.
আগেই বলে রেখেছিলাম যেন একটা খাট কিনে রাখা হয় তোমার জন্য। তোমার তো কিছু ছিল না। অবকাশে গিয়ে উঠোনে তোমার ভাঙা খাটটা দেখলাম পড়ে আছে, কেউ ছিল না ওটি সারানোর। আজ তোমার জন্য নতুন একটি খাট, নরম বিছানা। তুমি মরবে বলে। বেঁচে থাকতে তো আরাম জোটেনি, মরার সময় একটু না হয় আরামে মরো। তোমার ভয়ংকর অসুখটা না হলে এই নতুন বিছানাটা তুমি পেতে না। ভেঙে পড়ার আগে তুমি তো সেই খাটেই শুচ্ছিলে যেটা বিয়ের সময় নানি বাড়ি থেকে তোমাকে দেওয়া হয়েছিলো। আসলে কী জানেনা মা, ভয়ংকর অসুখ হলেও, তুমি কদিন পরই মরবে জানলেও কেউ তোমাকে নতুন ওই বিছানা দিত না। আমি ছিলাম বলে, আমার নির্দেশেই হয়েছে। তোমার জন্য সবচেয়ে যে ছোট ঘরটি, সেটিতে ওই নতুন খাট পেতে রাখা হয়েছে। হাসিনা বললো, কাজের লোককে দিয়ে ঘরখানা সে মুছিয়ে রেখেছে। বিরাট কাজ করেছেহাসিনা। এতদিনেশাশুড়ির সেবা করতে সে একপায়ে দাঁড়ানো। তোমার জন্য খামোক একটা সে ছুটোছুটির ভাব দেখাচ্ছে। রান্নাঘরে দৌড়ে গেল কিছু খাবার আনতে। অবকাশে সে যেদিন থেকে এসেছে কোনওদিন তো অত আনন্দে সে ছুটে যায়নি। তোমার জন্য কিছু আনতে। আমি জানি, তুমি মরে যাবে এই খবর বাড়ির একজনকেই খুশি করেছে, সে হাসিনা। হাসিনা সবচেয়ে বেশি যার মৃত্যু চায়, সে বাবার, এ আমি অনুমান করতে পারি। তারপর চায়, তোমার মৃত্যু। আশ্চর্য, দেখলাম তুমি হাসিনার আনাপানিটা খেলে। হাসিনাকে তুমি আদর করে দিলে। কেন মা? ওকে কী কারণে ক্ষমা করেছো? খুব বেশিদিন তোহয়নি যে তুমি ওর কুৎসিত ব্যবহারে অবকাশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। যখন ব্যথায় ককাচ্ছিলে, পানি খেতে গিয়েও দেখেছো তোমার বমি হয়ে যাচ্ছে, ও তো ঘর থেকেও বের হয়নি, আর বের হলেও নাক সিটকে তাকিয়েছিলো তোমার অসুস্থতার দিকে। জানিনা কেন তুমি হাসিনার হাতে খেতে চাইলে। কেন চাইলে মা? কেন আমার হাতে নয়? আমিই তো ছিলাম তোমাকেপানি খাওয়াবার, শেফালি ছিলো। নাকি তুমি ভাবতে চাইলে হাসিনা তোমাকে ভালোবাসে, তাই তোমাকে খাইয়ে দিচ্ছে। যে তোমাকে সারাজীবন কষ্ট দিয়েছে, তার হাতে খেয়ে তুমি কি তাকে ক্ষমা করে দিতে চাইছিলে মা? তুমি হয়তো ক্ষমা করেছে মা, আমি করিনি। আজ ওর হাতে পানি খাবার তোমার তো দরকার ছিল না। তোমার আসলেপানিই খাবার দরকার ছিলো না। কিন্তু খেলে। তুমি কি হাসিনাকে মুক্ত করতে চেয়েছিলে ওর অপরাধবোধ থেকে? হাসিনার, কেন ভেবেছো যে, অপরাধবোধ ছিল? ছিল না মা। অপরাধবোধ জন্ম নেওয়ার জন্য সামান্য মানুষ হতে হয়। আমরা এই যে চারদিকে এত মানুষের সঙ্গে মিশি, এদের বেশির ভাগই আসলে মানুষ নয়। তুমি তো তোমার চোখে তোমার মতো করে মানুষগুলোকে দেখ, তাই ওদের মানুষ বলে ভাবো। তোমার হৃদয় আছে বলে তুমি ভাবো যে সবারই বুঝি হৃদয় আছে। তা তো নয়। নয় মা। আমার মনে হয়, আমি আমার মৃত্যুশয্যাতেও কোনও অপরাধীকে, কোনও দুশ্চরিত্র পাষণ্ডকে ক্ষমা করতে পারবো।
ওই ছোট ঘরটা থেকে বড় ঘরে, বাবার ঘরে, যে ঘরটায় ছোটবেলায় আমরা থাকতাম, সেই ঘরটায় তোমাকে সরিয়ে নিলাম। বাবা ঘুমোলো ছোট ঘরটায়, আমি আর নানি তোমার বিছানার কাছেই একটা বড় বিছানায়। তোমাকে চোখে চোখে রাখতে হয় আমার। রাতে ঘুমোই না। শুয়ে শুয়ে তোমাকে দেখি। এদিকে ময়মনসিংহে এসে বাবা দিব্যি পাল্টে গেল। সেই আগের মতো সাত সকালেই স্নান করে সাজগোজ করে নিচ্ছে। সার্ট, প্যান্ট, স্যুট, টাইপরে চেম্বারে চলে যেতে শুরু করলো। ফিরতে শুরু করলো সেই অনেক রাত্তিরে। যেন এ বাড়িতে কিছুই ঘটে নি, কিছুই ঘটছে না। যেন তুমি শুয়ে আছো না। যেন তোমার শরীর খুব দ্রুত অবশ হয়ে যাচ্ছে না।
.
তুমি আর উঠে দাঁড়ালে না মা। অবকাশের মাটিতে তোমার আর পায়ের ছাপ পড়েনি। একবার বিছানা থেকে নামালাম তোমাকে। বিছানাবন্দি যেন না থাকো, তোমাকে চেয়ারে বসিয়ে চেয়ারসহ তোমাকে উঠিয়ে নিয়ে গেলাম বারান্দায়। কী যে খুশি হলে! নিজের হাতে লাগানো ফলের গাছগুলো দেখলে, আম, পেয়ারা, কামরাঙা, লেবু, কলা, জামরুল, নারকেল! কী নয় বলো! গাছগুলোয় ফল ধরে আছে। শুধু কচি কামরাঙা গাছটায় বললে কঞ্চির ঠেস দিয়ে দিতে। এই কামরাঙার বীজ তুমি লাগিয়েছিলে। খুব ভালো জাতের কামরাঙা। বললে তুমি সুস্থ হয়ে উঠে এই কামরাঙা সবাইকে নিজের হাতে খাওয়াবে। মা, শুনেছি সেই কামরাঙা গাছটা এখন ঝুঁকে থাকে শত শত কামরাঙায়। তুমি জানো কি? কোথাও থেকে কি দেখ? এরকম যদি হত, সত্যিই দেখ। সত্যিই তুমি দেখতে পাচ্ছো সবকিছু! তোমার চেনা সব মানুষ কে কেমন আছে! তোমাকে কেউ মনে রেখেছে কি না। মানুষ তো নিষ্ঠুর। বোধহয় ওই গাছগুলো মনে রেখেছে তোমাকে। বোধহয় তোমার ওই প্রিয় গাছগুলো তোমার জন্য গভীর রাত্তিরে মাঝে মাঝে কাঁদে। সেদিন বারান্দায় বেশিক্ষণ তোমাকে রাখিনি। ঘরে নিয়ে আবার সেই বিছানায় শুইয়ে দিয়েছি। এখন ভাবি, কেন আরও বেশিক্ষণ তোমাকে রাখিনি। কেন তোমাকে পুরো উঠোন ঘোরাইনি ওভাবে। দিন দিন তোমার পেটের পানি বেড়ে চলেছে। তুমি এখন আর কিছুদিয়ে সেটা আড়াল করতে পারো না। দিন দিন তুমি শরীরে ভারি হয়ে উঠছো, যত ভারি হচ্ছো, তত তোমার মাথা হালকা হয়ে উঠছে, তুমি ঝিমোচ্ছো, নয়তো ঘুমোচ্ছো। একদিন আমাকে হঠাৎ অনুরোধ করলে যেন নামাজ পড়ি। আমি বললাম, নামাজ টামাজ তো আমি পড়তে জানি না। তুমি বললে নানি যখন পড়ে, তখন যেন নানির সঙ্গে পড়ি। নামাজের সুরা যে আমি জানি না, আমার যে মনে নেই, সে তুমিও জানো। তারপরও বললে। আগের মতো আমি তোমাকে কটাক্ষ করিনি। না, সেদিন আমি আর তোমার ধর্মান্ধতা নিয়ে বিদ্রূপ করিনি। আগে কোনওদিন তোমার এই অনুরোধ রাখিনি। কিন্তু সেদিন রাখলাম। তোমার বিছানার পাশে তোমার চোখের সামনে দুটো জায়নামাজ পেতে, একটিতে নানি, আর একটিতে আমি দাঁড়ালাম। তোমার যেন প্রাণের আরাম হয়, তোমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে আমি নামাজ পড়লাম। নামাজ পড়া মানে নানি যখন যখন মাথা নোয়ালো, দেখে আমিও নোয়ালাম, মাথা ওঠালো, আমিও ওঠালাম। ঘাড় ডানে বামে বাঁকালো, আমিও বাঁকালাম। যেসবে আমার বিশ্বাস নেই, আমি তা করি না কোনওদিন। কিন্তু তোমার জন্যই করেছিলাম মা। নামাজ শেষে মোনাজাতের হাত তুলে নানি নিঃশব্দে তোমার জন্য প্রার্থনা করলো যেন আল্লাহ তোমাকে সুস্থ করে তোলেন। নানির হাত দুটো ভিজে যেতে থাকলো চোখের জলে। দুদিন পর তুমি আর খোঁজ নাওনি আমি নামাজ পড়েছি কি না। তুমি যেন থেকে থেকে হারিয়ে যেতে কোথাও। আমি নিজেই অন্য ঘর থেকে এসে বলতাম, নানির সঙ্গে নামাজ পড়েছি আমি, না পড়েও বলেছি পড়েছি। মা, তোমার সারাজীবনে আমি তোমাকে কোনও সুখ দিতে পারিনি, তাই সুখ স্বস্তি সব উজাড় করে দিতে চাইছিলাম। তুমি আমাকে নামাজ পড়তে বলেছিলে কেন? অনেককাল তো বলোনি। ও তোমার জন্য দোয়া করার জন্য বলোনি, আমার জন্য বলেছিলে, যদি আল্লাহ বলে কোথাও কিছু থেকে থাকে, তবে তার নিষ্ঠুর শাস্তি থেকে যেন তার জপ করে বাঁচতে পারি। হ্যাঁ তোমার হয়তো মনে হয়েছিলো, যদি সত্যি সত্যিই থেকে থাকে দোযখ বা বেহেস্ত বলে কিছু, যদি সত্যি হয় ধর্মের রূপকথাগুলো, তবে আমাকে তো পুড়তে হবে দোযখের আগুনে। জানি না ঘুমিয়ে স্বপ্নের মধ্যে আমাকে আগুনে ঝলসে যেতে দেখেছিলে কিনা। আমি দেখ, সৌখিনকে ধরে এনে তোমার বিছানার পাশেশীতল পাটিতে তসবিহ দিয়ে বসিয়ে দিতাম, বলতাম, দরুদ পড়ে আল্লাহর কাছে মোনাজাত করো, যেন তোমার দাদু ভালো হয়ে ওঠে। বলতাম, বলো আল্লাহ তুমি আমার দাদুকে ভালো করে দাও। আমি কিন্তু কখনই বলিনি বলে আমার দাদুকে তুমি বেহেসতে নিও। বেহেসতের কথা এলে মৃত্যুর গন্ধ সঙ্গে আসে। আমি মৃত্যুর ত্রিসীমানায় কোনও শুভকামনাকে নিতে চাইনা। শুধু সুস্থ হয়ে ওঠার প্রার্থনা যেন তুমি শোনো। তোমার একজন নাতি তোমার জন্য দোয়া করছে, এ যেন দেখতে তোমার ভালো লাগে। সুহৃদ আর শুভর তো তোমার কাছে এসে বসার সময় নেই। সারাদিন মাঠে মাঠে খেলছে। সৌখিন ছোট বলেই ওকে বসাতে পেরেছিলাম। বিশ্বাসের বাইরে কতদূর গিয়েছিলাম মা, শুধু তোমার জন্য। সুহৃদকে টেনে টেনে এনে অনেকদিন তোমার পাশে বসিয়েছি। বলেছি যেন সে বলে তার দাদুকে সে ভীষণ ভীষণ ভালোবাসে। সুহৃদ তোমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়েছে। ওকে তুমি আদর করে করে কানে কানে বলেছো, তুমি খুব মন দিয়ে পড়াশোনা করে অনেক বড় হবে তো! সুহৃদ কথা দিয়েছে, হবে। দেখতে কী যে ভালো লাগে আমার! তোমার ভালো লাগছে এমন কিছুই আমাকে ভালো লাগা দিত। ইয়াসমিন কদাচিৎ ফোন করতো। কেন যে ও প্রতিদিন ফোন করে তোমার সঙ্গে কথা বলতোনা! ওর সঙ্গে অভিমান করে আমিও খুব ঘন ঘন ওকে ফোন করিনি, তোমার সঙ্গে কথা বলিয়ে দিইনি। আজ মনে হয়, কেন দিইনি। কিসের অভিমান ছিল আমার। ও ফোন করে না, হয়তো ফোনের খরচ নিয়ে ভাবে, অথবা ধীরে ধীরে তুমি আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছো, এই দুঃসংবাদ তার শুনতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু তাই বলে আমি অভিমান করে কী এমন ভালো করেছি ওর বা তোমার!
