সরাসরি সৌদি আরব থেকে এনে তার এক ছাত্রী তাকে উপহার দিয়েছে, সেই কোরান পাঠের ক্যাসেটগুলো ঝুনু খালা তোমার জন্য এনেছিলো, ওই ক্যাসেট আমি সারাদিন চালিয়ে রাখতাম, যেন তুমি শোনো। আমি কোনওদিন লক্ষ করিনি তুমি ওগুলো মন দিয়ে শুনছো বা শুনতে চাইছো। কোনও কোনও সময় বলতে যেন এবার একটু বন্ধ করি ওসব। তুমি আমাকে পাশে নিয়ে বসে গল্প করতে চাইতে। আমি তোমাকে আনন্দ দিতে তখন মরিয়া হয়ে উঠেছি, তোমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে সেই ছোটবেলায় পড়া সুরাগুলো আওড়েছি, ভুলগুলো তুমি সুদ্ধ করে দিতে, হয়তো খুশি হতে দেখে যে, যে কাজটা আমাকে একসময় তুমি করতে বলতে, করিনি, আর আজ আমি স্বেচ্ছায় তা করছি। তোমার চুল পাখার হাওয়ায় উড়তে আর তোমাকে কী যে পরিতৃপ্ত মনে হত। পরে আমি লক্ষ করেছি, এমন কী তোমার প্রিয় কোনও সিনেমার গান গাইলেও তুমি একই রকম খুশি হও। একদিন তো টেলিভিশনে সবার ওপরে নাকি শাপমোচন নাকি হারানো সুর কী একটা ছবি হচ্ছে, তুমি ড্রইং রুমে গিয়ে সিনেমাটা দেখছিলে, একসময় কী ভালোই না বাসতে তুমি উত্তম সুচিত্রার সিনেমা দেখতে। তোমাকে দেখতে আমার ভীষণ ভালো লাগছিল। অন্যরকম। ধর্মের আফিম খেয়ে যেমন সিনেমা দেখা বাদ দিয়েছিলে, টেলিভিশন দেখাও বন্ধ করেছিলে, কারণ পীর বাড়ি থেকে ওসব দেখার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি হয়েছিল। সেই তুমি সব নিষেধ উড়িয়ে দিয়ে সেই তোমার তরুণী বয়সের মতো সিনেমা দেখছে। চোখে তোমার আগের মতো সেই উজ্জ্বলতা। বাড়িতে লোক চলে এলে অবশ্য তুমি উঠে গিয়েছো, একটু কি লজ্জা হয়েছিলো তোমার! কেন মা? ধার্মিক হিসেবে তোমাকে সবাই জানে বলে কি তোমার যা ভালো লাগে তা তুমি করবে না? আমার এখন অনুশোচনা হয়, কেন আমি তোমার প্রিয় প্রিয় সিনেমাগুলোর ভিডিও ক্যাসেট বা ডিভিডি এনে তোমাকে দেখাইনি? কেন আমি ওই কোরান আবৃত্তি দিনের পর দিন ছেড়ে রাখতাম! তুমি তো কোরান পড়তে দোযখে যেতে হবে, সেই ভয়ে। তুমি তো সিনেমা দেখতে কোনও ভয়ে নয়, আনন্দে। তোমাকে আনন্দ দেওয়াই যদি আমার উদ্দেশ্য হয়, তবে কেন আমি ও কাজটা করিনি! সারাদিন তোমাকে অসুস্থ মানুষের মতো শুইয়ে রাখতে চাইতাম। কিন্তু সারাদিনই তুমি বিছানায় শরীর ছোঁয়াতে চাইতে না। একদিন বাড়িতে ক্যারম খেলা হচ্ছিল। তুমি এলে ক্যারম খেলতে। আমার উৎসাহ পেয়ে তুমি আরও যেন কিশোরী হয়ে উঠেছিলে। তুমি যেন ছুটে ছুটে যেতে চাইছিলে তোমার শৈশবে, কৈশোরে, তোমার যৌবনে। বাড়ির কেউ তোমাকে কোনওকিছু নিয়ে বিদ্রূপ করছে না, ঘৃণা করছে না, তোমার কেন ছুটতে ইচ্ছে করবে না, বলো।
মাঝে মাঝে ভাবি, যদি তোমার ভয়ংকর অসুখটা না ধরা পড়তো, এবং কেউ না জানতো যে আর কটা দিন পরই দুনিয়া থেকে তোমাকে বিয়ে নিতে হবে, তবে তোমাকে বোধহয় আগের মতোই অবহেলা অপমানে জীবনের শেষ দিনগুলোও পার করতে হত। বাবার মতো লোক যে কিনা ময়মনসিংহের চেম্বার ছাড়া আর অবকাশ ছাড়া এক মুহূর্তও কোথাও থাকতে চায় না, সে দিনের পর দিন মাসের পর মাস নিউইয়র্কে আর ঢাকায় পড়ে আছে, তোমাকে সঙ্গ দেবে বলে। অসুখটা না হলে পেতে বাবাকে এত কাছে? নিউইয়র্কের বাড়িতে বাবা তোমাকে পাশে নিয়ে খেয়েছে, রাত জেগে তোমার যত্ন করেছে, ঘুমোয়নি রাতের পর রাত। তোমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে। হ্যাঁ মা, হঠাৎকরে তোমার জন্য সবার ভালোবাসা উথলে উঠেছিলো। দাদা অবকাশ থেকে চলে এসে দিনরাত ফুটফরমাশ খাটছে। তাকে পাঠাচ্ছি বাইরের কাজগুলো করতে, ওষুধ আনা, ডাক্তার আনা, কিমোথেরাপি দেওয়ার লোক আনা, ডলার ভাঙানো, ব্যাংকের স্টেটমেন্ট আনা, বাজার করা। দাদা মুখ বুজে সব করে যাচ্ছে। বড় মামা, ফকরুল মামা, ঝুনু খালা তোমাকে দেখতে আসছে। যে নানিকেশত বলেও ঢাকায় আনা যায় না, সেই নানিও চলে এসেছে শান্তিনগরে। তোমাকে সঙ্গ দিতে। ছটকু আসে ময়মনসিংহ থেকে তোমাকে দেখতে। ফেলু মামা আর হাশেম মামার ছেলে সুমন এসেছিলো তোমাকে দেখতে, তাদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। শরাফ মামাকেও না। কেন যে ওদের ঢুকতে দেওয়া হল না! আবার কে না কে কাকে জানিয়ে দেয় যে আমি কোথায় আছি, সে কারণেই। হাশেম মামার মেয়ে সুলতানার বিয়ে হওয়ার পর ঢাকায় থাকে, ও একদিন বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে এসেছিলো তোমাকে দেখতে। আমি তখন লেখার ঘরে দরজা বন্ধ করে বসেছিলাম। এখন ভাবি, এদের নিয়ে আমার ভয় পাওয়ার কী ছিলো মা! আশংকা আমার চেয়ে বেশি হয়তো তোমার হতো। তুমি চাইতে আমার সঙ্গে কারও দেখা না হোক। আমাকে পেয়ে তোমার নিজের আত্মীয়দেরও তুমি বিশ্বাস করোনি। ওদের থেকেও দূরে থাকতে চেয়েছে। নানিও থাকুক তোমার সঙ্গে, চাওনি। অনেকবার নানিকে তুমি বলেছো যে বাড়িতে হাশেম মামা অসুস্থ, তাকে রেখে নানি কেন ঢাকায় এসেছে। তোমাকে আমরা কেউ বলিনি যে হাশেম মামা মারা গেছে। তুমি কষ্ট পাবে বলে বলিনি। নানিকে মিথ্যে কথা বলতে হল যে এখন হাশেম মামাকে দেখার লোক আছে। আমরা সবাই চাইছিলাম নানি তোমার কাছে থাকুক। বাবাও। নানি সারাদিন কোরানপড়ে তোমার মাথায় মুখে শরীরে ফুঁ দিয়ে দেয়। আমার মনে হয় না এসব ফুঁ টু তোমার ভালো লাগে। আগে হয়তো লাগতো, এখন আর লাগেনা। এখন তুমি কিমোথেরাপি নিতে চাও কাজ হয় না জেনেও কিমোথেরাপিদিই তোমাকে, তোমার ভালো লাগবে বলে দিই, কিছু একটা চিকিৎসা তোমার হচ্ছে এই ভেবে তোমার ভালো লাগে। কিমোথেরাপি দেওয়া হলে, না মা, তোমার শরীর ফুরফুরে লাগে বলে যা বলল, তা ভুল বললো, তোমার মন ফুরফুরে লাগে। কিন্তু তোমার রক্তের শ্বেত কণিকা এত কমিয়ে ফেলে এই বিষ যে দুদিনপরই তোমাকে হু হু জ্বরেপড়তে হয়। ওষুধ খাইয়েও, সারা গায়ে ঠাণ্ডা স্পঞ্জ করেও তোমার জ্বর কমাতে পারি না। পাশের বাড়ির ডাক্তার প্রজেশকে ডাকা হয়, প্রজেশ আমার শিক্ষক ছিলেন মেডিকেল কলেজে। তোমাকে দেখে বলে দেন হাসপাতালে ভর্তি করতে। তুমি ভর্তি হলে দাদা আর বাবা হাসপাতালে যাতায়াত করলো। আমি ঘরে। আমার পক্ষে তো তোমাকে দেখতে যাওয়ার উপায় নেই। মৌলবাদীরা কোথায় ওঁত পেতে আছে কে জানে, ওঁত না পেতে থাকলেও, দেখে আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ার লোকও কম নেই এ শহরে। হাসপাতালে তোমার জন্য খাবার পাঠানো ছাড়া বাড়িতে আমার তখন আর কাজ থাকেনা। অবশ্য খাবার তৈরি করে শেফালিই। শেফালি বাড়ির সব কাজ একাই করে, তোমার কাজও। তুমি যখন হাসপাতালে, আমাকে দেখতে শামসুর রাহমান আর নির্মলেন্দু গুণ এসেছিলেন। আমার একটুও মনে হয়নি ওঁদের সঙ্গে আমার বহু বছর পর দেখা হল, আগে যেমন আড্ডা হত, তেমনই হলো আমার লেখার ঘরে বসে। আড্ডার বিষয় ছিলো মূলত রাজনীতি আর একটু আধটু সাহিত্য। কাছের কিছু মানুষকে আমার জানাতেই হয়েছে আমি কোথায় আছি। দেশ বিদেশের সাংবাদিকদের মধ্যে এক বিবিসির ডেভিড সেসানকেই সাক্ষাৎকার দিয়েছি, আমি কোথায় আছি সে খবর গোপন রাখবে এই শর্তে। সাক্ষাৎকারে বলেছি, দেশ থেকে বেরোনোর কোনও ইচ্ছে আমার নেই। মৌলবাদীদের ফতোয়া বা তাণ্ডবের আমি পরোয়া করি না। লেখার মাধ্যমে সমতা আর সমানাধিকারের জন্য সংগ্রাম করছি। যাদের জন্য লিখি সেই মানুষ থেকে এবং যে ভাষায় লিখি, সে ভাষা থেকে দূরে সরে গেলে লেখালেখি সম্ভব নয়। এদিকে শুনি পুলিশ খুঁজছে আমাকে। যে ইমিগ্রেশনের লোকটি আমাকে দেশে ঢুকতে দিয়েছিলো তার নাকি চাকরিও গেছে। মতিঝিল থানা থেকে পুলিশ এসে বাড়ি পাহারা দিচ্ছে। দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশগুলো জানেও না কেন তারা এখানে, আমার জন্য গুপ্তচর না কি আমার জন্য পাহারা, আমিই কী আর জানি! আমার বিরুদ্ধে নতুন কোনও ফতোয়া জারি হয় না, কোনও মিছিল বেরোয় না রাস্তায়। কিছু যদি দুর্ঘটনা না ঘটতে থাকে, তবে সাহস এসে ভর করে মা। আমি একদিন রাত বিরেতে চলে গেলাম ঝুনু খালার বাড়িতে। আবার একদিন বারডেম হাসপাতালে দেখতে গেলাম তোমাকে। ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বললাম। ইনসুলিন দিচ্ছে তোমাকে। কী আর খাচ্ছো তখন যে এত এত ইনসুলিন দিতে হয়! নার্সরা যখন সুঁই ফোঁটায় তোমার গায়ে, আমি অন্যদিকে তাকিয়ে থাকি। দেখলে মনে হয় সুই যেন আমার গায়ে ফোঁটালো। সুঁই তো নিজেই তুমি নিজের গায়ে ফোঁটাও যখন নিজে তুমি দিনে তিনবেলা ইনসুলিন নাও। আমি বুঝে পাই না কী করে পারো তুমি। তোমার অভ্যেস হয়ে গেছে, নিজের গায়ে সুঁই ফোঁটাতে তোমার আর কষ্ট হয় না। কিন্তু বুঝি না, তুমি নিতান্তই সামান্য কিছু মুখে দিচ্ছ, কেন তবু তোমার রক্তের চিনি উঁচুতেই উঠে থাকে। সম্ভবত তোমার অসুখটিই চিনিকে কমতে দেয় না, দিনের পর দিন তুমি উপোস থাকলেও। কিমোথেরাপির লোক এসে যখন বাড়িতে তোমার হাতের শিরা বের করে সুই ঢোকাতে চাইতো, আমি চাইনি তুমি কোনও ব্যথা পাও, জায়গাটা অবশ করার জন্য একটা মলম কিনেছি, সেটা লাগিয়ে তারপর সুই ঢোকাতে দিয়েছি। কেন অমন করেছি মা? সুইএর ব্যথা কি তোমার কাছে আদৌ কোনও ব্যথা, তোমার তো ক্রমাগতই ব্যথা হচ্ছে পেটে। মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করেছি ব্যথা কি কমেছে? তুমি ম্লান হেসেছে। উত্তর দিয়ে আমার মন খারাপ করতে চাওনি। তবে কোনও কোনও সময় বলেছে, যে, ব্যথা সবসময় আছেই। একদিন বললে, ব্যথা নয়, ব্যথার চেয়েও বড় কিছুতুমি অনুভব করো। সেটা যে কী তুমি কোনও শব্দে বা ভাষায় বোঝাতেপারোনি। আমার তো বোঝার ক্ষমতাই নেই। কী করে থাকবে, আমার কি সারা শরীর ছাওয়া ক্যানসারে! একটু একটু করে আমি তো বুঝতে পারছিলাম তোমার শরীর বদলে যাচ্ছে, তোমার পেটে পানি আসছে, পেট ফুলে যাচ্ছে, তুমি ওড়না দিয়ে পেট ঢেকে রাখো। কেন মা? কেন আমাকে বলোনি যে তোমার পেট ফুলে উঠছে দিন দিন? জিজ্ঞেস করলে তুমি নিজেকে আড়াল করো। তুমি কি আমাকে বুঝতে দিতে চাইতে না? অসুখ লুকোতে চাইতে মা? কাকে খুশি করতে? কেন চিৎকার করে বলোনি, তোমার তো চিকিৎসা হলো, সাড়ে চার ঘণ্টার একটা বড় অপারেশন হলো, শরীরে অনেক রক্ত দেওয়া হল, বিদেশের হাসপাতালে চিকিৎসা হল, তোমার তো ভালো হয়ে যাওয়ার কথা, তবে পেট ফোলে কেন, কেন ব্যথা দিন দিন বাড়ছে? কেন শরীরের অবস্থা ভালো হওয়ার বদলে আরও খারাপ হচ্ছে? কেন তোমার বিবমিষা, কেন খেতে পারছো না? একবারও তো কাউকে বলোনি, না আমাকে, না বাবাকে, না ডাক্তারকে, না তোমার মাকে, বা ভাই বোনকে! যখন তোমারপাইলসের রক্ত যাচ্ছিল, অভিযোগের সীমা ছিল না। চিকিৎসাপাওয়ার জন্য চিৎকার করতে। তখন কেউ আমরা তোমার চিৎকারের গুরুত্ব দিইনি। আর যখন তোমার একটি শব্দকেও আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি, তোমার পাশে পাশে থাকছি, তোমাকে কী করে ভালো রাখা যায় তার চেষ্টা করছি, তখন তুমি একবারও তোমার শরীরের কোনও কিছু নিয়ে কারও সঙ্গে আর কথা বলছো না। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে হয় উত্তর দিচ্ছ না, এড়িয়ে যাচ্ছো, নয়তো ভালো আছি ধরনের কিছু বলে প্রসঙ্গ বদলাচ্ছো। কেন মা? বুঝতে পেরেছিলে তোমার অসুখ সেরে যাওয়ার অসুখ নয়! একটুও তো তখন মৃত্যুর কথা বলেনি। একটুও তো মুষড়ে পড়োনি, কাঁদোনি। একটুও তো ভয় পাওনি। শিউরে ওঠোনি। একটুও তো কোরান নিয়ে বসোনি। আগে তো মৃত্যুর কথা বলে বলে কাঁদতে, যখন সুস্থ ছিলে!
