হয়তো বুঝেছিলে তোমার আর দেরি করা উচিত নয়। জ্বর হল। হাসপাতালে গেলে। হাসপাতাল থেকে এসেতুমি আর বিছানা থেকে উঠলে না। হঠাৎ করে শরীরের চেয়েও বেশি মনের যে জোরে চলাফেরা করছিলে, সেটিও গেল। আমি বললাম ময়মনসিংহে চলো। কেন ময়মনসিংহে আমি নিতে চাইছি! আমি বললাম, ওখানে অনেকের সঙ্গে তোমার দেখা হবে, ভালো লাগবে। তুমি নিউইয়র্কেও বলেছিলে, কেন ঢাকায় নিতে চাইছি। তুমি কি হেসেছিলে মনে মনে যে তোমাকে নানা কায়দা করে আসলে কবরখানার পাশে নিয়ে যেতে চাইছি আমি। ঢাকায় তোমার মলত্যাগে কষ্ট হচ্ছিল শেষের দিকে। গ্লাবস কিনে এনে আমি নিজের হাতে তোমার মল নিয়ে আসতাম অনড় অন্ত্র থেকে। তুমি তো তখন আর বেশি কিছু খেতে পারো না। ধীরে ধীরে তোমার খাওয়া কমে গেছে। আবার সেই সুপে এসে থেমেছে। তোমার নোংরা আমি নিজের হাতে পরিষ্কার করছি, আমার একটুও ওতে আপত্তি ছিলো না। কিন্তু আপত্তি ছিলো তোমার তুমি মানতেপারোনি। লজ্জায় দ্বিধায় সাদা হয়ে থাকতে। আমি বারবার বলেছি তোমাকে, মা, তুমিও তো তোমার মার সেবা এভাবে করেছে। আমাকেও করতে দাও, তুমি সুস্থ হয়ে ওঠো। যখন সুস্থ হয়ে ওঠার কথা বলি, যখন ওই মিথ্যে কথাটা উচ্চারণ করি, শুনতে এত ভালো লাগে। পৃথিবীর আর কোনও মিথ্যে বোধহয় এত সুন্দর নয়। তুমি সুস্থ হয়ে উঠবে। আহা যদি সত্যিই সুস্থ হয়ে উঠতে তুমি। যদি জাদুবলে সত্যি হয়ে উঠতো ওই মিথ্যেটি।
বুড়ো বয়সে নানির একবার ঋতুস্রাব শুরু হয়েছিলো। অনেক বছর আগে ঋতু বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ শুরু হওয়ায় নানি তখন চূড়ান্ত অস্বস্তিতেপড়েছিলো। তোমাকে কানে কানে বলেছিলো। তুমিও আমার কানে কানে খবরটা জানিয়েছিলে। আমি তখন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়েছিলাম। আমারই একসময় শিক্ষক ছিলেন তিনি। সেই জোবায়েদ হোসেন আমাকে বললেন, নানির ক্যানসার হয়েছে জরায়ুতে, বাঁচতে হলে তার জরায়ু কেটে ফেলে দিতে হবে। নানি কিছুতেই কিছু ফেলে দেওয়ার পক্ষপাতি ছিল না। নানি কোনও অপারেশন করেনি। দুতিন বছর পরস্রাব আপনাতেই চলে গেছে। নানি যেমন সুস্থ ছিল, তেমনই আছে। কত কত বছর আগের কথা। এরকম কিছু তোমার বেলায় হতে পারে না? ডাক্তারের সব ভবিষ্যৎ বাণী, সব ডায়াগনোসিস মিথ্যে প্রমাণ করে তুমি বেঁচে উঠতে পারো না মা, নানির মতো?
সব ক্যানসারের রোগীদের স্টেরয়েড দেওয়া হয়। ফুরফুরে থাকার জন্য, তাজা থাকার জন্য, শক্তি পাবার জন্য। তোমাকে কোনও ডাক্তারই এই জরুরি ওষুধটি দেয়নি কেন, জানি না। আর আমি তো ডাক্তারি বিদ্যে সব গুলে খেয়েছি। এত কিছু ইন্টারনেটে ঘেঁটেছি, এটি ঘাঁটিনি। এই প্রাথমিক বিদ্যেটুকু জানার জন্য যে সামান্য খোঁজটুকু করতে হয়, সেটিও করিনি। তোমাকে স্টেরয়েড দেওয়া হয়নি। ওটি খেলে বলবো না সুস্থ হয়ে উঠতে, কিন্তু অসহ্য যন্ত্রণা যতটা পেয়েছো, তারচেয়ে খানিকটা কম পেতে। শরীরে সামান্য হলেও কিছু ভালো লাগা এসে বসতো। তুমি কি আর অত ভাগ্য নিয়ে জন্মেছো মা! যন্ত্রণায় ভুগেছো সারা জীবন, শেষ দিন পর্যন্ত তাই ভুগবে।
হ্যাঁ ময়মনসিংহে নিয়ে যেতে হবে তোমাকে। সিদ্ধান্ত সব আমিই নিই। সবাই শ্রোতা বা দর্শক। শ্রোতা বা দর্শক ছাড়া তারা আর হবেই বা কী। সিদ্ধান্ত নিলে দায়িত্ব নিতে হয়। দায়িত্ব যখন আমার, সিদ্ধান্তও আমার। এতে কেউ আপাতত প্রতিবাদ করছে না। যা কিছু হোক না কেন, সিদ্ধান্ত সংসারে সাধারণতপুরুষরাই নেয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে পুরুষেরা সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে দূরে থাকছে কারণ আবার ও করতে নিয়ে দায়িত্ব ভার না আবার তাদের ঘাড়ে চাপে। সংসারে মেয়ে হয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়াটা তাই আমারই থাকে। অবশ্য যে মানুষ আজ আছে কাল নেই, তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত তো নিতান্তই ক্ষণিকের ব্যাপার। ক্ষণিকের বলেই সম্ভবত আমার সিদ্ধান্তে কেউ অসন্তুষ্ট হয় না। টাকা পয়সার জোরেই সিদ্ধান্তটা মেয়ে হয়েও নিতে পারি। সংসারে টাকা একটা সাংঘাতিক ক্ষমতার জিনিস মা। তোমার চেয়ে বেশি আর কে জানে তা!
যখন চলে যাচ্ছিলে ঢাকার বাড়ি থেকে, এমন ভাবে যাচ্ছিলে যেন কদিন পর ময়মনসিংহ থেকে তুমি ফিরে আসবে। তোমার ঘর থেকে বেরোনোর দৃশ্য দেখে বারবার আমার মনে হচ্ছিল, এ বাড়ি থেকে এ তোমার শেষ চলে যাওয়া। এ বাড়িতে, যে বাড়িটা আমার জন্য তুমি ধুয়ে মুছে রাখতে, যে বাড়িটাই তোমার একমাত্র আশ্রয় ছিল, যেটাকে অন্তত নিজের বাড়ি বলে ভাবতে পারতে, যে বাড়িটায় কত কত বছর তুমি থেকেছো, যে বাড়িটায় তোমার কাপড় চোপড়, তোমার সব জিনিসপত্র তোমার নিজের হাতে সব গোছানো, সেখানে আর তুমি ফিরবেনা। কোনওদিনই আর ফিরবেনা। ভেবে হু হু করে কান্না এলো। ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে তুমি আমার সেই কান্নার দিকে মুহূর্তে ভাবলেশহীন মুখে ফিরে তাকালে। মা, তুমি কি বুঝেছিলে কেন আমি কাঁদছি!
গাড়িতে যখন যাচ্ছিলাম আমরা ময়মনসিংহের দিকে, তুমি সতর্ক ছিলে আমাকে যেন রাস্তার কেউ চিনে না ফেলে। আমার ওপর যেন আবার অতর্কিতে কোনও আক্রমণ না আসে। বারবারই বলছিলে মুখখানা যেন একটু আড়াল করে রাখি। যে তুমি বিছানা থেকে গাড়ি পর্যন্ত নিজে একা হেঁটে আসতে পারোনি, যে তুমি নিজের পেটের ভেতরের ব্যথাকে ব্যাখ্যা করতেপারো না, ব্যথা বা যন্ত্রণা বা কষ্ট নামেও ওদের চিহ্নিত করতে চাও না, অন্য কিছু, ভীষণ কিছু, ভয়ংকর কিছু, যে ভয়ংকর কিছুটাকে কী নাম দেওয়া যায় তুমি জানো না, সেই তুমি নিজের শরীরের ভেতর ভাষায় বা শব্দে বর্ণনা করা যায় না সেই ভয়ংকর কিছুকে, ভয়ংকর সেই ভিসুভিয়াসের ক্রমাগত বিস্ফোরণকে ভুলে গিয়ে আমাকে বাঁচাতে চাইছিলে ধর্মান্ধ নির্বোধদের হাত থেকে। মা, কী করে পেরেছিলে সারাপথ কেবল আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে? তুমি কি মানুষ ছিলেমা, মা-রা বুঝি মানুষের চেয়েও বড় কিছু হয়। সব মা-ই? নাকি শুধু তুমিই? চারদিকের স্বার্থপর, নিচ, ক্ষুদ্র, কূপমণ্ডুকের মধ্যে বাস করে কী করে অত বড় একজন, মানুষের চেয়েও বড় একজন হতে পেরেছিলে মা?
