গুলকিবাড়িতে কোনও এক মহিলা পীরের কাছে তুমি যেতে, তার ব্যবহার তোমার ভালো লাগতো, বলেছিলে আমাকে। তার ঠিকানা যোগাড় করে তাকে তার সব মুরিদসহ অবকাশে আমন্ত্রণ জানালাম। তোমার জন্য মিলাদের আয়োজন করলাম, যে ঘরে তুমি শুয়েছিলে, সে ঘরেই। তোমার কন্যা নাস্তিক বলে নওমহলের পীর বাড়ি থেকে তোমাকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, তুমি শেষ অবদি গুলকিবাড়ির ওইপীরের খোঁজ পেয়ে তার কাছেই যেতে। প্রেসক্লাবের বিরিয়ানি প্যাকেট করে আনিয়েছিলাম, ওদের সবাইকে দিয়েছিলাম। ধর্মে বিশ্বাস না থাকার পরও ওই ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন আমি করেছিলাম, শুধু তোমাকে একটুখানি ভালো লাগা দেওয়ার জন্য। সবাই তোমার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে মোনাজাত করেছে। তোমার সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য কোনও এক অদৃশ্য আল্লাহকে কেঁদে কেঁদে অনুরোধ করেছে। প্রাণভরে প্রার্থনা করেছে। দেখে যদি একটুও ভালো লাগে তোমার, তাই এই আয়োজন মা। আর কিছু নয়। ভালো লাগা তো আর কখনও দিতে পারিনি তোমাকে। জীবনের শেষ মুহূর্তে যেভাবে সম্ভব ভালো লাগা দিতে চেয়েছি। বাবাও আল্লাহ বা রসুলে বা ইসলামে বা মিলাদে বিশ্বাসী না হয়েও একটা মৌলবী ধরে এনেছিলো, তাকে দিয়েই ড্রইংরুমে বড়সড় মিলাদ পড়ানোর ব্যবস্থা করেছে। ধর্মে বিশ্বাস না করেও বাবা শুধু তোমার জন্যই করেছে, যা করেছে। আমিও জানি, বাবাও জানে, মৌলবীরা যতই তোমার সুস্থতার জন্য আল্লাহর কাছে মোনাজাত করে যাক না কেন, তুমি সুস্থ হবে না। তুমি শুয়ে শুয়ে মিলাদের আওয়াজ শুনলে। তোমার কি ভেতরে ভেতরে একটু হলেও বিশ্বাস জন্ম নিত যে সুস্থ হয়তো হয়েও যেতে পারো হঠাৎ, জাদুর মতো! নানি যেমন মৃত্যুর দরজায় পা দিয়েও ফিরে এসেছিলো, সেরকম একটা জাদু তুমি হয়তো চেয়েছিলে। আমিও হয়তো তোমার মতো অবস্থা হলে চাইতাম।
.
তুমি লক্ষ করছিলে যে তোমাকে আর কোনও ওষুধ দেওয়া হচ্ছে না। সব চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তুমি চাইলেও সেটি তোমাকে দিচ্ছি না কেউ। যে আমি তোমার চিকিৎসার জন্য দূর আমেরিকায় তোমাকে নিয়ে গিয়েছি, সেই আমিই এখন চিকিৎসা বন্ধ করে দিয়েছি। নিশ্চয়ই চিকিৎসার আর কিছু নেই বলেই বন্ধ করেছি। মনে মনে লৌকিকে আশা ছেড়ে অলৌকিকের কথা ভাবছিলে কী! বৈঠকঘরে মিলাদেরপর যখন মোনাজাত হচ্ছে, তুমি শুনছিলে, দেখলাম তোমার মাথায় কোনও কাপড় নেই। তুমি সাধারণত এসব সময় আলগোছে মাথায় একটু কাপড় উঠিয়ে দাও। অভ্যেস অনেকদিনের। অভ্যেস থেকে তুমি বেরিয়ে আসছে। নিউইয়র্কে আর শান্তিনগরে দেখেছি তুমি বিছানায় বসে নামাজ পড়তে। যখন বসতে অসুবিধে হতো, শুয়ে পড়তে। অবকাশে এসেও মাথায় একটু কাপড় তুলে দিয়ে, শুয়ে থেকেই চোখ বুজে বিড়বিড় করছে। কয়েকদিন করেছে। তারপর লক্ষ করছি, নামাজ তোমার আর শুয়েও পড়া হয় না। নামাজের সময় চলে যায়, তুমি ঘুমিয়ে থাকো। দিন আর রাত তোমার একাকার হয়ে যাচ্ছে। কারও অসুখ হলে আমরা বিশ্রাম নিতে বলি, শুয়ে থাকা বা ঘুমিয়ে থাকাটাইতাদের জন্য স্বাভাবিক বলে মনে করি। কিন্তু তোমার ঘুম স্বাভাবিকতার আওতা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। চিরকালের অভ্যেস থেকে বেরিয়ে যাচ্ছো তুমি। তুমি জানো না যে বেরিয়ে যাচ্ছো। জগৎ থেকে সরে যাচ্ছো তুমি। একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছো। তুমি আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘুমিয়ে কাটাচ্ছো। তুমি জানো না যে তুমি ঘুমোচ্ছা। আমি জানি। আমি টের পাচ্ছি যে এই ঘুম প্রয়োজনের ঘুম নয়। এ অপ্রয়োজনের ঘুম। এ ঘুম তোমাকে জাগতিক সব কিছু থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে নেওয়ার ঘুম। এই ঘুম ভালো ঘুম নয়। এই ঘুম চেতন থেকে ধীরে ধীরে তোমাকে অচেতনের দিকে টেনে নেওয়ার ঘুম। কিন্তু সেও কি তখন আর বুঝতে পেরেছিলাম অত! এখন পেছন ফিরে তাকালে অনেক ধোঁয়াই কেটে যায়।
.
ধীরে ধীরে, সামান্য যা খেতে, তাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, টের পাচ্ছি। খুব কষ্ট করে গিলতে হয় যা কিছুই খাও। সুপ খেলেও, জল খেলেও। কিছু পেটে পড়লেই পেটের ভেতর তোমার সেই ভিসুভিয়াস ফুঁসে ওঠে। তারপরও যুদ্ধ করে যাচ্ছিলে, তোমার ওই একার যুদ্ধ। তোমার জন্য স্যালাইন এনে রেখেছি, অক্সিজেন এনেছি, ব্যথা কমানোর পেথিডিন এনেছি। ধীরে ধীরে তুমি যে কী কঙ্কালের মতো হয়ে যাচ্ছিলে মা! আমি জানি না তোমার সামনে আয়না ধরেছিলাম কিনা দেখতে। তুমি নিজেই হয়তো বুঝতে পাচ্ছিলে। আমার আবার কী রোগ হয়েছিলো জানিনা, প্রায়ই ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়াতাম তোমার ছবি তুলতে। বাবাকে পাশে বসিয়ে ছবি তুলছি, তোমার একার ছবি, তোমার রুগ্ন পাণ্ডুর মুখের ছবি, তোমার কঙ্কালসার শরীরের ছবি। কেন তুলছিলাম মা? তুমি চাইতে না ছবি তুলতে। তুমি বাধা দিতে। একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম কেন চাইছো না? তুমি করুণ কণ্ঠে বলতে, এখন তো দেখতে আমি ভালো না, এখন ছবি তোলোনা। সম্ভবত চাইতে না তোমার ওই চেহারার মাকে আমরা দেখি। আমি বুঝিনি তখন। ঠিকই বলতে, তোমার ওসব ছবির দিকে এখন তাকাতে পারি না। ও তো তুমি নও, অন্য কেউ। যখন সুস্থ ছিলে, হৃষ্টপুষ্ট ছিলে, যুবতী ছিলে, বাড়ির সবার ছবি তুললেও তোমার ছবি আমরা কেউই তুলিনি। হঠাৎ করে মৃত্যুশয্যায় রুগ্ন মায়ের ছবি তুলতে উগ্রীব। সারাজীবন ভুল করে শেষ দিনে এসে শোধরাতে চাইলে সব ভুল শোধরানো যায় না! বড় দেরি হয়ে যায়। যখন সুস্থ ছিলে, হাতে গোনা। তখনকার দুএকটা ছবি ছাড়া তোমার আর কোনও ছবি নেই কোনও অ্যালবামে। যা আছে, তাও তোমার একার ছবি নয়। অনেকের সঙ্গে তুমি। সুহৃদকে গোসল করাচ্ছো, বা পড়াচ্ছো। আসলে ও ছবি তোমার জন্য তোলা হয়নি, সুহৃদের জন্য হয়েছিল। বা ওর জন্মদিনের কেক কাটার সময় আর সবার মধ্যে তুমিও আছে। সবসময়ই দূরে, কিনারে, অর্ধেক কাটা পড়েছে, ইনসিগনিফিকেন্ট ক্যারেকটারের মতো। তোমাকে ওঠানো হতো না, তুমি অ্যাক্সিডেন্টালি উঠে যেতে।
