাই বোনেরা বাড়ি গিয়ে এ বাড়ির খাবারের চেয়ে ভালো খাবার খেতে পারবে, কিন্তু ওই আপ্যায়ন, ওই যে বসিয়ে খাওয়ানো, ও করেই আমরা আদর বোঝাই, বোঝাই যে ভালোবাসি। তুমি যেমন অতিথিপরায়ণ, আমিও তেমন। তাই ওদের যখন আদর করে ডেকে খেতে বলি, আমি অভিনয় করি না। মামাদের সঙ্গেই আমার শৈশব কৈশোর কেটেছে। ওদের সঙ্গে হাজার বছর পর দেখা হলেও মনে হয় যেন প্রতিদিনই দেখা হয়। শরাফ মামার ওপর আমার যে রাগ নেই, তা তোমাকে বোঝানোর প্রবল ইচ্ছে আমার। তুমি যে থালায়, বা বাটিতে, বা কাপে খাচ্ছিলে, অতিথিরা যেসবেখাচ্ছিল, চেয়েছিলাম সেগুলো খুব সুন্দর দেখতে হোক। যে তালাবন্ধ আলমারিতে থালাবাটি থাকে, সেগুলোর চাবি চেয়েছি, ওগুলো বের করবো বলে। যা কিছু সুন্দর ওখানে, ওই আলমারিতে, তার প্রায় সবই আমি কিনে দিয়েছিলাম দাদাকে, যখন জার্মানি গিয়েছিলো। সেগুলোই সাজিয়ে রাখা। কিন্তু হাসিনা আমাকে চাবিও দেয়নি, নিজেও সব বের করে দেয়নি। দুটো বাটি বের করে আলমারি বন্ধ করে বললো, এত নাড়াচাড়ায় ভেঙে যেতে পারে। মানুষ কী করে এত কুৎসিত হতে পারে, আমি বুঝি না। মানুষ যে এই তুচ্ছ বিষয় আশয় ছেড়ে, পার্থিব সব কিছু ফেলে চিরতরে চলে যায়, তা চোখের সামনে দেখেও তারা কেন এসবই আঁকড়ে পড়ে থাকে, কিছু বুঝি না এর।
