.
মা, জগৎটা যে কী নিষ্ঠুর, তা নিজেই তো দেখেছো। তোমার আদরের ধন কামালকে পাওনি খুব বেশি বছর, অল্প বয়সে বিয়ে করে গীতার সম্পত্তি হয়ে গিয়েছিল, সেই আদরের ধনকে প্রাণ ভরে সেবা করার জন্য হাতের কাছে জীবনের শেষ কটা বছর পেয়েছিলে তুমি। কী ভালোই না বাসতে। অথচ মা, আমি তোমার সেই আদরের ধনকে চেয়েছি তোমার কাছে এসে বসুক, একটু তোমার সুখ হোক। ঢাকায় যখন শয্যাশায়ী তুমি, ছোটদাকে শত বলেও বসাতে পারিনি কাছে। ছোটবেলা থেকে ছোটদার টাকা পয়সার প্রতি প্রবল আকর্ষণের কথা আমরা সবাই জানি। জানা জিনিসকে মুখে বললে এত বিচ্ছিরি শোনায় কেন জানি না! একবার শান্তিনগরের বাড়িতে তোমার জন্য একটা ওষুধ আনতে বলেছিলাম, দু তিন টাকা বোধহয় দাম। সেই টাকাও সে বললো আমাকে দিতে। আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, নিজের মায়ের ওষুধের জন্য নিজের পকেট থেকে দুটো টাকাও সে খরচ করতে চাইছে না! সেই ছোটদা কেন আসবে তোমাকে দেখতে ময়মনসিংহে। একবার খুব হাতে পায়ে ধরে অনুরোধ করে আনলাম বটে, এসেই বলে দিল তার প্রচণ্ড ব্যস্ততা, তার ফ্লাইট, তার নানা কিছু। তার সময় নেই ময়মনসিংহে আসার, তার সময় নেই সময় নষ্ট করার। বলেছিলাম, তুমি এসেছো দেখলে মা তো খুশি হয়, মাকে শেষ সময়ে কিছু খুশি দাও। ছোটদার কথা, তোমার জন্য সব সে করেছে, কিছুই করিনি আমি। সব টাকা সে খরচা করেছে, কয়েক লক্ষ টাকা এর মধ্যে তার খরচ হয়েছে, কিছুই করিনি আমি। তোমার স্বপ্ন পূরণ সে করেছে, আরব দেশে নিয়ে উমরাহ করিয়ে এনেছে। না, এর বেশি তোমার জন্য ছোটদার করার কিছু নেইও, ইচ্ছেও নেই। এই তার শেষ কথা। শেষ কথা সে চিৎকার করে জানিয়ে দিল, অবকাশের দেয়াল ফাটিয়ে জানিয়ে দিল। সব পাশের ঘর থেকে শুনলে তুমি। ছোটদা হিংস্র জানোয়ারের মতো চেঁচায়, যখন চেঁচায়। কিছু কিছু মানুষ মনে করে চেঁচিয়ে কিছু কথা বললে, সেই কথা সত্য বলে প্রমাণিত হয়। আসলে জঘন্য মিথ্যেও যে জোর গলায় চেঁচিয়ে বলা যায়, আর তা যে মাথায় যাদের ঘিলু বলে পদার্থ আছে তা জানে, তা তারা জানে না। সময় ছোটদার অঢেল আছে মা, সময় নেই শুধু তাদের জন্য, যাদের জন্য সময় কাটাতে তার ভালো লাগে না। ভালো লাগে মদের আড্ডা, ভালো লাগে মেয়ে পটানো। গীতার বশংবদ ভত্যের এই হাল। ছোটদার জন্য সেই ছোটবেলা থেকে আমার মায়া। শুধু আমার কেন, তোমার, ইয়াসমিনের, সবারই মায়া। বাড়িতে আমরা, বিশেষ করে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতাম ছোটদাকে। লেখাপড়া শেষ না করে বিয়ে করে প্রথম দিকে খুব টাকাপয়সা ছিল না বলে মন খারাপ থাকতো ছোটদার, সেই মন খারাপ ছোটদা এখন বিরাট টাকা পয়সার মালিক হয়েছে, কিন্তু আমাদের সবার সেই আদর এখনও তার ওপর একই রকম বর্ষিত হয়। বাবাও ছোটদা বলতে পাগল। চোখের আড়ালে বেশি থাকলে বা দূরের শহরে বাস করলে যা হয়, আদরটা বেশি জোটে। ছোটদার তাই জুটতো। এখনও তাই জোটে। আমি হয়তো অত সহজে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় যেভাবে ছোটদাকে ব্যাংকের যাবতীয় টাকা তোলার অধিকার দিয়েছিলাম, অমন আর কাউকে দিতেপারতাম না। কেন যে বিশ্বাস করতাম এই ছোটদাকে, বিশ্বাস বারবার ভেঙেছে, তারপরও। আসলে যে বিশ্বাস ভাঙে তার দোষ নয়, যে বিশ্বাস করে তার দোষ। ছোটদার ব্যবহারে জানিনা তুমি কষ্ট পেয়েছিলে কি না। শেষের দিকে কষ্টের বোধ তোমার হয়তো আর ছিল না। ছোটদা এক বিকেলে, ওই একটি বিকেলেই তোমারপাশে বসেছিল, মাথায় টুপিপরে সে কোরানপড়ছিল। সে যে কোরান পড়তে জানে তা আমার জানা ছিল না। ইদানিং জুইয়ের সঙ্গে মিশে সম্ভবত শিখেছে। জুই খুব ধার্মিক শুনেছি। ওই একদিনই ছোটদাকে পেরেছিলাম তোমার পাশে বসাতে। কোরান থেকে জানি না কী পাঠ করলো জোরে জোরে, কী যে সেদিন ভালো লেগেছিলো ছোটদা তোমার কাছে বসেছে বলে। ছোটদার মতো ছোটলোককে সেদিন আমি ক্ষমা করে দিয়েছি, যেহেতু তার ওইটুকুপাশে বসা দিয়ে তোমাকে ভালো লাগা দিয়েছিলো। ছোটদার জুইকে বিয়ে করা, কোরানপড়া, এসবের পেছনে আছে একরাতের এক দুর্ঘটনা। সে রাতে ছোটদা গাড়ি চালাচ্ছিলো, গাড়িতে বসেছিলো জুই আর জুই-এর মা। গাড়ি একসময় কোনও এক রেললাইনের ঠিক ওপরে এসে বন্ধ হয়ে গেল। গাড়ি আর চলছে না, না সামনে, না পেছনে। ঠিক তখনই ট্রেনের শব্দ, তিরের মতো ছুটে আসছে ট্রেন। ছোটদা শুধু চিৎকার করে বললো সবাইকে বেরোতে। জুই বেরিয়ে দৌড়। ছোটদাও। কিন্তু পেছন ফিরে দেখলো গাড়িতে আটকে আছে জুই-এর মা। ছোটদা ছুটে গেল গাড়ির ভেতর থেকে জুই-এর মাকে বের করতে। ট্রেন তখন নাকের ডগায়। টেনে সে বের করে নিয়ে আসে বটে জুইয়ের মাকে, কিন্তু ট্রেনের ধাক্কয় নিজে ছিটকে পড়ে। ছোটদার গাড়ি গুঁড়ো করে দিয়ে ট্রেন চলে যায়। গায়ের হাড়গোড় কিছু ভাঙ্গলেও ছোটদা বেঁচে যায় শেষ পর্যন্ত। জুইয়ের মা ট্রেনের আঘাতে নয় কিন্তু, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যায় হাসপাতালে। এই মৃত্যু ছোটদাকে আমূল বদলে ফেলে। এত অপরাধবোধে ভোগায় যে জুইয়ের এতদিনকার স্বপ্ন সে পূরণ করে, জুইকে বিয়ে করে। জুইয়ের মার মৃত্যুর জন্য কেন ছোটদা নিজেকে দায়ী করে! যদি সে টেনে তাঁকে বের না করতো গাড়ি থেকে, দুমুহূর্ত পরই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতেন তিনি। আমার মনে হয় না ছোটদা ছাড়া পৃথিবীর অন্য কেউ ট্রেনের ওইছুটে আসার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রেমিকার মা কেন, নিজের মাকেও বাঁচাতে যেতো।
