তোমাদের একটা ঠান্ডা মনোমালিন্যকে চেষ্টা করি দূর করতে। তুমি শান্ত, স্থিত, স্নিগ্ধ। তোমার ভালো লাগছে কী লাগছে না, তা অনুমান করতে হচ্ছে আমার। প্রকাশ করছো না কিছু। যে তুমি এত আবেগপ্রবণ ছিলে, সে তুমি কীরকম ভীষণ ভাবলেশহীন হয়ে গিয়েছিলে। শয্যাশায়ী না হয়ে নিপুণ গৃহিণীর মতো সংসার তদারকি করছিলে। আমার জন্য কী রাঁধতে হবে, কার জন্য কী বাড়তে হবে, এইসব। যেন অন্য যে কোনওদিনের মতো দিন। ভালো লাগছে মা? হ্যাঁ লাগছে। জানি না কীরকম লাগতো ভেতরে তোমার। জানি অসহ্য যন্ত্রণা ছিলো শরীরে, তোমার শরীর সুস্থ করার ক্ষমতা ছিলো না আমার। শুধু মন নিয়ে তাই ব্যস্ত ছিলাম, মনটায় যদি একটু ভালো লাগা দিতে পারি। কোনও কারণে যেন তোমার মনে সামান্যও আঘাত লাগতে পারে, সেই কোনও কিছু না ঘটাতে আমি সদা ব্যস্ত। কিন্তু মা, একদিন তুমি ভেঙে পড়লে, একদিন তুমি কাঁদলে, চিৎকার করে কাঁদলে। দোষ কাকে দেব, শেফালিকে! শেফালিকেই দোষ দেব। সে আলগোছে শোবার ঘরের ফোনটা তোমাকে দিয়েছিল শুনতে। ড্রইংরুমে বসে বাবা কার সঙ্গে কথা বলছে, সে বাবার ব্যাপার। কিন্তু শেফালি তোমাকে রিসিভারটা কানে লাগিয়ে দেয় শোনার জন্য। তুমি রেখে দিতে পারতে, রাখোনি। তুমি তো আড়িপাততে চাওনি বাবার কথায়। শেফালির অতি উৎসাহে তুমি শুনছিলে বাবার গলা নামিয়ে বলা কথাগুলো। শুনছিলে কারণ বাবা তোমার সম্পর্কে কথা বলছিলো। এরপর তুমি ফোন রেখে আমার কাছে এলে। আমি আমার লেখার ঘরে বসে বই পড়ছিলাম। মা, তুমি ডুকরে কেঁদে উঠলে, কাঁদতে কাঁদতে বললে যে বাবা নাকি কাকে বলছে তুমি নাকি মরে যাবে কিছুদিনের মধ্যে, ডাক্তার নাকি বলেছে তিন মাসের বেশি বাঁচবে না, তুমি মরে গেলেই বাবা ঝামেলামুক্ত হয়ে যাবে। যে মহিলার সঙ্গে কথা বলছিলো, তাকে বিয়ে করবে বা এরকম কিছু। মা, বাবার চরিত্র তুমি তো জানোই, বাইরের মহিলাদের সঙ্গে প্রেম কি তার আজকের ব্যাপার! সে তো আমার জন্মের আগে থেকেই করছে। তবে কেন কেঁদেছিলে মা? তুমি মরে যাচ্ছো শিঘ্রি এই খবরটা শুনে তুমি তো আঁতকে ওঠোনি। তোমার ভেতর তো বিন্দুমাত্র ভয়ের কিছু দেখিনি। আমাকে একবারও জিজ্ঞেস করোনি যে ডাক্তার কি তিন মাস বাঁচার কথা বলেছে? বা তুমি কি সত্যি সত্যি মরে যাবে? বরং বাবার কোনও এক প্রেমিকার সঙ্গে তোমাকে চরম অপমান করে কথা বলায় এত কষ্ট পেয়েছিলে যে অসুখে ভুগে ইস্পাতের মতো হয়ে যাওয়া তুমিও চুরমার হয়ে গেলে। আর আমার এতদিনের তোমাকে আগলে আগলে রাখা, তোমাকে আশ্বাস দেওয়া সব তাসের ঘরের মতো এক তুড়িতে ধসে গেল। দেখ নানি অমন চরম অসুখ থেকে বেঁচে উঠেছে, দিব্যি সুস্থ, সেরকম তুমিও সুস্থ হয়ে উঠবে–সব আশ্বাস, সব আশা, সব ভরসা, তোমাকে সুখ দেবার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেল। শেফালির ওপর সব রাগগিয়ে পড়ে আমার। বাবার ওপরও। বাবাকে আমি অপমান কম করিনি সেদিন। ধিক্কার দিয়েছি বারবার। বাবা মাথা নিচু করে বসে ছিলোপরদিন আমি তোমার নামে যে বৃত্তি হচ্ছে, বাবার নামে যে কোনওদিন হবে না, বাবার মতো দুশ্চরিত্র মানুষের নামে, তা তোমার সামনেই তাকে বললাম। বাবা যতই দুনিয়া বাদ দিয়ে এসে তোমার পাশে বসে থাকুক, যতই সে তোমার গায়ে হাত বুলিয়ে দিক, যতই সে তোমার সঙ্গে করা তার সারাজীবনের অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাক নিরন্তর তোমাকে সঙ্গ দিয়ে, আমি তাকে ক্ষমা করি না। আমি নিজেকেও কি ক্ষমা করি মা? বাবাকে যখন তোমার প্রয়োজন ছিল, তুমি পাওনি তাকে। আজ আর তাকে তোমার কিসের প্রয়োজন! তোমার তো আর চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। শরীরের প্রয়োজনও ফুরিয়েছে। মনের যেটুকু ছিল অবশিষ্ট, অন্তত ভেবেছিলে যাকে সারাজীবন পাশে চেয়েছে, পাওনি, আজ পাচ্ছো, আজ সে জগৎ ভুলে তোমার সেবায় নিয়োজিত, তোমার পাশে ঘুমোয়, তোমাকে আদর করে দেয়–সামান্য সেই মনের আরামটুকুও সেদিন জন্মের মতো গেল। তোমার আর কী রইলো তবে?
দিন দিন তোমার পেট ফুলে উঠছে জলে, ফুলে উঠছে ফুঁসে উঠছে আর তুমি ঢেকে রাখছে। তুমি কাউকে বুঝতে দিতে চাইছে না যে কিছু একটা ভয়ংকর ঘটছে তোমার শরীরে। আমরা সবাই বুঝতেপারছি, কিন্তু বলছিনা তোমাকে। সবাই কি আমরা তোমার সঙ্গে অভিনয় করছিলাম, আর তুমিও অভিনয় করছিলে আমাদের সবার সঙ্গে! কিছু না বুঝতে পারার অভিনয়! মা!
বাড়িতে বড় মামা, ফকরুল মামা তোমাকে দেখতে এলে তোমাকে আর কতক্ষণ কে দেখতো, আসর বসে যেতো আমার লেখার ঘরে। ধর্ম, আল্লাহ খোদা, মোহাম্মদ, কোরান হাদিস নিয়ে আমাদের হাস্যরসের আসর। বড় মামা ছিল আমাদের গুরু। কোরানের ক থেকে চন্দ্রবিন্দুপর্যন্ত যার মুখস্ত। তুমি বড় মামার ওপর একসময় রাগ করতে, আমাকে নাকি আসকারা দেয় ধর্মের বিরুদ্ধে লেখার জন্য। বড় মামা আসকারা দেবে কেন, আমি নিজেই কি জানিনা ধর্ম কী এবং কেন! ধর্মের বিরুদ্ধে লিখি বলে ধর্মের জন্য তোমার মায়া হত না, মায়া আমার জন্য হত। তোমার আশংকা হত আমার বিপদ হবে। সে আমি এখন না হয় বুঝি, তখন তোমার আশংকাকে ধর্মভীরুতা বা ধর্মান্ধতা বলে মনে করতাম, আর কতরকম করে যে তোমাকে নির্বোধ ভাবতাম তখন। তখনও তো দেশছাড়া হইনি। তোমার আশংকাই শেষ অবদি সত্যি হয়েছিল মা।
০৫. তুমি অন্য ঘরে
তুমি অন্য ঘরে, আর তোমাকে লুকিয়ে এ ঘরেহইরই চলছে। ধর্মের বারোটা বাজাচ্ছি সবাই।
