.
ঝুনু খালা আর ফকরুল মামাকে পাঠিয়ে পুরোনো ঢাকার শাড়ির হোলসেল মার্কেট থেকে একশ শাড়ি আর লুঙ্গি কিনেছিলাম যেন তুমি গরিবদের দান করতে পারো ওসব। চিরকাল গরিবের অভাব ঘোচাতে চেয়েছে। কোথাও কোনও গরিব দেখলেই তোমার হাত নিশপিশ করেছেসাহায্য করার জন্য। টাকার অভাবে পারোনি। তোমার নিজের হাতে, আমি চেয়েছি, শাড়ি আর লুঙ্গি গরিবদের দান করো। চেয়েছি তোমার ভালো লাগবে বলে। নানি কিছু শাড়ি নিজের চেনা লোকদের দেবে বলে আলাদা করে রাখলো। নানিবাড়ির পাশেই বস্তিতে যে গরিবেরা থাকে, তারা তোমারও চেনা। তুমি তো নিশ্চয়ই ওদের দেবে। কোন শাড়ি খারাপ, কোন শাড়ি ভালো তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেল নানি আর ঝুনুখালার মধ্যে, দূর থেকে তুমি দেখছিলে। নানি বলতেই পারে যে আত্মীয়দের মধ্যেই যারা গরিব আছে, তাদেরও দেওয়া হোক শাড়ি। শুনেছ, কোনও মন্তব্য করোনি। নানি যখন সাদা একটা ভালো শাড়ি দেখে বললো, ও শাড়ি নানি নিজেইপরতে পারবে, জানিনানির এই কথা শুনতে তোমার ভালো লাগেনি। পার্থিব জিনিসপত্র থেকে তুমি নিজেকে খুব দূরে সরিয়ে নিয়েছিলে। মৃত্যু এসে দরজার কাছে বসে থাকলে বোধহয় এসব জিনিসপত্রকে বড় তুচ্ছ মনে হয়, এ নিয়ে মানুষের আনোচনাকেও মনে হয় বড় অশ্রাব্য। শাড়িগুলো তোমার হাত দিয়েই গরিবদের দেওয়া হয়েছে। সারাজীবন যা করতে পারোনি, শুধু আশা করেছে, সেই কাজটা করাতে চেয়েছি আমি। জানি না কতটুকু ভালো লাগা দিতে পেরেছি তোমাকে। হঠাৎ অসুখ হওয়ার পর সবঅসম্ভবও যখন সম্ভব হয়ে গেল, তোমার কেমন লাগছিলো মা? আমাদের সবার ওপর রাগ হয়নি? তুমি রাগ দেখালে আমাদের ভালো লাগবে না বলে হয়তো রাগ দেখাওনি। না হলে তোমাকে খুশি করার এই নাটক দেখেও তুমি চুপ হয়ে ছিলে কেন? তোমার জায়গায় আমি হলে হয়তো এসব নাটক বন্ধ করতে বলতাম। বলতাম, যেভাবে অভাবে জীবন কাটিয়েছি, শেষ কটা দিন ওভাবেই কাটাতে দে।
আমার ভীষণ ইচ্ছে ছিল তোমার নামে একটা ইস্কুল করবো ময়মনসিংহে। ঈদুল ওয়ারা বালিকা বিদ্যালয়। চারদিকে খোঁজ খবরও নিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ অবদি যা শুনলাম, ইস্কুল করতে গেলে প্রচুর সময় লাগবে। না, আমার সময় খুব কম। এই কম সময়ের মধ্যে কী কী করা যায়, তাই করতে আমি ঝাঁপিয়ে পড়ি। ইস্কুল না হয়পরে হবে, কিন্তু তুমি দেখতে পারো এমন কী করা যায়। দ্রুত ভেবে নিলাম যে তোমার নামে একটা বৃত্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করবো। সপ্তম থেকে দশম শ্রেণীর মেয়েদের, যারা গরিব, কিন্তু ভালো ছাত্রী, তাদের কয়েকজনকে। দাদাকে টাকা দিয়ে ময়মনসিংহেপাঠিয়ে দিলাম। মুকুল নিকেতনের আমিরুল ইসলাম রতন, যতীন সরকার, আর দুজন নামি শিক্ষক বিচারক হবেন। তারাই নির্বাচন করবেন ছাত্রী। ফোনে আমিরুল ইসলাম রতনের সঙ্গে কথাও বলেছি, তুমি আর অল্প কদিন আছো, তুমি যেন দেখে যেতে পারো বৃত্তির অনুষ্ঠান। পড়াশোনা করতে চেয়েছিলে তুমি, ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ছাত্রী ছিলে, কিন্তু তোমাকে পড়তে দেওয়া হয়নি। ইস্কুল থেকে জোর করে ছাড়িয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। আর যেন কোনও মেয়েকে বাল্যবিবাহের শিকার হতে না হয়, আর যেন কোনও মেয়েকে পূতিগন্ধময় পুরুষতান্ত্রিক পরিস্থিতির শিকার না হতে হয়। মেয়েদের শিক্ষিত হওয়া, আর স্বনির্ভর হওয়ার মূল্য কী, তা নিজের জীবন দিয়ে তুমি বুঝেছো। এখন থেকে প্রতিবছর তোমার আদর্শের প্রতি মাথা নুইয়ে ঈদুল ওয়ারা বৃত্তি গ্রহণ করবে মেয়েরা। তুমি যা পারোনি, তা যেন অন্যরা পারে। তুমি স্বপ্ন রচে দিয়ে গেলে সবার মধ্যে। তোমার কথাগুলোই লিখে আমি পাঠিয়ে দিই। আয়োজনটা খুব দ্রুত করার জন্য তাগাদা দিই। সবাই বুঝতে পারে তাড়াহুড়োর কারণ। অনুষ্ঠান করতে খুব বেশিদিন সময় নেয়নি। মোট পাঁচজনকে দশ হাজার টাকা করে বৃত্তি দেওয়া হয়। রীতিমত বড় সড় বৃত্তি দানের অনুষ্ঠান হয় মুকুল নিকেতনে। ময়মনসিংহের বুদ্ধিজীবিরা অনুষ্ঠানে তোমার প্রশংসা করে বক্তব্য রাখেন। দাদা সেসবের ভিডিও ক্যাসেট আর তোমার ছবি দিয়ে বানানো বিরাট ব্যানারটিও ঢাকায় নিয়ে আসে। ব্যানারে বড় বড় করে লেখা ঈদুল ওয়ারা বৃত্তি। সেগুলো তোমাকে দেখাই আমি মা। তোমার যেন অহংকার হয়, দেখাই। তোমার যেন ভালো লাগে, দেখাই। আমি জানি না তোমার চোখে খুব বিস্ময় ছিল নাকি বেদনা ছিল। ভিডিও দেখাতে গিয়ে বারবার আমাকে তা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। কারণ বারবারই বক্তারা তোমার ক্যানসার আর তোমার আসন্ন মৃত্যুর কথা বলছিলেন। আমি চাইনি ওসবকথা তুমি শোনো। দাদার বক্তব্যের ওই কথাটা অবশ্য শুনলে, কিছু বলেনি। আমি চট করে বন্ধ করতে পারিনি। দাদা বলছিলো, আমার মায়ের শেষ ইচ্ছে.। নিশ্চয়ই ভেবেছো শেষ ইচ্ছে কেন হবে? তবে কি বাঁচবেনা? একবারও তুমি এই শেষ ইচ্ছে নিয়ে প্রশ্ন করোনি। একবারও আমাকে বলোনি, যতীন সরকার বা অন্যদের পুরো বক্তৃতা কেন তোমাকে শোনাচ্ছি না। বক্তৃতা দিতে গিয়ে তোমাকে মহীয়সী নারী, মহান মানুষ এসব বলছিলেন ওঁরা, শুনে কি তোমার বাঁচতে ইচ্ছে করছিলো মা, পৃথিবীটাকে খুব সুন্দর মনে হচ্ছিল, মা?
নানি বললেন, নিজেদের আত্মীয়ের মধ্যেই তো কত গরিব আছে, ওদের তো বৃত্তি দিলেও পারতাম। আমি বললাম, এটা বিচারকদের সিদ্ধান্ত। নানি আসলে বলতে চাইছিলেন টুটু মামার প্রথম বউএর ছেলে মেয়েরা চরম অভাবে দিন কাটাচ্ছে। টুটু মামা অন্য এক মহিলাকে বিয়ে করে নতুন সংসার পেতেছে, প্রথম বউকে তালাক দেওয়ারপর সেই বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে বাপের বাড়িতে করুণ অবস্থায় পড়ে আছে। টুটু মামা তার ছেলে মেয়ের কোনও খবরই নিচ্ছে না। ওদের দারিদ্র যদি এই টাকায় ঘুচতো! শরাফ মামার ছেলেরাও আছে, অভাব যাদের ঘর থেকে কিছুতেই বিদেয় হতে চায় না। আসলে ওদের সাহায্য করা, আর তোমার নামে বৃত্তি প্রতিষ্ঠিত করা, দুটো তো আলাদা জিনিস। তুমি নানির মন্তব্যে খুশি হওনি। কিন্তু মা, নানি তো সারাজীবন নানার বেহিসেবী খরচ থেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে বুদ্ধি করে ওভাবেই সংসার চালিয়েছে। আমি
