যে তুমি বাঁচতে ভালোবাসতে, সেই তুমিই চাওনি আমার কোনও কষ্ট হোক তোমার জন্য। তুমি এমনকী যে মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করছিলে প্রাণপণে, আমার ক্লান্তি বা কষ্টের কথা ভেবে তুমি তোমার নিজের মৃত্যু কামনা করলে। আমাকে মুক্তি দিতে চাইলে তোমার নিরন্তর সেবা থেকে। আমার ক্লান্তি থেকে। অবকাশেও যখন তোমাকে আমার সাহায্য করতে হলো মলত্যাগে, তুমি ভেবেছো আমার নিশ্চয়ই ঘেন্না হচ্ছে এসবে। তুমি সইতে পারোনি। একদিন শুধু বলেছো, তোমার এই কষ্ট আমি আর সইতে পারছি না। আল্লাহর কাছে বলে আমাকে যেন নিয়ে যান। না, মা। ও কারণে আমার কোনও কষ্ট হয়নি। সম্ভবত কষ্ট হয়নি এই ভেবে যে, এ তো আর দীর্ঘদিনের জন্য নয়। নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমি করছিলাম, নাকি যা কিছু করছিলাম, করছিলাম তোমাকে ভালোবাসি বলে! মাঝে মাঝে ভাবি, বোধহয় প্রায়শ্চিত্তই করছিলাম। প্রায়শ্চিত্ত করতে বেশিদিন মানুষের ভালো লাগেনা। ভালোবাসলে কোনও ক্লান্তি আসতো না, ভালোবাসলে গোপনে গোপনে নিস্তার চাইতাম না। কত মানুষ এই পৃথিবীতেই আছে, যারা মাথা নষ্ট হওয়া, শরীর স্থবির হওয়া, বিছানায় পড়ে থাকা মাকে বছরের পর বছর, যুগেরপর যুগ সেবা করে যাচ্ছে, কোনও ক্লান্তি নেই, কোনও অভিযোগ নেই। তারা ভালোবাসে বলেই পারে। আমি সেই ভালোবাসা কোথায় পাবো মা! তোমার জন্য জন্ম থেকেই তা ছিলো না। হঠাৎ করে জন্মাবে কী করে, আমার দোষে তোমার অসুখ হয়েছে বলে! করুণা হয়েছে, মায়া হয়েছে, মমতা বোধ করেছি, আহা আহা করেছি। কিন্তু ভালোবাসা তীব্র ছিলো না বলে ওই অল্প সময়টুকুকেই দীর্ঘ দীর্ঘ বলে মনে হয়েছে। দিন হিসেব করেছি। ডাক্তারের দেওয়া তিন মাস পার হয়ে গেলে বিস্মিত হয়েছি। একটি দিনের বেশি হওয়াও হিসেবে রেখেছি। এসব অজান্তে ঘটেছে মা। আমার নিজেরই অজান্তে। আমার উদার ব্যক্তিত্বের ভেতরে বসে থাকা অনুদার স্বার্থপর আমিটিকে আমি ফাঁকি দিতে পারিনি। তোমার মহানুভবতার সামনে আমি অতি তুচ্ছ, অতি ক্ষুদ্র এক জীব। যেটুকু ভালো আমার, সেটুকু তোমার কারণে, যেটুকু মন্দ আমি, আমার কারণে।
তোমার শরীরের শক্তি দ্রুত ফুরোচ্ছিল। আজ তুমি পা নাড়াতে পারছো, কাল পারছে না। দুপুরে এপাশ ওপাশ করলে, বিকেলে আর সেটা পারলে না। তোমাকে দেখছিলাম আমি। লক্ষ করছিলাম তোমার শক্তি ফুরোনো। এ নিয়ে বাবার সঙ্গে কথা বলেছি, দাদা আর হাসিনার সঙ্গেও বলেছি। কাউকে সামান্য উদ্বিগ্ন হতে দেখলাম না। সম্ভবত তারা উদ্বিগ্ন তুমি এত সময় নিচ্ছো কেন মরতে, সম্ভবত তাদের আশংকা এভাবেই তোমার আবার আরও কয়েক মাস, আরও কয়েক বছর কেটে যায় কিনা। এরাই তো সেই মানুষ, যাদের সেবায় তুমি জীবন উজাড় করে দিয়েছিলে। তোমাকে দেখার আর কেউ ছিল না। তোমার মাথার কাছে বসে থাকতো নানি, বসে বসে কোরান পড়তো। কোরান পড়ে কোনও লাভ নেই জানি, তুমি সুস্থ হবে না। তারপরও আমি বাধা দিইনি। তুমি তো জীবনের অনেকটা সময় কোরান পড়েছো মা, নানি তার ভালোবাসা কী করে প্রকাশ করবে, নানি তো অন্য কিছু শেখেনি। কোরানইশিখেছে, তাই কোরানই পড়ছে। বাকি যারা আসতো তোমাকে দেখতে, টুটু মামা, আর মাঝে মাঝে শরাফ মামা। টুটু মামা তো শেষ দিকে রাত জেগে তোমার বিছানার সামনে বসে নামাজ পড়তো, দোয়া দরুদ পড়তো। মিলাদপড়ার মতোও দাঁড়িয়ে ইয়া নবি সালাম আলায়কা, ইয়া রসুল সালাম আলায়কা বলতো। আমিও দাঁড়াতাম ওদের সঙ্গে, তোমার সঙ্গে যেমন ছোটবেলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, হাত দুটো পেটের কাছে মুড়ে রেখে জোরে জোরে বলতাম ওগুলো, যে কথাগুলো কোনওদিন বুঝিনি। নাস্তিক হয়েও কেন আমি দাঁড়াতাম মা! তুমি যেন আমাকে দেখে খুশি হও? তুমি কি খুশি হতে মা? কতটুকু চোখ মেলতে পারতে আর তুমি, কতটুকু দেখতে পারতে, কতটুকু সুখের অনুভব তোমার তখন আছে? তারপরও আমার মনে হত, যদি থাকে, সামান্যও যদি থাকে, তুমি খুশি হও, একবার জীবনে তোমার নাস্তিক কন্যার বোধোদয় হয়েছে ভেবেও সুখপাও। সে সুখ মিথ্যে হলেও পাও। জীবনের শেষ মুহূর্তে অন্তত কিছুসুখ তুমি পাও। মাঝে মাঝে আসতো ছটকু, ফেলু মামা। ফেলু মামাকে দিয়ে তো তোমার স্টিলের আলমারিটা রং করিয়ে আনলাম। তোমাকে দেখতে বললাম আলমারির গোলাপি গোলাপি রংটা চমৎকার হয়েছে কীনা। একটু ঘাড় পেছনে নিয়ে দেখেছিলে মা। ওটিও তোমাকে সুখ দেওয়ার জন্য। তোমাকে বললামও, এই আলমারিতে এখন থেকে তোমার সবকিছু সুন্দর করে সাজিয়ে রাখবে মা, ঠিক আছে?
তুমি মাথা নেড়ে বললে, হ্যাঁ ঠিক আছে।
তুমি তো সুস্থ হয়ে উঠবে মা।
এ কথা শুনে তোমার ওই ক্লান্ত চোখ দুটোকেও স্বপ্নের জল এসে উজ্জ্বল করে তুলতে। জানি না তুমি বিশ্বাস করতে কী না। বিশ্বাস হয়তো হতে চাইতো না, কিন্তু তারপরও বিশ্বাস করতে হয়তো ভালো লাগতো। আমি ঠিক জানিনা ঠিক কী ভাবতে তুমি। মৃত্যুর অত কাছাকাছি চলে এলে কী রকম ভাবনা মানুষের মনে আসে, তা আমার জানা নেই। অসুখ ধরা পড়ার পর তুমি তো মৃত্যু শব্দটির নাম গন্ধ সইতে পারতে না, উচ্চারণ করতে না। সচেতন ভাবেই হয়তো করতে না। তুমি কি বিশ্বাস করতে চাইতে না তুমি যে সত্যি সত্যি মারা যাচ্ছো, নাকি তুমি প্রচণ্ড মনের শক্তি দিয়ে বেঁচে উঠতে চাইতে বলে অলক্ষুণে মৃত্যুর নামোচ্চারণ করতে না, নাকি মারা যাচ্ছো জেনেও তোমার প্রিয়জনকে বোঝাতে চাইতে না যে তুমি বুঝতে পারছো যে মরছে, ভাবতে প্রিয়জনেরা কষ্ট পাবে ভেবে যে তুমি জেনে গেছো গোপন ব্যাপারটি, জেনে তোমার কষ্ট হচ্ছে। আমার মনে হয় না তোমাকে অত কেউ কোনওদিন ভালোবাসতো যে তোমার কষ্টের কথা ভেবে কষ্ট পাবে। সারাজীবন কেউ বাসেনি জানেনা। হয়তো ভেবেছিলে, মরে যাচ্ছে বলে বুঝি ভালোবাসা জাগবে। না মা, যে সারাজীবনে ভালোবাসেনি, চোখের সামনে মরছো দেখলে তোমার জন্য তাদের ভালোবাসা উথলে ওঠার কোনও কারণ নেই। বেঁচে থাকলেও তোমার মৃত্যু চেয়েছে, মরতে থাকলে তো আরও চাইছে, দেরি সইতে পারছে না। তোমার কি কষ্ট হচ্ছে শুনতে? তুমি তো সব কিছুর ঊর্ধ্বে এখন মা, কষ্ট যন্ত্রণা এগুলো তোমাকে আর স্পর্শ করতে পারে না। পারবে কেন, তোমার নাগালই কেউ এখন আর পাবে না, পাবে না কারণ জলে স্থলে অন্তরীক্ষে তুমি আর নেই এখন। কোথাও নেই তুমি না থাকা মানুষের আবার দুঃখ কী। আমিও তো তোমার মতো না-থাকা হয়ে যাবো, দিন তো আসবেই কোনও না কোনও দিন। দিন তো সবারই আসে, আমার কেন নয়! তোমার অন্তত এইটুকু সান্ত্বনা হোক মা, তোমার মৃত্যু দেখে দেখে যাদের মনে হয়েছে, তুমি অভাগা তাই মরছে, তাদেরও মৃত্যুর সময় হবে মা। তারাও যাবে, তারাও চোখ বুজবে। মাঝে মাঝে মনে হয় কেন আমি তোমাকে ওই অবকাশে নিয়ে গিয়েছিলাম, অবকাশ নামের বাড়িটিতে তোমার মৃত্যু হোক, কেন চেয়েছিলাম আমি? ওই বাড়িতে তিরিশ বছরের স্মৃতি তোমার। কিন্তু তোমার সেই স্মৃতি তো মধুর নয়, মা। যে বাড়িতে তোমাকে অপমান করেছে তোমার স্বামী, বছরের পর বছর, প্রতি দিন, যে বাড়িতে তোমার পুত্র কন্যারা তোমাকে অবজ্ঞা করেছে, তোমার পুত্রবধূরা তোমাকে লাঞ্ছিত করেছে, সেই বাড়ির কোনও একটি ঘরের কোনও একটি বিছানায় শুয়ে তোমার মৃত্যু হোক, এই বা আমি চেয়েছিলাম কেন? আমি যে কথাটা ভেবে তোমাকে ময়মনসিংহেনিয়েছিলাম, সেটি হল, তোমার এতকালের পরিচিত চেনা মানুষগুলোর সঙ্গে তোমার দেখা হবে। বাকি আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা হবে। তোমাদের বাড়ির পাশের বস্তি থেকে তইতই, তেঁতুর মা, আর আরও আরও তোমার চেনা বান্ধবীদের ডেকে ওদের তোমার বালিকাবেলার গান গাইতে বলেছি, ওরা গেয়েছে, তুমি শুনেছো, শুনে তোমার মুখে হাসি ফুটেছে, ওই হাসিটুকু তুমি হাসো, তোমার একটুখানি ভালো লাগুক চেয়েছি। আমি নিজেই বলেছি ওদের সবার হাতে টাকা দিয়ে দাও। গুনে তোমার হাতেই দিয়েছি টাকা, যেন তোমার হাতেই ওদের দাও। কারও কারও জন্য বলেছি, আরও কিছু দাও মা। একটুও দ্বিধা করো না। যত ইচ্ছে করে দিতে, দাও। কোনওদিন তো চাইলেও দিতে পারোনি। মানুষের দারিদ্র্য দেখে তোমার হৃদয় কাঁদতো, তোমার নিজের দারিদ্র্যের চেয়েও অন্যের দারিদ্র্য তোমাকে কাঁদাতো বেশি। সাহায্য করতে চাইতে। কিন্তু কী করে কোত্থেকে তুমি কাকে পয়সা দেবে। তোমাকেই কে দেয়! তোমাকে তো উপার্জন করতেও কেউ দেয়নি। নিজের পায়ে দাঁড়াবার ইচ্ছে তোমার মতো আর কাউকে দেখিনি। তবুও নিজের অনিষ্ট করে হাতে যা কিছুই ছিল তোমার, আটআনা বা একটাকা, একটাকা বা দুটাকা, হয়তো রিক্সাভাড়াই ছিল, দিয়ে দিয়েছে। হেঁটে বাড়ি ফিরেছো। রোদ্দুরে ভিজতে ভিজতে ক্ষিধে তৃষ্ণায় ভুগতে ভুগতে মাইলের পর মাইল হেঁটেছে। আর জীবনে প্রথম পাঁচশ টাকা হাজার টাকা ওই গরিব দুঃখী সইসাথীদের দিতে পেরে তোমার কি একটু, সামান্য একটু শান্তি হয়েছিল মা! ওটুকুই চেয়েছিলাম। বাড়ির অন্যরা, বাবা দাদা আর হাসিনা তিনজন তো কানে কানে কথা বলে আর কটাক্ষ করে আর মুখ টিপে হাসে, বাড়িতে করছি কী আমি! কিসের হাট বসিয়েছি! গরিব গরিব লোক ডেকে আনছি বস্তি থেকে, মাথা টাথা নিশ্চয়ই আমার মায়ের মতোই আমার গেছে। কদিন আর? এই একটিই সান্ত্বনা তাদের, বেশিদিন নয়। কালো ফটক পেরিয়ে গরিবগুলো রীতিমত ঘরের ভেতর ঢুকে মার বিছানার কাছে পেতে দেওয়া শীতল পাটিতে বসে পুরোনো দিনের সুখের স্মৃতিচারণ, গান গাওয়া, হাসি আনন্দ-কদিন আর? এই তো শেষ নিঃশ্বাসের সময় হল বলে। বাবা কি হাসিনাকে খুশি করতে হাতের আঙুল গুনে দিন বলে দেয়, আর কদিন! বাবা তো বোঝে কদিন। আমার চেয়েও বেশি বোঝে, কদিন। আমার চেয়েও হাজারগুণ অভিজ্ঞ ডাক্তার আমার বাবা। নাড়ি না টিপেও বলে দিতে পারে নাড়ির খবর।
